বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ৪ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

কমিশন বাদ দিয়ে টাস্কফোর্স

আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০২:১০ এএম

খেলাপি ঋণ আদায় ও ঋণ দেওয়ায় অনিয়ম ঠেকানোসহ ব্যাংক খাতের সার্বিক সংস্কারে সদ্য সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের শক্তিশালী কমিশন গঠনের প্রস্তাব বাদ দিয়ে ‘টাস্কফোর্স’ গঠন করতে যাচ্ছে সরকার। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব নতুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে এ উদ্যোগকে ‘সময়ক্ষেপণের কৌশল’ হিসেবে দেখছেন ব্যাংক খাত বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, টাস্কফোর্স গঠনের আগে বিদ্যমান আইন ও বিধিমালার প্রয়োগ জরুরি। কিন্তু সরকার জেনেশুনেই ব্যাংক খাতের সমস্যাগুলোর বিষয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছে না।বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, খেলাপি ঋণ কমাতে নতুন অর্থমন্ত্রীর নির্দেশের পর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলাম ও গভর্নর ড. ফজলে কবির টাস্কফোর্স গঠনে একমত হয়েছেন। তাদের যুক্তি হলোÑ বাংলাদেশ ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলো খেলাপি কমাতে যার যার মতো করে উদ্যোগ নিলে আরও বেশি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে। সে কারণেই একটি টাস্কফোর্স গঠন করে সমন্বিত সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে তা কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) এক কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে টাস্কফোর্স গঠন করার বিষয়ে গত সপ্তাহে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে মন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

টাস্কফোর্স গঠনে মন্ত্রীর কাছে পাঠানো প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ‘খেলাপি ঋণ গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে কমিয়ে আনার লক্ষ্যে আইন সংশোধন, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি, আর্থিক প্রণোদনাসহ অন্যান্য সম্ভাব্য প্রশাসনিক ব্যবস্থাদি পরীক্ষাপূর্বক ক্ষেত্রবিশেষে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ কিংবা সুপারিশ পেশ করার নিমিত্ত বাংলাদেশ ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকসমূহ, বেসরকারি ব্যাংকসমূহ, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এবং প্রয়োজনবোধে অন্যান্য অংশীজনের সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করার পরামর্শ প্রদান করা যেতে পারে। টাস্কফোর্সের কার্যপরিধি ও সময়সীমা বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনাক্রমে সুনির্দিষ্ট করা যেতে পারে।’

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় ২০০৯ সালে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। গত সেপ্টেম্বর শেষে তা বেড়ে হয়েছে ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। অর্থাৎ ১০ বছরে দেশে খেলাপি ঋণ বেড়েছে সাড়ে চারগুণ। ঋণ খেলাপের জোয়ার থামাতে ও ব্যাংক খাত সংস্কারে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গত বছর জুলাই মাসের পর ব্যাংক কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেন। কিন্তু সরকারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. ইউনুসুর রহমানের পরামর্শে পরবর্তী অর্থমন্ত্রীর জন্য কমিশন গঠনের খসড়া প্রস্তুত করে রেখে যান মুহিত। কিন্তু শপথের দিন রাতেই আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে নতুন অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘ব্যাংক কমিশন গঠনের কোনো দরকার নেই। কারণ, এ খাতের সমস্যাগুলো আমাদের জানা।’ এরপর তিনি টাস্কফোর্স গঠনের উদ্যোগ নেন।

এ ধরনের টাস্কফোর্স গঠন করে কোনো লাভ হবে না মন্তব্য করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর প্রতি মাসে বৈঠক করেন। খেলাপি ঋণ আদায়ে কোথায় সমস্যা রয়েছে তা বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অন্য ব্যাংকগুলোর অজানা নয়। প্রভাবশালীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ে কোনো উদ্যোগ না নিয়ে টাস্কফোর্স গঠন করা শুধুই সময় অপচয় ছাড়া আর কোনো ফলদেবে না।’  ব্যাংক খাতের বাইরের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে ‘স্বাধীন ব্যাংকিং কমিশন’ গঠনের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, এই কমিশন স্বাধীনভাবে ব্যাংক ও ব্যবসায়ীসহ সকল পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যাংক খাত সংস্কারে পরামর্শ দেবে।

তবে খেলাপি আদায়ে নতুন অর্থমন্ত্রীর উদ্যোগ বিচারের আগে তাকে আরেকটু সময় দেওয়ার পক্ষে আরেক সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিন। গতকাল তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খেলাপি আদায়ে নতুন অর্থমন্ত্রী উদ্যোগ নিয়েছেন। তাকে আরেকটু সময় দিলেই স্পষ্ট হবে তিনি কী করবেন। তবে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণ আদায় ও ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেশে যথেষ্ট আইনকানুন আছে। সেগুলো সঠিকভাবে প্রয়োগ করলেই খেলাপি বন্ধ করা যাবে। তাই আগে আইনগুলো প্রয়োগ করা দরকার।’

এ বিষয়ে দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মো. শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ব্যাংকগুলো প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের শত শত কোটি টাকার ঋণ এক শতাংশ, পাঁচ শতাংশ সুদে ১৫-২০ বছর মেয়াদে পুনঃতফসিল করছে। আবার যাদের প্রভাব নেই, তাদের কোনো সুবিধা দিচ্ছে না। এগুলো বন্ধ করতে হবে। তা না করে শুধু টাস্কফোর্স গঠন করে আইন সংশোধন করলে কোনো সুফল পাওয়া যাবে না।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ। এ সময়ে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা অবলোপন করেছে ব্যাংকগুলো; প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা পুনঃতফসিল করা হয়েছে, ১৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠনের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিতরণ করেছে ১ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ। এর মধ্যে খেলাপি হয়েছে ৪৮ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ২৩ শতাংশ। একই সময়ে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ করেছে ৬ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪৩ হাজার কোটি টাকা খেলাপি হয়েছে, যা মোট ঋণের ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ।

গত ২৬ ডিসেম্বর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলাম রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) নিয়ে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকের তথ্য অনুযায়ী, বেসিক ব্যাংকের আদায়যোগ্য ঋণের ৬০ দশমিক ১৮ শতাংশ, সোনালী ব্যাংকের ২৯ দশমিক ৪১ শতাংশ, জনতা ব্যাংকের ২৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ, অগ্রণী ব্যাংকের ১৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ, রূপালী ব্যাংকের ২০ দশমিক ১৫ শতাংশ ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডের ৪৪ দশমিক ৭৩ শতাংশই খেলাপি। এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমিয়ে ৯ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।

তবে বেশকিছু আইন সংশোধনের জন্য টাস্কফোর্স গঠনের পক্ষে মত দিয়েছেন সোনালী ব্যাংকের সাবেক এমডি প্রদীপ কুমার দত্ত। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, অর্থঋণ আইন হওয়ার পরও ঋণখেলাপিদের দৌরাত্ম্য কমছে না। তারা এক ব্যাংকে খেলাপি হয়ে উচ্চ আদালতে রিট করে স্থগিতাদেশ নিয়ে এসে অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে। এগুলো বন্ধ করতে বেশ কিছু আইন সংশোধন করতে হবে। একটি টাস্কফোর্স গঠন করে এসব করা যেতে পারে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত