প্রয়োজন দুর্নীতির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক ব্যবস্থা

আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০১৯, ০৯:৪১ পিএম

বাংলাদেশে যতগুলো সমস্যা জাতীয় উন্নয়ন-অগ্রগতির ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তার মধ্যে দুর্নীতি অন্যতম। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) কর্র্তৃক প্রকাশিত দুর্নীতির ধারণা সূচক ২০১৭ অনুযায়ী, শূন্য থেকে ১০০ স্কেলে বাংলাদেশ ২৮ স্কোর পেয়েছিল, ২০১৮ সালে সে স্কোর নেমে এসেছে ২৬-এ। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিবেদন বলছে, দুর্নীতির ধারণা সূচকে ২০১৭ সালে বাংলাদেশের সার্বিক অবস্থান ছিল নিচের দিক থেকে ১৭। ২০১৮ তে নেমে এটি হয়েছে ১৩। এই সূচকে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের চেয়ে খারাপ অবস্থা শুধু আফগানিস্তানের। এমনিতেই বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তার ওপর টিআই-এর প্রতিবেদনে বাংলাদেশের এই অবস্থান নতুন উদ্বেগ ও হতাশা তৈরি করেছে।জনসংখ্যাধিক্য ও ক্ষুদ্র আয়তনের এ দেশটির একদিকে রয়েছে দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, অপুষ্টি, সম্পদের অভাব, অপরদিকে সমাজের বিভিন্ন স্তরে রয়েছে দুর্নীতির কালো ছায়া। টিআই-এর ২০০১-০৫ সাল পর্যন্ত প্রতিবেদনে বাংলাদেশ শীর্ষ দুর্নীতগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল।  সেই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটলেও বাংলাদেশ এখনো দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত।

দেশের দুর্নীতি তখনই বিস্তার লাভ করে, যখন তা প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা পায়। সমাজ থেকে দুর্নীতি দূর করতে হলে সবার আগে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। অনেক সময় দেখা যায়, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বা ঘনিষ্ঠরাই দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে।  অতীতে সরকার কাঠামোয় ক্রমবর্ধমানভাবে প্রভাবশালী ও অশুভ একটি চক্রের তৎপরতায় দেশে দুর্নীতি বিস্তার লাভ করতে দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চ পর্যায়ের দুর্নীতিবাজদের বাদ দিয়ে নিম্ন ও মধ্যম সারিতে ব্যবস্থা নেওয়ায় বাংলাদেশ আশানুরূপ উন্নতি করতে পারছে না। দেশের  দুর্নীতিবিরোধী অভিযান নিম্ন ও মধ্যম পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। তাই দুর্নীতি দমনে বিচারিক প্রক্রিয়া সবার জন্য কার্যকর করা এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।  এক্ষেত্রে কোনো ধরনের বৈষম্য কাম্য নয়। আর চলমান উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে অবশ্যই সব শ্রেণির দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে হবে।

দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রয়োজন সব কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ব্যবস্থা, দারিদ্র্য বিমোচন ও আয়-বৈষম্য কমানোর উদ্যোগ, দুর্নীতি দমন কমিশনকে অধিকতর শক্তিশালী ও কার্যকর করা, দুর্নীতি বিষয়ক মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা ইত্যাদি। দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) তার নীতিগত অবস্থানে অটল থাকতে হবে। দুদকের জনবল-অবকাঠামোগত সক্ষমতারও প্রশ্ন রয়েছে। আছে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হয়ে তৎপরতা চালানোর অভিযোগও। গবেষণার মাধ্যমে দুর্নীতির প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং তা দূর করতে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে গণমাধ্যমগুলোকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টির জন্য উৎসাহ দেওয়া দরকার।

বাংলাদেশ এখন বিভিন্ন সূচকে যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে এবং এ অগ্রগতি আরও কয়েক ধাপ বেশি হতে পারত, যদি দেশে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো। সঙ্গত কারণেই এই পরিস্থিতিতে দুর্নীতি দমনে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ বা ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’ নীতির ওপর জোর দিয়েছে ক্ষমতাসীনরা। দুর্নীতির অভিযোগ আছে এমন প্রভাবশালী নেতারা এবারের মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়ায় এ বিষয়ে জনমনে খানিকটা আশারও সঞ্চার হয়েছে। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান, নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক, জাতির উদ্দেশে ভাষণসহ অনেক জায়গায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে যেসব হুঁশিয়ারি এবং সতর্কবাণী দিয়েছেন তা থেকে দুর্নীতিরোধের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর যে শক্ত অবস্থান দেখা যায় তা জনগণের প্রত্যাশা বাড়িয়ে দিয়েছে। টিআই প্রতিবেদন একটি সতর্ক সংকেত। এ সংকেতকে ইতিবাচকভাবে নিয়ে সরকার ও দুদক দুর্নীতির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নিলে সেটি হবে আশাপ্রদ ঘটনা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত