মুক্তির পথে ম্যান্ডেলার দীর্ঘ যাত্রা

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৯:৫৭ পিএম

‘লং ওয়াক টু ফ্রিডম’ বইটিতে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ বিরোধী সংগ্রামের কথা বর্ণিত হয় এমন একজনের দৃষ্টিতে যে এই সংগ্রামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যোদ্ধা। নেলসন ম্যান্ডেলা তার এই আত্মজীবনীতে সবিস্তারে বর্ণনা করেন তার শৈশব, শিক্ষাজীবন, মুক্তিকামী যোদ্ধা হিসেবে তার বেড়ে ওঠা, ২৭ বছরের জেলজীবন এবং গণতান্ত্রিক দক্ষিণ আফ্রিকা গঠনে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা। রুবেন দ্বীপের কারাগারে বন্দি থাকার সময় ১৯৭৪ সালে ম্যান্ডেলা বইটি লিখতে শুরু করেন। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ১৯৯৪ সালে ‘লিটল ব্রাউন অ্যান্ড কোম্পানি’ নামক প্রকাশনা সংস্থা থেকে বইটি প্রকাশিত হয়। বইটির গল্প শুরু হয় দক্ষিণ আফ্রিকার প্রত্যন্ত অঞ্চল ট্রান্সকেই থেকে এবং প্রথমেই তিনি চলে যান তার বংশবৃত্তান্ত বর্ণনায়। নেলসন ম্যান্ডেলা ১৯১৮ সালের ১৮ জুলাই মভেজো নামের ছোট্ট একটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা তার নাম রাখেন ‘রলিহলাহলা’। ঝোসা (ঢযড়ংধ) ভাষায় এই নামের আক্ষরিক অর্থ হলো ‘কোনো একটা গাছের ডাল টানা,’ তবে কথ্য ভাষায় শব্দটির রূপকার্থ হলো ‘বিঘœ সৃষ্টিকারী’। পরবর্তী জীবনে তিনি শাসকদের জন্য এত বেশি ‘বিঘœ সৃষ্টি’ করেছেন বা এতবার বিপদের সম্মুখীন হয়েছেন যে নামটি তার জীবনের সঙ্গে খুবই খাপ খেয়ে যায়। পড়াশুনা করার সুবিধা তার গ্রামের শিশুরা খুব কমই পেত। তবে ম্যান্ডেলা বেড়ে উঠলে তার মধ্যে সম্ভাবনা দেখতে পেয়ে তার বাবা তাকে একটি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। পড়াশুনায় ভালো করতে থাকলে তার এক চাচা দামি বোর্ডিং স্কুলগুলোতে তার শিক্ষার ব্যয়ভার বহন করেন। স্কুলজীবনেই আইন শিক্ষার প্রতি তার একটা আগ্রহ তৈরি হয়। যাহোক, যুবক ম্যান্ডেলা জোহানসবার্গে এসে একটি ল’ ফার্মে কাজ শুরু করেন এবং ‘পৃথকীকরণ আইনের’ (অঢ়ধৎঃযবরফ খধংি) কবলে পড়া কালো মানুষদের আইনি সহায়তা দিতে থাকেন। এক পর্যায়ে তিনি তার এক বন্ধুর মাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকার কালো মানুষদের অধিকার আদায়ে সংগ্রামরত সংগঠন আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস-এ (এএনসি) যোগ দেন। খুব দ্রুতই তিনি সংগঠনটির ইয়ুথ লিগের নেতৃত্বে চলে আসেন।

উপনিবেশিক দক্ষিণ আফ্রিকা অনেক দিন ধরেই বর্ণবাদী শাসনের অধীন ছিল। তবে ১৯৪৮ সালে শুধু সাদাদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে রক্ষণশীল ন্যাশনাল পার্টি ক্ষমতায় আরোহণের পর অবস্থা আরও খারাপের দিকে যায়। এই সরকার দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী আইনকে আরও মজবুত এবং বিস্তৃত করার পাশাপাশি প্রবর্তন করে ‘পৃথকীকরণ আইন’। এই আইন শুধু দক্ষিণ আফ্রিকার নানা জাতিগোষ্ঠী সমূহকে পৃথক রাখার জন্যই তৈরি হয়নি, এটা বিশেষ ভাবে তৈরি হয়েছিল দেশটির সংখ্যালঘু সাদাদের নানা ধরনের আধিপত্য ও সুযোগ-সুবিধা প্রদান করার নিমিত্তে। এই পৃথকীকরণ আইনে আফ্রিকান, মিশ্র বর্ণের জাতি এবং ভারতীয় দক্ষিণ আফ্রিকানদের জন্য নিষিদ্ধ হয় সাদাদের গণপরিবহনে যাতায়াত, সাদাদের প্রমোদ অঞ্চলে প্রবেশ এবং সাদা চামড়ার মানুষদের সঙ্গে বসে খাবার গ্রহণ। এক জাতের সঙ্গে অন্য জাতের প্রণয় সম্পর্ক ছিল অবৈধ। প্রতিটি জাতির জন্য তৈরি করা হয় আলাদা আলাদা শিক্ষাব্যবস্থা। তন্মধ্যে কালো মানুষদের শিক্ষাব্যবস্থা ছিল সবচেয়ে নিম্নমানের। আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস এবং এর সহযোগী সংগঠনগুলো পৃথকীকরণ আইনের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয় এবং ১৯৫১ সালে প্রকাশ্য অবাধ্যতা আন্দোলন শুরু করে। এই আন্দোলন দক্ষিণ আফ্রিকার উদারপন্থী সাদা এবং পুরো বিশ্বের মানুষের সহানুভূতি অর্জন করে। যদিও এই প্রকাশ্য অবাধ্যতা আন্দোলন পৃথকীকরণ আইন বাতিল করতে পারেনি, তবে ম্যান্ডেলা মনে করেন এই আন্দোলন সফল কারণ এটা দক্ষিণ আফ্রিকার মুক্তিকামী সংগঠনগুলোর মধ্যে সম্পৃক্ততা এবং সংগঠনগুলোর ভেতরে এক ধরনের আত্মবিশ্বাস তৈরিতে সক্ষম হয়।

১৯৫৫ সালে ম্যান্ডেলা দক্ষিণ আফ্রিকার সকল জাতিগোষ্ঠীর সম্মেলন সংগঠিত করায় নেতৃত্ব প্রদান করেন। এই সম্মেলনের মূল বিষয় ছিল স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ। পৃথকীকরণ আইন সমর্থনকারী নেতারা এই স্বাধীনতার ইশতেহারকে অবৈধ কম্যুনিস্ট দলিল বলে প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯৬০ সালে শার্পভিলেতে কালো আন্দোলনকারীদের ওপর সংগঠিত গণহত্যার পর ম্যান্ডেলা সহিংসতাকে তুলে নেন বৈধ অস্ত্র হিসেবে। তিনি আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের ‘সামরিক শাখা’, ‘দ্যা এমকে’-এর প্রধানের দায়িত্ব নেন এবং নিজেকে নিয়োজিত করেন সামরিক প্রশিক্ষণে। বিধ্বংসী কার্যকলাপ থেকে শুরু করে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনায় তিনি কার্যকরী পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। ১৯৬৪ সালে নাশকতামূলক মামলায় ন্যাশনাল কংগ্রেসের অন্য নেতাদের সঙ্গে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে রুবেন আইল্যান্ড কারাগারে প্রেরিত হন। সেখানে বিছানা এবং আসবাবপত্রহীন একটি ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠে তার দীর্ঘ বন্দিজীবন শুরু হয় এবং তাকে নিয়োজিত করা হয় দ্বীপটির খনি অঞ্চলে কঠোর শারীরিক পরিশ্রমের কাজে। ছয় মাসে একবার তিনি একটি চিঠি পাঠানোর এবং পাওয়ার অনুমতি পেতেন এবং বছরে একবার মাত্র ৩০ মিনিটের জন্য কোনো একজন দর্শনার্থীর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পেতেন। এসব সত্ত্বেও ম্যান্ডেলা কখনো ভেঙে পড়েননি বরঞ্চ কারাগারের নানা অন্যায়-অবিচার-নির্যাতন ও ভয়ানক শারীরিক পরিশ্রমের কাজে রাজবন্দিদের নিয়োজিত করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চালিয়ে যান এবং নিষ্ঠুর প্রকৃতির আফ্রিকানার জেলারদের কাছ থেকে সমীহ আদায় করে নেন।

১৯৮৫ সালে ম্যান্ডেলাকে রুবেন আইল্যান্ড থেকে ফিরিয়ে এনে গৃহবন্দি অবস্থায় রাখা হয় এবং ১৯৯০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি পুরোপুরি মুক্তিলাভ করেন। এই সময়কালে ম্যান্ডেলা প্রেসিডেন্ট এফ.ডব্লিও.ডি ক্লার্কের নেতৃত্বে গঠিত তৎকালীন সরকারের সঙ্গে পৃথকীকরণ আইন বাতিল এবং গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত আলোচনায় আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসকে নেতৃত্ব প্রদান করেন। ১৯৯৩ সালে তিনি ডি ক্লার্কের সঙ্গে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। এর এক বছর পর দেশটির প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনে আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস জয়লাভ করে এবং ম্যান্ডেলা দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২৭ বছরের জেলজীবন একজন মানুষকে উগ্র ব্যক্তিতে পরিণত করার জন্য যথেষ্ট। তবে ম্যান্ডেলার ক্ষেত্রে ঘটে পুরোপুরি উল্টো ঘটনা। যাদের সহজেই তার শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা যায় তাদের সঙ্গে আলোচনা এবং কাজ করতে কখনো তাকে অনিচ্ছুক হতে দেখা যায়নি। ক্ষোভ বা প্রতিশোধস্পৃহা নয়, ক্ষমার মাহাত্ম্য দেখিয়েছেন ম্যান্ডেলা। আর এ কারণেই তিনি পরিণত হন সকলের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে।

লেখক : অনুবাদক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত