পুলিশ সপ্তাহ শুরু হচ্ছে আগামীকাল সোমবার। এবারই প্রথম বাংলাদেশ পুলিশ মেডেল (বিপিএম) ও প্রেসিডেন্ট পুলিশ মেডেল (পিপিএম) পাওয়া সদস্যরা আগেই পদক পরে পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। সে অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতিতে প্রতিবছরের মতো এবারও বেশ কিছু দাবি তুলে ধরবে পুলিশ।
এসব দাবির মধ্যে রয়েছে সুপার নিউমারারি (সংখ্যাতিরিক্ত) পদ বৃদ্ধি, পুলিশের মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) ফোর স্টার পদমর্যাদা দেওয়া, নতুন আরও এক লাখ পুলিশ নিয়োগ, সব সদস্যের জন্য বিশেষ ভাতা চালু, পুলিশ মেডিকেল কলেজ চালু, অ্যাভিয়েশন ইউনিটসহ দুটি ইউনিট দ্রুত চালু করা, উন্নত অস্ত্রসহ অত্যাধুনিক সরঞ্জাম সরবরাহ করা, ক্যাডার কর্মকর্তাদের ঝুঁকি ভাতা দেওয়া ও শ্রান্তি ভাতা প্রচলন, গাড়ির সংখ্যা বাড়ানো, আবাসন সংকট সমাধান। পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যদের সঙ্গে আলাপ করে এসব তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, রীতি অনুযায়ী প্রতিবছর পুলিশ সপ্তাহে বিপিএম ও পিপিএম পদকপ্রাপ্তদের প্রধানমন্ত্রী নিজ হাতে ব্যাজ পরিয়ে দেন। কিন্তু এবার পদকপ্রাপ্ত পুলিশের সংখ্যা ৩৪৯ জন। এত সংখ্যক সদস্যকে পদক পরিয়ে দেওয়া অনেক সময়ের ব্যাপার। এ নিয়ে গত সোমবার আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারীর সভাপতিত্বে পুলিশ সপ্তাহের সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় পদক প্রদান অনুষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য পদকপ্রাপ্তদের বুকে আগে থেকেই পদক লাগিয়ে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি আইজিপি পদটি ফোর স্টারে (চার তারকা) রূপান্তরিত করা। এবারের পুলিশ সপ্তাহে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে জোরালো দাবি করব আমরা। বর্তমান সরকারই আইজিপি পদটি থ্রি স্টার করেছিল। এ নিয়ে আমরা সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কথা বলেছি।’
পুলিশ সদর দপ্তরের একজন উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) বলেন, ‘সাংগঠনিক সক্ষমতা বাড়াতে সুপার নিউমারারি পদ বাড়ানো জরুরি। পুলিশে অতিরিক্ত ডিআইজি (গ্রেড-৪) থেকে অতিরিক্ত আইজি (গ্রেড-২) পদে ২৮০টি সুপার নিউমারারি পদ সৃজনের দাবি অনেক দিনের। কারণ উচ্চতর পদে প্রসারণ কাক্সিক্ষত অনুপাতে না হওয়ায় বর্তমানে পদোন্নতির সমস্ত যোগ্যতা থাকার পরও বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা পদোন্নতিবঞ্চিত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৯৯১, ১৯৮৯ এবং ১৯৮৫ সালের বিসিএসে যোগদান করা ৩৭ জন ডিআইজি যথাক্রমে ২৮, ২৯ ও ৩১ বছর চাকরি করেছেন। তারা পদোন্নতির অপেক্ষায় আছেন দীর্ঘদিন থেকে। কিন্তু পদ না থাকায় তাদের পদোন্নতি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রায় একই চিত্র পুলিশের অন্যান্য পদেও। এই অবস্থায় অতিরিক্ত ডিআইজি থেকে অতিরিক্ত আইজিপি পর্যন্ত যোগ্য পুলিশ কর্মকর্তাদের কমপক্ষে ২৮০টি সুপার নিউমারারি বা ইনসিটু পদোন্নতির প্রস্তাব করা হয়। পুলিশের পলিসি গ্রুপের সভাতেও এসব দাবি নিয়ে আলোচনা করা হয়।’
বাহিনীর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, পুলিশে সক্ষমতা বাড়াতে নতুন সদস্য বাড়ানোর দাবি করা হবে। তিনি বলেন, ‘২০০৯ সালে পুলিশ ও জনসংখ্যার অনুপাত ছিল ১: ১৩৫৫। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ধাপে ধাপে ৮০ হাজার পুলিশ সদস্য বাড়ানো হয়েছে। এখন দেশে পুলিশের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ১:৮০১। বাংলাদেশ পুলিশকে আরও উন্নত সেবা দিতে হলে জাতিসংঘ স্বীকৃত পুলিশ জনসংখ্যার অনুপাত ১:৪০০ অর্জন করা প্রয়োজন। পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানোর অংশ হিসেবে নতুন এক লাখ পুলিশ সদস্য বাড়ানোর দাবি জানানো হবে পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠানে।’
পুলিশ সপ্তাহের বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে ঘোষণা দিতে পারেন বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন। এ বিষয়ে একাধিক পুলিশ সদস্য জানান, সব পুলিশ সদস্যের জন্য ঝুঁকি ভাতা চালুর দাবি পুলিশের বহু পুরনো। প্রথম শ্রেণির পুলিশ সদস্যরা সেটা পান না। পুলিশের ক্রমাগত দাবির পরিপ্রেক্ষিতে দুই মাস আগে ঝুঁকিভাতার আদলে শুধু পুলিশের পরিদর্শকদের জন্য বছরে এককালীন এক মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ ‘বিশেষ ভাতা’ চালু করা হয়। এই ভাতা সব পুলিশের জন্য চালুর দাবি জানানো হবে পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠানে।
পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, কাল সোমবার রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে প্রধানমন্ত্রী পুলিশ সপ্তাহের উদ্বোধনের পর তার উপস্থিতিতে দরবার অনুষ্ঠিত হবে। এতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র সচিব, আইজিপি থেকে শুরু করে কনস্টেবল পর্যন্ত বাহিনীর সদস্যরা থাকবেন। দরবারে বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মরত পুলিশ সদস্যরা তাদের কাক্সিক্ষত দাবির বিষয়গুলো উপস্থাপন করবেন। এ ছাড়া সপ্তাহজুড়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎসহ পুলিশের ব্যাপক কর্মসূচি রয়েছে। আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জের সুবর্ণগ্রাম রিসোর্টে আইনশৃঙ্খলা ও অপরাধসংক্রান্ত মতবিনিময় সভার মাধ্যমে এবারের পুলিশ সপ্তাহ শেষ হবে।
পুলিশ সপ্তাহের প্রস্তুতি ও দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে ডিআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড প্ল্যানিং) এস এম রুহুল আমিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশ সপ্তাহের যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। এখন শুধু শুরুর অপেক্ষা। আমরা দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা হিসেবে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে সাংগঠনিক বেশ কিছু পদক্ষেপ বাস্তবায়নের কথা প্রতিবছরই বলে থাকি। এবারও বলব। এগুলোকে দাবি বলা ঠিক হবে না। যেমন পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো, পুলিশে পদের সংখ্যা বাড়ানো, আবাসন ও যানবাহন সংকট এসব বিষয়ে আমাদের কিছু যৌক্তিক চাওয়ার বিষয় থাকে।’
পদকপ্রাপ্তদের আগেই ব্যাজ পরে পুলিশ সপ্তাহে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অনুষ্ঠান সুন্দর ও শৃঙ্খল করার স্বার্থে এটা করা হয়েছে। এতে দোষের কিছু নেই।’
