সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ১ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ইয়াবা কারবারিদের বাড়ি গুঁড়িয়ে দিচ্ছে ‘পুলিশ’

আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০২:২৪ এএম

মীর কাশেম পুলিশের তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি। টেকনাফের লম্বরীপাড়ায় তার আছে একটি আলিশান দোতলা বাড়ি।  ‘ইয়াবা কারবার’ করে অঢেল ধন-সম্পদের মালিক কাশেম এখন আত্মসমর্পণ করতে পুলিশ হেফাজতে। দিন পনের আগে রাতের আঁধারে ওই বাড়িটি বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ভবনটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার সময় পরিবারের সদস্যদের জোর করে তাড়িয়ে দেয় পুলিশ। মালামাল সরানোর সুযোগও দেওয়া হয়নি। তার মতোই টেকনাফসহ বিভিন্ন স্থানে চিহ্নিত মাদক কারবারিদের বাড়িঘর রাতের আঁধারে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে তাদের ব্যবহৃত নৌকাগুলোও।

সরেজমিনে গত কয়েক দিন টেকনাফ ও আশপাশের এলাকায় গিয়ে ভাঙা বাড়ি ও পোড়ানো নৌকা দেখা গেছে। তবে বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে পুলিশ বলছে, বাড়িগুলো দুর্বৃত্তরা গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। নৌকা পোড়ানোও একই চক্রের কাজ। এতে পুলিশের কিছুই করার নেই। মাদকের বিরুদ্ধে জনগণ একাট্টা। হয়তো তারাই মাদক কারবারিদের প্রতিরোধ করছে। কয়েকজন এলাকাবাসী দেশ রূপান্তরের কাছে অভিযোগ করেন, প্রতিদিনই ‘ইয়াবা কারবারিদের’ একটি বা দুটি করে বাড়ি ভাঙার টার্গেট করে পুলিশ। আবার স্বজনরা টাকা দিলে পুলিশ আর বাড়ি ভাঙে না।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) খন্দকার গোলাম ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশ কারও বাসাবাড়ি ভাঙচুর করছে না।  তবে আমাদের কাছে তথ্য এসেছে,            পৃষ্ঠা ১১ কলাম ৬ >

ইয়াবা কারবারিদের বাড়ি গুঁড়িয়ে দিচ্ছে ‘পুলিশ’

 

টেকনাফের অনেক স্থানে বেশ কিছু ইয়াবা কারবারির বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়েছে।  এগুলো দুর্বৃত্তরা করছে। পুলিশের কোনো সদস্য এসব কাজে জড়িত ছিল না। মাদকের বিরুদ্ধে সরকার জিরো টলারেন্স দেখাচ্ছে। এতে জনগণ সবচেয়ে বেশি সহায়তা করছে। টেকনাফ ও কক্সবাজারের জনগণ সবাই ঐক্যবদ্ধ। অতিষ্ঠ হয়ে তারা মাদক কারবারিদের বাড়িঘরও ভেঙে ফেলতে পারে। তারপরও বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।’ টেকনাফ ও কক্সবাজারকে মাদকমুক্ত করতে তারা বদ্ধপরিকর বলেও জানান তিনি। 

টেকনাফ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল বশর চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘টেকনাফের বেশ কয়েকটি এলাকায় একাধিক মাদক কারবারির বাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়েছে।  ইয়াবাসহ মাদকপাচারে ব্যবহৃত নৌকাগুলোও পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।  এগুলো কারা করছে তা বলতে চাচ্ছি না।’

এ বিষয়ে টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কে বা কারা বাড়িগুলো ভাঙছে সেগুলো আমরা জানি না। আমার মনে হয় যারা ইয়াবা পছন্দ করে না তারাই এই কাজগুলো করছে।  বিষয়টি আমরা দেখছি।  ইয়াবা কারবারিদের স্বজনরা পুলিশের বিরুদ্ধে অনর্থক মিথ্যা বলছে। ’

জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা টেকনাফসহ আশপাশের এলাকার মানুষের একসময় দৈন্যদশা ছিল।  মাছ ও লবণ চাষই ছিল সবার কাজ।  আবার কেউ কেউ বাস বা ট্রাকের হেলপার অথবা চালক ছিলেন।  বছর দশেক আগে রাতারাতি বড়লোক হওয়ায় আশায় গড়ে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ লোকই যোগ দেয় ইয়াবার কারবারে।  আর এর অন্যতম পৃষ্ঠপোষক সাবেক সাংসদ আবদুর রহমান বদি।  ইয়াবার ছোঁয়ায় রাতারাতিই কোটিপতি বনে যান অনেকে; বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠে দৃষ্টিনন্দন অট্টালিকা।  আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাকের ডগায় ওইসব অট্রালিকা থাকলেও কিছুই হয়নি। ’

সংশ্লিষ্টরা জানায়, মহেশখালীতে জলদস্যুদের আত্মসমর্পণের প্রায় চার মাস পর শীর্ষ ইয়াবা কারবারিদের আত্মসমর্পণের প্রক্রিয়া চলছে কক্সবাজার ও টেকনাফে।  ইতোমধ্যে প্রায় ৭৫ জনের মত কারবারি স্বেচ্ছায় পুলিশ হেফাজতে চলে গেছেন।  চলতি মাসের যেকোনো দিন টেকনাফে বড়সড় অনুষ্ঠান করে তাদের আত্মসমর্পণ করার কথা রয়েছে।  গত বছরের মে মাসে পুলিশ-র‌্যাবের সাঁড়াশি অভিযান শুরুর পর শীর্ষ ইয়াবা কারবারিরা কোণঠাসা হয়ে পড়লেও কেউই ধরা পড়েনি।  অভিযানকালে তাদের অনেকে এলাকায় ও কেউ কেউ ছিলেন আত্মগোপনে।  আর আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়া শুরুর পরপরই তারা পুলিশ হেফাজতে চলে গেছেন বা যাচ্ছেন। 

সরেজমিনে দেখা গেছে, সম্প্রতি টেকনাফের মৌলভীপাড়া, নাজিরপাড়া, শীলবনিয়াপাড়া, মিঠাপানিরছড়া, লম্বরীপাড়া, জালিয়াপাড়া, শাহপরীর দ্বীপসহ কয়েকটি স্থানে ইয়াবা কারবারিদের বেশ কয়েকটি বাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে।  স্বজন ও এলাকাবাসী দেশ রূপান্তরকে জানার, গভীর রাতে পুলিশই ভাঙছে বাড়িগুলো। প্রায় ১৫টির মতো বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আরও শতাধিক বাড়ি ভেঙে দেওয়া হবে বলে জানা গেছে। তারা বলছে, ইয়াবা কারবারি হওয়ার আগে তৈরি করা বাড়িও ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। আবার টেকনাফের বাইরে কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম শহরে তাদের তৈরি অট্টালিকাগুলো ভাঙা হচ্ছে না। 

শিলখালী বানিয়াপাড়া এলাকার শীর্ষ ইয়াবা কারবারি হাজি সাইফুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দেয়াল ভাঙা, তবে পুরো বাড়ি অক্ষত।  ভেতরে ঢুকতেই দেখা যায়, একটি প্রাডো গাড়ির পাশে সাইফুলের বৃদ্ধ বাবা ডা. মৌলভী মো. হানিফ বসে আছেন।  তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান আমল থেকেই আমার বাড়ির অবস্থা এই রকম।  সম্প্রতি তিনতলার কাজ শুরু করেছি। বাড়ি ভাঙতে এলে থানার ওসিকে আমি জানাই, এটা আমার বাড়ি। সাইফুল চট্টগ্রাম শহরে বাড়ি বানিয়েছে। এখানে থাকে না সে। ভাঙতে হলে তার বাড়ি ভাঙেন। তারপরও পুলিশ (বাড়ি) ভেঙে দিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘এলাকার সবাই জানে আমাদের আর্থিক অবস্থা ভালো। তারপরও কেন বাড়ি ভাঙা হলো? যদি কেউ প্রমাণ করতে পারে ইয়াবার টাকার বাড়ি, তাহলে পুলিশ পুরো বাড়িই নিয়ে নিক। তাহলে মন শান্তি পাবে। ’

মাসখানেক আগে মুণ্ডাবিল এলাকার শাকির মাঝির বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। রুহুল মিয়া নামে এক কৃষক জানান, পুলিশ এসে বাড়িটি ভেঙে দেয়।  পুলিশ তাকে বলে গেছে, ‘পুলিশ বাড়ি ভেঙেছে এই কথা কাউকে বললে তোর খবর আছে।’ জালিয়াপাড়া এলাকার সালমান ও জিকুর তিনটি বাড়িও ভেঙে দেওয়া হয়েছে। টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের সদস্য শামসুল আলম, সাবরাং বাজারপাড়ার বাসিন্দা ও শামসুলের শ্বশুর হাজি নূরুল আমিন, সদর ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের সদস্য এনামুল হক, ইউপি সদস্য আবদুল্লাহ, হ্নীলা ইউপি সদস্য নূরুল হুদা, সাইফুল করিমের ভাগ্নি জামাই ও টেকনাফ পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নূরুল বশর নুরশাদ, মৌলভীপাড়ার আবদুর রহমান, নাজিরপাড়ার জিয়াউর রহমান, নুর মোহাম্মদের আলিশান বাড়ির একাংশও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত