জীবিকা উপার্জনের জন্য ঢাকায় থাকতেন তারা। কেউ চাকরি, কেউ ছোটখাটো ব্যবসা করতেন। গত বুধবার রাতে রাজধানীর চকবাজারের চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডে থেমে গেছে কর্মজীবী এই মানুষগুলোর হাত। একসময় যারা বাড়ি ফিরলে খুশি হতেন স্বজনরা, তারাই এখন ফিরছেন স্বজনদের শোকের উপলক্ষ হয়ে। গতকাল শুক্রবার দেশের বিভিন্ন জেলায় নেওয়া হয়েছে আগুনে দগ্ধ হয়ে নিহতদের মরদেহ। এদিন অন্তত চার জেলায় ১৮ জনকে দাফনের খবর জানিয়েছেন আমাদের প্রতিনিধিরা।
নোয়াখালী : অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের ৪৮ জনই নোয়াখালীর। চার উপজেলার ওই বাসিন্দাদের এলাকায় স্বজনদের মধ্যে চলছে শোকের মাতম। অনেককে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। কারও লাশ আনার অপেক্ষায় রয়েছেন স্বজনরা। অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের মধ্যে ৩৪ জনের বাড়ি সোনাইমুড়ী উপজেলায়, বেগমগঞ্জের ২ জন, কোম্পানীগঞ্জের ৯ জন ও ৩ জনের বাড়ি হাতিয়ায়। এদের মধ্যে শুক্রবার সকালে সোনাইমুড়ীর বিভিন্ন ইউনিয়নের ১১ জনের জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়েছে। এরা হলেন নাটেশ্বর ইউনিয়নের ঘোষকামতা গ্রামের খাসের বাড়ির মো. শাহবুল্লাহর দুই ছেলে মাসুদ রানা (৩০) ও মাহাবুবুর রহমান রাজু (২৮), পশ্চিম নাটেশ্বর গ্রামের মিয়ন হাজী বাড়ির মৃত ভুলু মিয়ার ছেলে মোহাম্মদ আলী হোসেন (৫৫), নাটেশ্বর গ্রামের সৈয়দ আহমদের ছেলে হেলাল উদ্দিন, মমিন উল্যার ছেলে শাহাদাত হোসেন হীরা (২৭), মৃত গাউছ আলমের ছেলে নাছির উদ্দিন (২৯), মধ্য নাটেশ্বর ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মোল্লা বাড়ির সিদ্দিকুল্লাহ ও পার্শ্ববর্তী বারগাঁও ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রামের আবুল কাশেমের ছেলে আনোয়ার, বেগমগঞ্জ উপজেলার মুজাহিদপুর গ্রামের কামাল হোসেন, ৪নং আলাইয়াপুর ইউনিয়নের হরি বল্লবপুর ভূঁঞা বাড়ির মোশাররফ হোসেন বাবু ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরএলাহী গ্রামের জসিম উদ্দিন। সরেজমিনে দেখা যায়, অনেক পরিবারই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে দিশেহারা। নাটেশ্বরের মো. শাহবুল্লাহ জানান, ঘটনার আধঘণ্টা আগে পানি নিয়ে তাকে বাড়ি ফিরতে বলেছিল দুই ছেলে। এজন্য কিছু টাকাও দেয় তারা। তিনি ছেলেদের দোকান বন্ধ করে তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে আসতে বলেন। বাবা মো. শাহবুল্লাহ বাড়ি ফিরলেও দুই ছেলে মাসুদ রানা ও রাজু আর ফেরেনি। নিজেদের দোকান এস আর টেলিকমে থাকাবস্থায় বিস্ফোরণে মৃত্যু হয় তাদের। নিজেই ছেলে হারানোর গল্প বলে চলছিলেন সবাইকে।
মাসুদ রানার একমাত্র সন্তান বাবাহারা হয়েছে। গত ২৮ জানুয়ারি অনুষ্ঠান করে বিয়ে করা রাজুর স্ত্রীর মুখেও কোনো কথা নেই। রাজু-রানার বাড়ি লোকে পূর্ণ, কিন্তু কান্নার আওয়াজ ছাড়া এখন আর সেখানে কিছু নেই। বাড়ির একপাশে রানা-রাজুর মা, তাদের স্ত্রী ও সন্তানের কান্না; অন্যপাশে বাবার আহাজারি।
চকবাজারে ব্যবসা করতেন চার বন্ধু। সবারই বাড়ি নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে। ব্যবসার কাজ সেরে প্রতিরাতে একসঙ্গে কিছু সময় আড্ডা দিয়ে তারপর বাসায় ফিরতেন। কিন্তু গত বুধবার রাতে আড্ডায় বসলেও আর বাসায় ফেরা হয়নি তাদের। ভয়াবহ আগুন কেড়ে নিয়েছে তাদের জীবন। জানা যায়, চকবাজারে পারিবারিক ওষুধের ব্যবসা ছিল মঞ্জুর। চুড়িহাট্টা জামে মসজিদের পাশে মঞ্জুর ওষুধের দোকানের নাম ‘হায়দার মেডিকো’। পাশেই ইমিটেশন গয়নার ব্যবসা হীরার। আনোয়ারের ছিল ব্যাগের ব্যবসা। আর নাসিরের ছিল প্লাস্টিকসামগ্রীর ব্যবসা। বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে এই চার বন্ধুর কথা স্মরণ করছিলেন মাহমুদুল হক নামে এক যুবক।
ফেনী : শুক্রবার ফেনী সদর উপজেলার লেমুয়ায় মো. ইব্রাহীম (২৭) ও আনোয়ার হোসেন (২৫) এবং সোনাগাজী উপজেলার নবাবপুরে সুজাউল হকের (৫৬) মরদেহ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। নিহত সুজাউলের ছেলে মো. পারভেজ জানান, তার বাবা দীর্ঘদিন ধরে চকবাজারে একটি ভবনের নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। একই এলাকার একটি প্লাস্টিক কারখানার সামনে পান বিক্রি করতেন বোনের স্বামী মো. ইব্রাহিম ও আনোয়ার হোসেন। অগ্নিকা-ে তিনজনই দগ্ধ হয়ে মারা যান।
নিহত সুজাউল হক সোনাগাজী উপজেলার নবাবপুর ইউনিয়নের গোয়ালিয়া গ্রামের আযু মিয়ার ছেলে। মো. ইব্রাহীম ফেনী সদর উপজেলার লেমুয়া ইউনিয়নের নেয়ামতপুর গ্রামের আজিজুল হকের ছেলে ও সুজাউল হকের জামাতা। অপরজন আনোয়ার হোসেন একই গ্রামের সাদেক ভূঞার ছেলে। বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে মরদেহ এসে পৌঁছলে স্বজনদের আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।
পটুয়াখালী : এদিন সকালে পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার কাঁঠালতলী ইউনিয়নের রামপুরায় এনামুল হক অভি ও সন্তোষপুরে মজিবুর হাওলাদারের দাফন সম্পন্ন হয়। অভি ঢাকায় পড়াশোনা শেষে চাকরি শুরু করেছিলেন। আর মজিবুর চকবাজারে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্লাস্টিক কারখানায় কাজ করতেন।
শরীয়তপুর : চুড়িহাট্টার ওয়াহেদ ম্যানশনের মদিনা ডেকোরেটর দোকানের শ্রমিক বিল্লাল হোসেন চৌকিদার (৪৫) ও বড়কাটরা এলাকার একটি মাদ্রাসার শিক্ষক মুফতি ওমর ফারুককে (৩৫) শুক্রবার দাফন করা হয়েছে। বিল্লালের বাড়ি সদর উপজেলার গ্রামচিকন্দি গ্রামে। ওমর ফারুকের বাড়ি নড়িয়া উপজেলার চরআত্রা মুন্সীকান্দি গ্রামে।
বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর স্ত্রী ও ৮ বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে ঢাকার লালবাগ এলাকার শহীদবাগে বাসা ভাড়া করে থাকতেন বিল্লাল। বুধবার কাজ শেষে বাড়ি ফেরার কথা ছিল বিল্লাল হোসেনের। আগুন ছড়িয়ে পড়লে ভবনের ওই দোকানে আটকা পড়েন তিনি। নিহতের চাচা সুলতান হোসেন বলেন, সংসারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিল বিল্লাল। তার মৃত্যুতে স্ত্রী-সন্তান পাগলপ্রায়। ঢাকার আজিমপুরে লাশ দাফন করা হয়েছে তার।
অপরদিকে ওমরের বাবা করিম মাদবর বলেন, ‘আমার বাবার ছুটিতে বাড়ি আশার কথা ছিল। তার মাকে ডাক্তার দেখাতে ঢাকা নেওয়ার কথা ছিল। বাবা তো আর বাড়ি এলো না, আর আসবেও না। পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে। আল্লাহ কেন এমন করলা?’ গত বৃহস্পতিবার রাতেই ওমরকে মামা বাড়ি মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের দীঘিরপাড় গ্রামে দাফন করা হয়।
