দেশের নদীগুলোকে ‘পাবলিক ট্রাস্ট’ ঘোষণা করে দখলকারীদের সব ধরনের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট। একই সঙ্গে নদী দখলকারীদের কোনো ব্যাংক থেকে ঋণ না দেওয়ারও নির্দেশনা দিয়েছে উচ্চ আদালত। তুরাগ নদ রক্ষায় এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুলের চূড়ান্ত রায়ে গতকাল রবিবার এসব সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা আসে।
বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি আশরাফুল কামালের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করে। রায়ের একটি অনুলিপি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানোর নির্দেশ দেয় হাইকোর্টের এ বেঞ্চ।
গত বুধবার এ সংক্রান্ত রায় ঘোষণা শুরু করে এই আদালত। ওইদিন রায়ে তুরাগকে ‘জীবন সত্তা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় হাইকোর্টের এই বেঞ্চ। এ স্বীকৃতি দেশের অন্য নদ-নদীগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে এবং এখন থেকে দেশের নদ-নদীগুলোও জীবন সত্তা হিসেবে আইনি ও সাংবিধানিক অধিকার ভোগ করবে বলে জানান সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা। পরের দিন আদালত নদী দখল, দূষণ ও তা রোধে বারবার মামলা
নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করে। দুই বিচারপতির একজন বলেন, ‘নদী নিয়ে এই কানামাছি খেলা বন্ধ হওয়া উচিত।’ গতকাল চূড়ান্ত রায়ে হাইকোর্ট নদী রক্ষায় চারটি মৌলিক সিদ্ধান্ত ও বেশ কিছু নির্দেশনা দেয়।
রাষ্ট্র দেশের সব নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত, সমুদ্রসৈকত, বন, খাল-বিল, জলাধারের মালিক হিসেবে ট্রাস্টির মতো দায়িত্ব পালন করবে বলে আদালতের রায়ের মৌলিক সিদ্ধান্তে বলা হয়। পাশাপাশি জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে দেশের সব নদ-নদীর অভিভাবক হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া রায়ের দিন থেকে সব নদ-নদী ও খাল-বিল রক্ষায় জাতীয় নদী কমিশন উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।
আদালতের নির্দেশনায় বলা হয়, নদ-নদী দখলকে অপরাধ গণ্য করে এর ভিত্তিতে সাজা, জরিমানা নির্ধারণ, অভিযোগ দায়ের পদ্ধতি সংক্রান্ত নদী রক্ষা কমিশনের আইন সংশোধন করে ৬ মাসের মধ্যে আদালতে হলফনামা আকারে দাখিল করতে হবে।
কমিশনের সংশোধনী প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে এ বিষয়ে সব বিভাগকে চিঠি ইস্যু করতে হবে। নদ-নদী সংক্রান্ত প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে নদী কমিশন থেকে অনাপত্তি নিতে হবে।
ডিজিটাল ডাটাবেজ প্রণয়নের ক্ষেত্রে স্পারসো স্যাটেলাইটের সাহায্যে আরএস/জিআইএস প্রযুক্তির মাধ্যমে সব নদ-নদীর ভৌগোলিক অবস্থান নির্ণয় করে সব জেলা, পৌরসভা, উপজেলা, ইউনিয়নের সবার জন্য উন্মুক্ত কক্ষে রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়। যেকোনো নাগরিক যাতে নির্দিষ্ট ফি দিয়ে নদ-নদীর তথ্য সংগ্রহ করতে পারে, সে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয় আদালতের রায়ে। এ ছাড়া জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে কার্যকরী ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
রায়ে নদী রক্ষায় প্রতিরোধমূলক নির্দেশনায় বলা হয়, দেশের সব স্কুল, কলেজ, মাদ্রসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শ্রেণিতে প্রতি দুই মাসে এক ঘণ্টার জন্য নদ-নদীর প্রয়োজনীয়তা ও দূষণ সম্পর্কে পাঠদান করতে হবে। এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তদারকি করবে।
ছোট-বড় সব শিল্প প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের অংশগ্রহণে দুই মাসে অন্তত এক ঘণ্টার জন্য নদী সংশ্লিষ্ট বৈঠক করতে হবে। বিষয়টি তদারকি করবে শিল্প মন্ত্রণালয়। সব জেলা, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়নগুলোতে তিন মাসে অন্তত একটি করে সেমিনার আয়োজন করে নদীর ওপর আলোচনা করতে হবে। প্রতিটি জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদের স্ব স্ব অধিক্ষেত্রে নদীর অবৈধ দখলদারদের তালিকা তৈরি করে তা পত্রিকায় প্রকাশ করতে হবে।
রায়ে আদালত বলে, কোনো ব্যক্তি ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়ার সময় যদি তার নাম নদী দখলদারের তালিকায় থাকে, তাহলে তিনি ঋণ পাওয়ার অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। এ ছাড়া জাতীয় সংসদ নির্বাচন, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের কোনো নির্বাচনে কোনো নদী দখলকারীর নাম থাকলে, তারা নির্বাচনে অযোগ্য হবেন। নির্বাচন কমিশনকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গাজীপুরের টঙ্গীতে তুরাগ তীরে মাটি ভরাট ও অবৈধ দখলের প্রতিবেদন একটি ইংরেজি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হলে এ বিষয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি)। শুনানি নিয়ে ২০১৬ সালের ৯ নভেম্বর বিচারপতি কাজী রেজাউল হক ও বিচারপতি মোহাম্মদ উল্লাহর হাইকোর্ট বেঞ্চ রুল জারি করে। সেই রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে গত বুধবার অসমাপ্ত রায় ঘোষণা করে গতকাল চূড়ান্ত রায় ঘোষণা শেষ করে আদালত।
আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্র্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) পক্ষে ছিলেন আইনজীবী সৈয়দ মফিজুর রহমান, রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষের (রাজউক) পক্ষে ছিলেন আইনজীবী ইমাম হাসান। এ ছাড়া বিবাদীপক্ষে আইনজীবী ছিলেন আসাদুজ্জামান, মাহবুব উদ্দিন খোকন, সাকিব বিন মাহবুব। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল একরামুল হক টুটুল।
