শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৪, ৭ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

পরমাণু যুদ্ধের ভয় বাড়াচ্ছে যেসব অস্ত্র

আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১২:১৭ এএম

পরমাণু যুদ্ধের ভয় সব মানুষের মধ্যেই ভয়ের শীতল স্রোত বইয়ে দেয়। তবে তাতে তো আর ঝুঁকিটা কমে না। পরমাণু আর প্রচলিত অস্ত্রের মধ্যকার ব্যবধানটা ক্রমেই কমে আসছে বলে ভয়ংকর আশঙ্কাটির মাত্রা বরং বাড়ছে। সত্যি বলতে, পরমাণু আর অপারমাণবিক অস্ত্র কখনোই একটি অন্যটির থেকে পুরোপুরি আলাদা ছিল না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় বি-২৯ বোমারু বিমানের কথা। এর নকশা করা হয়েছিল প্রচলিত বোমা ফেলার জন্যই। কিন্তু ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট ‘এনোলা গে’ নামে এ ধরনের একটি বিমানই জাপানের হিরোশিমা শহরের ওপর পারমাণবিক বোমা ফেলেছিল।

হিরোশিমার পর ৭৪ বছর কেটেছে। এখন বিশে^র নয়টি দেশ বেশ কয়েক হাজার পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী। আর ওইসব অস্ত্র ক্রমেই বেশি করে অপারমাণবিক অস্ত্রের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে।

১৯৮৬ সালে বিশে^ পরমাণু অস্ত্রের মজুদ ছিল সর্বকালের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রায় ৬৪ হাজার। তখন থেকে এ অস্ত্রের সংখ্যা কমে এসেছে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, এ যুগের কিছু পরমাণু অস্ত্রের ধ্বংসক্ষমতা হিরোশিমায় ছোড়া বোমার চেয়ে প্রায় তিনশ গুণ বেশি। যুক্তরাজ্য ছাড়া সবগুলো পরমাণু অস্ত্রধারী দেশের কাছে দ্বৈত ব্যবহার উপযোগী অস্ত্র আছে যেগুলো কিনা পরমাণু অথবা প্রচলিত উভয় ধরনের যুদ্ধাস্ত্র নিক্ষেপে সক্ষম। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র যার পাল্লা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। যেমন রাশিয়ার সম্প্রতি মোতায়েন করা ৯এম৭২৯ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। এটি ভূমি থেকে নিক্ষেপণযোগ্য। যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা, রাশিয়ার এই নতুন ক্ষেপণাস্ত্রটি দ্বৈত ব্যবহার উপযোগী এবং তা ৫০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে সফলভাবে পরীক্ষিত। রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র মাঝারি এবং মধ্যবর্তী পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ সংক্রান্ত যে চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগ করেছে তার পেছনে রয়েছে এই ৯এম৭২৯ ক্ষেপণাস্ত্রই। যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি এ চুক্তি থেকে তার সরে যাওয়ার কথা ঘোষণা করেছে। এতে করে নতুন করে অস্ত্র প্রতিযোগিতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে চীন কিছুদিন ধরে তার সাম্প্রতিকতম ক্ষেপণাস্ত্র আড়াই হাজার কিলোমিটারের বেশি পাল্লার ডিএফ-২৬ দেখাচ্ছে বিশ^কে। মনে করা হচ্ছে, ডিএফ-২৬ বর্তমানে নিখুঁত লক্ষ্যে আঘাত হানতে সক্ষম বিশে^র এমন সবচেয়ে দূরপাল্লার দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র।

বেশ কয়েকটি সম্ভাব্য পরিস্থিতিতে এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র অনিচ্ছাকৃতভাবে পরমাণু যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিতে পারে। সবচেয়ে সাধারণ যেটি হতে পারে তা হচ্ছে, এগুলোর সঙ্গে প্রচলিত অস্ত্র যুক্ত করে ছোড়া হলেও প্রতিপক্ষ তা পরমাণু বলে ভুল বুঝতে পারে। এই অস্পষ্টতার কারণে তারা তৎক্ষণাৎ পরমাণু অস্ত্র দিয়েই পাল্টা আঘাত করে বসতে পারে। আক্রান্ত পক্ষ এই পথই অবলম্বন করবে নাকি বোমাটি বিস্ফোরিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে তা বোঝা অবশ্য মুশকিল।

বাস্তবে দ্বৈত ব্যবহার উপযোগী ক্ষেপণাস্ত্রের প্রকৃত বিপদটা হয়তো অন্যখানে: ভুল বোঝার ঘটনা ঘটে যেতে পারে অস্ত্র নিক্ষিপ্ত হওয়ার আগেই। ভাবুন, চীন লরিতে স্থাপিত ডিএফ-২৬ কে পরমাণু অস্ত্রসজ্জিত করে দেশটির বিভিন্ন স্থানে মোতায়েন করল। ক্ষেপণাস্ত্রগুলোতে প্রচলিত অস্ত্র যুক্ত করা হয়েছে ধরে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সেগুলো ধ্বংস করার সিদ্ধান্তÍ নিতে পারে। এগুলোর ওপর আক্রমণ চালিয়ে দেশটি চীনকে সত্যিকারের পরমাণু অস্ত্র নিক্ষেপে উসকে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ধ্বংস করার আগেই সেগুলো তার দিকে নিক্ষেপ করে বসতে পারে চীন।

তবে দ্বৈত ব্যবহার উপযোগী ক্ষেপণাস্ত্রই প্রচলিত ও পরমাণু অস্ত্র মিলিয়ে ফেলার একমাত্র ক্ষেত্র নয়। এর মধ্যে আরও বিষয় আছে। যেমন সব ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাতেই যোগাযোগ প্রযুক্তির বিষয়টি আছে যার মধ্যে থাকে কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট। এই পরমাণু কমা- অ্যান্ড কন্ট্রোল ব্যবস্থা ক্রমশই বেশি করে অপারমাণবিক অস্ত্র ব্যবস্থাপনার কাজেও ব্যবহৃত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু অস্ত্র কিংবা প্রচলিত অস্ত্রে সজ্জিত ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হামলার ব্যাপারে সতর্ক করে দিতে স্যাটেলাইট ব্যবহার করে। ন্যাটো ও রাশিয়ার মধ্যে সংঘাতের ক্ষেত্রে রাশিয়ার ছোড়া স্বল্পপাল্লার প্রচলিত যুদ্ধাস্ত্রবাহী ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র চিহ্নিত করার কাজে এ স্যাটেলাইট ব্যবহৃত হতে পারে। এটি হবে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো গুলি করে ভূপাতিত করার পথে প্রথম পদক্ষেপ। কিন্তু এই কৌশল সফল হলে রাশিয়া এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের আগাম সতর্কতা দেওয়া স্যাটেলাইটগুলোকেই লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। সত্যি বলতে কি, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দারা এরই মধ্যে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ঠিক এ কাজের জন্যই রাশিয়া ভূমিভিত্তিক লেজার অস্ত্র তৈরি করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের আগাম সতর্কতা দেওয়া স্যাটেলাইটগুলোকে অচল করা শুধু দেশটির প্রচলিত যুদ্ধাস্ত্রবাহী ক্ষেপণাস্ত্রগুলো চিহ্নিত করার ক্ষমতাই নষ্ট করবে না, পরমাণু অস্ত্রসজ্জিত ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র চিহ্নিত করার ক্ষমতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এর ফলে রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের ওপর পারমাণবিক হামলার পাঁয়তারা কষছে এমন আশঙ্কা বাড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিকতম পারমাণবিক প্রস্তুতি পর্যালোচনায় প্রচ্ছন্নভাবে হুমকি দেওয়া হয়েছে যে, কোনো দেশ তার পরমাণু কমা- অ্যান্ড কন্ট্রোল ব্যবস্থার ওপর আক্রমণ করলে তার বিরুদ্ধে পরমাণু অস্ত্র প্রয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। প্রসঙ্গত, ওই পর্যালোচনা হচ্ছে মার্কিন সরকারের পরমাণু নীতি বিষয়ক মুখ্য দলিল। এক্ষেত্রে ওই হামলাকারী দেশই প্রথমে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করল কি না করল তা বিবেচনায় ধরবে না যুক্তরাষ্ট্র। একরকম নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, পরমাণু অস্ত্রধারী দেশগুলোর সরকারগুলো প্রচলিত ও পরমাণু অস্ত্র ক্রমেই বেশি করে পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন। এর সঙ্গে যুক্ত অন্তত কিছুসংখ্যক বিপদের কথাও নিশ্চয়ই তাদের মাথায় আছে। তবে মুশকিল হচ্ছে, এই ঝুঁকিগুলো কমানোর উদ্যোগের ব্যাপারটিকে দৃশ্যত কেউ অগ্রাধিকার দিচ্ছে না। এখনো সবার মনোযোগ মূলত নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়ে যাওয়ার দিকে যার লক্ষ্য একে অন্যকে প্রতিহত করা।

এ পরিস্থিতিতে দেশগুলোর করণীয় কী হতে পারে? তারা কারও পরমাণু কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত স্যাটেলাইটকে হুমকির মুখে ফেলে এমন ধরনের অস্ত্র নিষিদ্ধ করে পরস্পরের মধ্যে চুক্তি করতে পারে। তবে এই মুহূর্তে পরমাণু অস্ত্রধারী দেশগুলোর সরকারগুলো এ নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসতে আগ্রহই দেখাচ্ছে না। আর এ কারণেই এ ধরনের সহযোগিতার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলেই মনে হচ্ছে।

(জেমস অ্যাকটন কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর নিউক্লিয়ার পলিসি প্রোগ্রাম-এর সহ-পরিচালক। বিবিসির অনুরোধে তিনি এ বিশ্লেষণটি করেছেন)

বিবিসি থেকে ভাষান্তর করেছেন আবু ইউসূফ

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত