‘ফারমার্স’ ব্যাংকে টাকা রেখে ফেঁসে গেছে বিটিআরসি

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১০:৩৪ পিএম

ফারমার্স নাম মুছে ফেলে পদ্মা নামে যাত্রা শুরু করলেও পুরনো অর্থ সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেনি ব্যাংকটি। রাষ্ট্রায়ত্ত কয়েকটি ব্যাংক থেকে মূলধন জোগান নেওয়ার পরও আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না ব্যাংকটি। আর আমানতের টাকা না পেয়ে বেকায়দায় পড়ছে আমানত রাখা প্রতিষ্ঠানগুলো।

বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি ব্যাংকটিতে অর্থ রেখে সময়মতো ফেরত না পাওয়ায় আইন লঙ্ঘনের মুখে পড়তে যাচ্ছে। বাধ্য হয়ে সংস্থাটি আমানতের টাকা ফেরত পেতে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সার্বিক সহযোগিতা চেয়েছে।

বিটিআরসির চেয়ারম্যান মো. জহুরুল হক গত ১০ ফেব্রুয়ারি মুস্তফা কামালের কাছে চিঠি লিখে ব্যাংকটিতে রাখা আমানতের অর্থ ফেরত পেতে সহযোগিতা চেয়ে আবেদন করেছেন। আবেদনে তিনি বলেছেন, ব্যাংকটির পাঁচ শাখায় বিটিআরসি ৩৮ কোটি টাকা মেয়াদি আমানত রেখেছিল। ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর তাদের আমানতের মেয়াদ শেষ হলেও অদ্যাবধি সুদাসলের অর্থ ফেরত দেয়নি ফারমার্স ব্যাংক, যা এখন পদ্মা ব্যাংক লিমিটেড নামে পরিচিত।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন অনুযায়ী, বিটিআরসির রাজস্ব আয়ের অর্থ ছয় মাসের ব্যয় নির্বাহের পর বাকি অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সে অনুযায়ী, ব্যাংকটিতে রাখা আমানতের অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা দেওয়ার শেষ সময় ছিল গত ৩১ ডিসেম্বর। কিন্তু ব্যাংক থেকে টাকা না পাওয়ায় তারা তা জমা দিতে পারেনি। আর আমানত রাখা ওই অর্থ নবায়নের সুযোগও নেই বিটিআরসির কাছে। 

বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটি রাজস্ব আয়ের অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্ধারিত সময়ের আগ পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংকে আমানত রাখে। সর্বোচ্চ সুদ হার বিবেচনায় নিয়ে ২০১৭-২০১৮ অর্থবছর বিটিআরসির ৩৮ কোটি টাকা বর্তমান পদ্মা ব্যাংকের বসুন্ধরা, ইমামগঞ্জ, মিরপুর, মতিঝিল শাখা ও গুলশান করপোরেট শাখায় আমানত রাখা হয়। ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর এসব আমানতের মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে সুদাসলে বিটিআরসির পাওনার পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৮ কোটি ৫৯ লাখ ৪৭ হাজার টাকা।

অর্থমন্ত্রীকে লেখা চিঠিতে জহুরুল হক বলেছেন, মেয়াদ শেষে সুদসহ টাকা ফেরত চাইলেও ব্যাংক তা ফেরত দেয়নি। পরে ব্যাংকটির শাখা ব্যবস্থাপক, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালককে (এমডি) একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়। অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. ফজলে কবিরকেও চিঠি দেয় বিটিআরসি। বিষয়টি নিয়ে বিটিআরসির চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান, এমডিসহ ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেও অর্থ ফেরত পায়নি বিটিআরসি।

জহুরুল হক বলেছেন, পরে বিষয়টি অবগত করতে অর্থমন্ত্রী, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রীকেও অবহিত করা হয়েছে। গত ৪ আগস্ট অনুষ্ঠিত এক সভায় ব্যাংকটি জানায়, যে ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে পাঁচটি শাখা রাখা আমানতের অর্থ সুদাসলে ফেরত দেওয়া হবে। বাস্তবে এখনো ওই অর্থ ফেরত দেয়নি ব্যাংক।

আমানতের অর্থ ফেরত না পাওয়ায় বিটিআরসির আইন লঙ্ঘন হওয়ার বিষয় তুলে ধরে সংস্থাটির চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন, ২০০১-এর ২১(৪) ধারায় কমিশন উহার আহরিত রাজস্ব প্রতি ছয় মাসের সকল ব্যয় নির্বাহের পর উদ্বৃত্ত অর্থ প্রজাতন্ত্রের সংযুক্ত তহবিলে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তদানুযায়ী বিটিআরসির আমানতকৃত অর্থ নবায়নের কোনো সুযোগ না থাকায় ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখের পর মেয়াদি আমানতকৃত সমুদয় অর্থ প্রজাতন্ত্রের সংযুক্ত তহবিলে জমা প্রদান না করায় আইনের ব্যত্যয় ঘটেছে।’ 

অর্থমন্ত্রীর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বিটিআরসির চিঠি পাওয়ার পর এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে তা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলামের কাছে পাঠিয়েছেন অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল।

রাজনৈতিক বিবেচনায় ২০১৩ সালে অনুমোদন পাওয়া নতুন ৯ ব্যাংকের একটি ফারমার্স ব্যাংক। গত ২৯ জানুয়ারি থেকে ব্যাংকটি পদ্মা ব্যাংক লিমিটেড নামে পরিচালিত হচ্ছে। ২০১৩ সালে যাত্রা শুরুর পর চার বছর না পেরোতেই চরম সংকটে পড়ে ব্যাংকটি। পরিস্থিতির চরম অবনতি হওয়ায় একপর্যায়ে পদ ছাড়তে বাধ্য হন ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর। ব্যাংকটির তখনকার এমডি এ কে এম শামীমকেও অপসারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ব্যাংকটি বাঁচাতে মূলধন সহায়তা দিচ্ছে সরকারি চার ব্যাংক ও একটি বিনিয়োগ সংস্থা। মূলধন সহায়তা দিয়ে রাষ্ট্রমালিকানাধীন সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী ব্যাংক এবং ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) ব্যাংকটির পর্ষদের পরিচালক হয়েছে। এ ছাড়া শুরু থেকেই ব্যাংকটিতে এসব প্রতিষ্ঠানের ৫৫০ কোটি টাকা ধার রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত