বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ৪ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

দুই অংকের প্রবৃদ্ধি ২০২৫ সালে

ঋণখেলাপি রোধে দেউলিয়া আইন, পুঁজিবাজারে সতর্কতা

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১২:৪৪ এএম

‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র বদনাম নিয়ে চলতে শুরু করা বাংলাদেশ আগামী পাঁচ বছরের মাথায় ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করছে। এ জন্য সরকারের উন্নয়ন কর্মকান্ডে জিডিপির সাড়ে ৪ শতাংশ থেকে ৯ শতাংশ বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বিদেশি ঋণ-নির্ভরতা কমানোর ওপর জোর দেওয়ার পাশাপাশি ব্যাংক খাতে অনিয়ম কমাতে দেউলিয়া আইন কার্যকর করা, পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি, তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে জামানতবিহীন ঋণ দেওয়াসহ বিভিন্ন খাতে সংস্কার আনা ও উপ-আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করছে নতুন সরকার। নতুন সরকারের এসব উন্নয়ন ভাবনা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালকে একটি প্রতিবেদন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান। প্রতিবেদনটির উল্লেখযোগ্য অংশ তুলে ধরেছেন রায়ান বণিক

ব্যাংকে জালিয়াতি ও অনিয়মরোধে কঠোর হওয়ার প্রস্তাব করে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান দেউলিয়া আইন সংস্কার করে প্রয়োগ করার প্রস্তাব করেছেন। তবে এ জন্য পর্যাপ্ত সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রস্তুতির প্রয়োজন হবে উল্লেখ করে এক বছর বা তার বেশি সময় ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার কথা বলেছেন তিনি।

দেশের অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক যোগাযোগের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গত ২২ জানুয়ারি স্বাক্ষরিত একটি প্রতিবেদন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালকে দিয়েছেন মসিউর রহমান। তাতে ব্যাংক খাতে অনিয়ম বন্ধে দেউলিয়া আইন প্রয়োগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, এ আইন ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা। দেউলিয়া প্রতিষ্ঠান ঋণ পায় না। তার সম্পদ ঋণের দায় মেটানোর জন্য কর্র্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে এবং দায় মেটানোর জন্য সম্পদ বিক্রির অর্থ ব্যয় করা যেতে পারে। দেউলিয়া হওয়া ব্যক্তি নাগরিক নির্ধারিত অধিকার হারায় বা তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন না।

‘তবে দেউলিয়া আইন প্রবর্তন ও প্রয়োগ কঠিন বাধার সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দেউলিয়া আইন সংস্কার ও প্রয়োগ সংশোধন বিবেচনা করলে, বিশদ পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য এক বছর বা তার চেয়ে বেশি সময় লাগবে; বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত সামাজিক/রাজনৈতিক প্রস্তুতি প্রয়োজন হবে’ যোগ করেছেন মসিউর রহমান।

বিদ্যমান ব্যবস্থায় কেউ ঋণের জন্য ব্যাংকে আবেদন করলে তা তিনি আদৌ পাবেন কি না, না পেলে কতদিনের মধ্যে জানতে পারবেন সে ব্যবস্থা নেই। এমন একটি ব্যবস্থার সুপারিশ করে মসিউর রহমান বলেছেন, ঋণপ্রত্যাশী ব্যক্তির আবেদনের পর ব্যাংকের সিদ্ধান্ত ইতিবাচক বা নেতিবাচক হবে কি না এবং সিদ্ধান্ত কখন হবে সে সম্পর্কে অনিশ্চয়তা থাকে। দীর্ঘদিন পরীক্ষা-নিরীক্ষা অথবা অযথা কালক্ষেপণ করে নেতিবাচক সিদ্ধান্ত দিলে উদ্যোক্তার প্রচেষ্টা বা অপেক্ষা বৃথা যায়। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদ্ধতি ও রীতিনীতি স্পষ্ট হওয়া দরকার। ঋণপ্রত্যাশী উদ্যোক্তা প্রাথমিক আলোচনার পর ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত সম্পর্কে ধারণা করতে পারলে, অযথা সময় নষ্ট না করে বিকল্প উপায় খুঁজতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংককে সহজ মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর পরামর্শ দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দরখাস্তকারীর নাম-পরিচয়, ব্যাংকের সঙ্গে আগের লেনদেন সন্তোষজনক কি না, প্রথম তথ্য চাওয়ার তারিখসহ পরে কতবার তথ্য চাওয়া হয়েছে তার তালিকা, ঋণ অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যানের তারিখ যাচাই করার কথা বলা হয়েছে এতে। কোনো ঋণপ্রত্যাশী উদ্যোক্তাকে ব্যাংকঋণ না দিলে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজে থেকেও ওই ব্যক্তির ঋণ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়ার বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখতে পারে। আগামী দু-তিন মাসের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক এ ধরনের মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে পারে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুন মাসে বাজেটের সময় ব্যক্তি খাতে ঋণপ্রবাহে অধিকতর উন্নতি হচ্ছে কি না, তা বোঝা যাবে। ঋণের সুদহার নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুদহার নি¤œ পর্যায়ে থাকলে বিনিয়োগ বাড়ে, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি গতি পায়। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সহজ শর্তে অতিমাত্রায় ঋণ দিলে মূল্যস্ফীতি দেখা দেয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের দিকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঝোঁক বেশি থাকে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে অর্থনীতির কোনো উদ্যোগ ফলপ্রসূ হয় না।

পুঁজিবাজার সম্প্রসারণের প্রস্তাব করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজন ও উদ্দেশ্য হলো কম সময়ে বিক্রি ও লাভ অথবা দীর্ঘদিন ধরে রেখে মূল্যবৃদ্ধির সুবিধা নেওয়া। তাদের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য বিভিন্ন ধরনের শেয়ার দরকার। ঢাকা ও চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারের বৈচিত্র্য ও গভীরতা কম। কারণ, বড় করপোরেট হাউসের সংখ্যা কম।

‘বড় বড় বিনিয়োগ খাতগুলোর (জ্বালানি, বিদ্যুৎ, বড় অবকাঠামো) বেশির ভাগই সরকারি মনোপলি। ইদানীং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ জ্বালানি খাত, পরিবহন ইত্যাদি খাতে ব্যক্তিপুঁজি বিনিয়োগ হচ্ছে। এসব পুঁজি শেয়ারবাজারে এলে তার ফলাফল কি পরীক্ষা করা দরকার। এসব খাত রেগুলেটেড (নিয়ন্ত্রিত) ফলে একচেটিয়া মালিকানা ও ম্যানিপুলেশন নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজতর হবে’- যোগ করেছেন মসিউর।

পুঁজিবাজার সম্পর্কে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘পুঁজিবাজার সম্পর্কে কোনো দ্রুত বা আকস্মিক পদক্ষেপ হতে বিরত থাকা বাঞ্ছনীয়। ক্রমবর্ধমানভাবে ত্রুটি দূর করতে হবে, নতুন ও বিচিত্র শেয়ার আনতে হবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।’

পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ সম্পর্কে ধারণার অভাবে ছোট বিনিয়োগকারীরা লোকসান দিয়ে হতাশায় ভোগে উল্লেখ করে মসিউর রহমান বলেছেন, ঢাকার বাইরে শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণে উদ্যোগ নেওয়া দরকার। চট্টগ্রাম ও ঢাকার বাইরে বসবাসকারী কেউ শেয়ারবাজারের সুবিধা নিতে পারে না। বিভিন্ন উপন্যাসে কোম্পানির কাগজ, মহারানি ভিক্টোরিয়ার কাগজের উল্লেখ থাকার প্রসঙ্গ টেনে মসিউর বলেছেন, অনেক আগে ছোট শহরে এজেন্ট মারফত সরকারি বন্ড, এন্যুইটি (বার্ষিক প্রাপ্য সুদ) বিক্রির ব্যবস্থা ছিল।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত