হজের পর বিশ্বের মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় জমায়েত বিশ্ব ইজতেমা শুরু হচ্ছে আজ। এরই মধ্যে দেশ-বিদেশের লাখ লাখ মুসল্লি সমবেত হয়েছেন রাজধানী ঢাকার অদূরে টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে। এখানে বিশ্বের বড় বড় ইসলামি প-িতরা বাংলাদেশ ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মুসল্লিদের মাঝে ধর্মীয় বয়ান করবেন। বিশ্বমানবের শান্তি ও কল্যাণ কামনা করে আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এ জমায়েত।গত শতকের তিরিশের দশকে লক্ষেèৗর হজরত মওলানা ইলিয়াস (রহ.) যে তাবলিগ জামাতের সূচনা করেন পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশেও এর ব্যাপক বিস্তার ঘটে। এ পরিপ্রেক্ষিতেই বিশ্ব ইজতেমার উদ্ভব হয়। বাংলাদেশে প্রথম ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয় ১৯৪৬ সালে বর্তমান কাকরাইল মসজিদ-সংলগ্ন মাঠে। এরপর ১৯৪৮ সালে দ্বিতীয় বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয় চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর হাজি ক্যাম্প-সংলগ্ন মাঠে। ১৯৫৮ সালে তৃতীয় বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয় নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে। এরপর ১৯৬৭ সাল থেকে টঙ্গীর তুরাগ তীরে বর্তমান জায়গায়ই ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এবারে হচ্ছে বিশ্ব ইজতেমার ৫৪তম সমবেশ। এই মহতী সমাবেশ এখন মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধ ও সংহতি প্রতিষ্ঠায় এক অনন্য ভূমিকা পালন করছে।
এবারই প্রথম ইজতেমা অনুষ্ঠিত হবে চার দিনে, পৃথকভাবে পরিচালনা করবে বিবদমান দুই পক্ষ। নানা তর্ক-বিতর্ক ও সংঘাতের পর ইজতেমা আয়োজনের সংবাদে দেশের সাধারণ মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। ইজতেমা ও তাবলিগকে ধর্মপ্রাণ মানুষ শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি হিসেবেই দেখতে চায়। সাম্প্রতিক অতীতে যে সংঘাত ও হিংসার ঘটনা ঘটেছে তার পুনরাবৃত্তি কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়।
বস্তুত বিশ্ব ইজতেমার সঙ্গে এখন বাংলাদেশের ভাবমূর্তি জড়িত। যদিও তাবলিগ জামাতই এর মূল আয়োজক; এই দীর্ঘ পরিক্রমায় জমায়েতটি পরিণত হয়েছে মুসলিম জাহানের অন্যতম বৃহৎ মহাসম্মিলনে। আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রীয় বা জাতীয় অনুষ্ঠান না হলেও ইজতেমা সুশৃঙ্খল রাখতে ও সফল করে তুলতে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ছাড়াও রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো সর্বাত্মক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে আসছে। বস্তুত এটাই বিশ্ব ইজতেমার দশক-দশক চর্চিত ঐতিহ্য। কিন্তু আমরা সম্প্রতি দেখছি তাবলিগ জামাতের মধ্যে যে বিভেদ তা এর শান্তিপূর্ণ ভাবাদর্শকে বিঘিœত করছে। আগেও যে বিভেদ দেখা যায়নি তা নয়। তবে তখন তাবলিগের মুরব্বিরা আলোচনায় বসে এগুলোর সমাধান করেছেন। সেই বিভেদ এরকম প্রকাশ্য সংঘাতে রূপ নেয়নি। ইজতেমায় এমন সংঘাত কখনোই কাম্য নয়। এজতেমা যেন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয় সেই দায়িত্ব যেমন তাবলিগের মুরব্বিদের রয়েছে, তেমনি সরকারেরও রয়েছে। ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল কোনো ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য না দেওয়ার জন্য হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। শুধু নিজেদের ব্যাপারেই উসকানিমূলক বক্তব্য নয়, কোনো ধর্ম বা গোষ্ঠীর ব্যাপারেও যেন কটাক্ষ না করা হয় সে ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। তাবলিগ জামাত সবসময়েই রাজনীতির বাইরে থেকেছে। তাই তাদের মধ্যে যেন রাজনৈতিক অন্তর্কোন্দল না ঘটে, তারা যেন রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থেকে ধর্মপ্রচারে মগ্ন হয় সেই দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সকলের। আমরা অতীতে দেখেছি, ইজতেমায় হাজার হাজার মানুষ যেভাবে পরস্পরকে ছাড় ও সুবিধা দেওয়ার দৃশ্যমান প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়, তার নজির বিরল। ইজতেমার বাইরেও এই তাবলিগের সদস্যরা যেভাবে ব্যক্তিগত সাধ্য ও সামর্থ্য দিয়ে গোটা বিশ্বে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর কাজ এবং জীবনঘনিষ্ঠ ধর্মাচরণ শিক্ষাকে নিজেদের ব্রত হিসেবে নিয়েছেন; তারা যেন তাদের সেই ব্রতের মধ্যেই নিজেদের আবদ্ধ রাখেন। সংকীর্ণ গোষ্ঠীবাদিতা পরিহার করে তারা তাবলিগের মূল আদর্শে ফিরে গিয়ে ইজতেমাকে সার্থক করে তুলবেন এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
