চল্লিশ পেরোলে

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০১৯, ০৬:২৩ এএম

নারীদের ত্বক ফর্সাকারী ক্রিম নিয়ে যতটা প্রচার, তার একভাগও নেই তার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে। আর সচেতনতার অভাবে অনেক নারী নিজের সম্পর্কে উদাসীন থাকেন। সবার অগোচরেই ধীরে ধীরে নানা শারীরিক ও মানসিক অসুখের শিকার হন। নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা উঠলেই আমাদের মাথায় আসে তার প্রজনন স্বাস্থ্যের কথা। নারীর বয়স ৪০ পেরোলেই তাদের স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতন হওয়া খুবই জরুরি। অন্যথায় তাদের শরীরে রোগ বাসা বাঁধার নানা ঝুঁকি থাকে। লিখেছেন ইসরাত জাহান

যেসব রোগে ভুগতে পারেন নারী
মেনোপজ : একজন নারীর বয়স যখন ৪০ থেকে ৫০ এর মধ্যে থাকে তখনই সাধারণত মেনোপজ হয়। এটি একটি প্রকৃতিগত স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। যদিও এ সময় এবং মেনোপজ হওয়ার আগে এবং পরে বেশ কিছু শারীরিক সমস্যা দেখা যায়। যা নারীকে মানসিকভাবে অস্থির করে তোলে। নারী তার এই পরিবর্তনে ভীত হন। মেনোপজের আগে অত্যধিক রক্তপাত, কিংবা পরে হাত-পা জ্বালা করে। রাতে বেশ গরম অনুভূত হয়, যৌনাঙ্গে চুলকানি হতে পারে।

জরায়ু মুখের ক্যানসার : চল্লিশোর্ধ্ব নারীদের জরায়ু মুখের ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। খুব অল্প বয়সে বিয়ে এবং ঘন ঘন সন্তান জন্ম দেওয়া ক্যানসারের প্রধান কারণ। এর সঙ্গে রয়েছে ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও অপুষ্টি। অপুষ্টি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে কমিয়ে দিয়ে অন্য কারণগুলোকে উৎসাহিত করে। এছাড়া, এই রোগের আরেকটি কারণ হলো হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি) নামক ভাইরাস। এই ভাইরাসের সংক্রমণ বারবার হলে সার্ভিক্যাল ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে। আশার কথা হলো, এটিই একমাত্র ক্যানসার যার টিকা রয়েছে; আর দেওয়ার উপযুক্ত সময় হলো মেয়েদের যৌনজীবন শুরুর আগে। এই ক্যানসারের কিছু লক্ষণ আছে, যা থেকে রোগটি আগেভাগে শনাক্ত করা যায়। ভিনেগার বা সিরকা তুলায় নিয়ে জরায়ুর মুখে লাগিয়ে এক মিনিট রেখে দিলে জায়গাটা যদি সাদা হয়ে যায় তখন মনে করতে হবে এটি ক্যানসারের পূর্বাভাস।

স্তন ক্যানসার : নারীদের নীরব ঘাতক বলা হয় স্তন ক্যানসারকে। সাধারণত ৩০ বছরের পূর্বে এই রোগ কম হয়। ৩০ বছরের বেশি বয়স হলে নিজে নিজে ব্রেস্ট পরীক্ষা করতে হবে। দেখতে হবে কোনো চাকা পাওয়া যায় কিনা। চাকা পাওয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। বয়স ৫০-এর ওপরে হলে বছরে একবার মেমোগ্রাম করা উচিত।  যিনি রোজ নিয়ম করে শরীরচর্চা করেন, তার স্তন ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে। সপ্তাহে ৭৫ থেকে ১৫০ মিনিট দ্রুতবেগে হাঁটলে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি কমে।

হাড় ক্ষয় : মেয়েদের মাতৃত্বকালীন সময়ে যে পরিমাণ ক্যালসিয়াম দরকার হয় তা গ্রহণ না করার ফলে শরীরের ক্যালসিয়াম ঘাটতি বাড়তেই থাকে। আর চল্লিশের পর অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম গ্রহণ না করলে শুরু হয় হাড় ক্ষয়। প্রায় নারীর মধ্যেই এ সমস্যা দেখা যায়। এছাড়া ক্যালসিয়াম আছে যে খাবারগুলোতে যেমন, ছোট মাছ, টক দই নিয়মিত খাওয়া দরকার। এসব খাবার গ্রহণ না করার ফলে চল্লিশোর্ধ্ব নারীদের প্রতিদিনের যে চাহিদা রয়েছে, সেটি পূরণ হয় না। আরেকটি হলো গায়ে রোদ লাগানো। অধিকাংশ নারীর ভিটামিন ‘ডি’-এর ঘাটতি রয়েছে। এর কারণ অধিকাংশ সময় ঘরের মধ্যে থাকা। এ ভিটামিনের অভাবে হাড়ের ক্ষয় হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।

অতিরিক্ত ওজন : পরিবারের সকল সদস্যের স্বাস্থ্য সচেতনতায় একজন নারী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও সব অনিয়ম করে তার নিজের খাবার বেলায়। নিজের খাদ্য চাহিদা পূরণ করতে সুষম খাবার গ্রহণ না করে অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ করে। আছে ঘাম ঝরানো শারীরিক পরিশ্রম না করা, সময় মতো পরিমিত আহার না করা ইত্যাদি সমস্যা। যা তার মুটিয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী। আর অতিরিক্ত ওজনের ফলে পায়ে ব্যথা, কোমরে ব্যথা, ডায়াবেটিসের মতো ঝুঁকি দিন দিন বাড়ে।

ডায়াবেটিস : এ বয়সে মহিলারা টাইপ-টু ডায়াবেটিসেই বেশি আক্রান্ত হন। শরীর প্রয়োজনীয় ইনসুলিন উৎপাদন করতে পারে না। আগে থেকেই তাদের এ ব্যাপারে সচেতন হওয়া দরকার। ডায়াবেটিস আক্রান্তরাও নিয়মিত চেকআপের মাধ্যমে এ রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন। এ জন্য দরকার সুশৃঙ্খল জীবনযাপন। সাধারণত মধ্যবয়সী বা বৃদ্ধ ব্যক্তিরা টাইপ-টু ধরনের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন। বয়স কম হওয়া সত্ত্বেও যাদের ওজন বেশি এবং যাদের বেশিরভাগ সময় বসে বসে কাজ করতে হয় তাদেরও এই ধরনের ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ডায়েট, শরীরচর্চা অথবা ইনসুলিন নেওয়ার মাধ্যমে শরীরে চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা গেলে টাইপ-টু ধরনের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব।
হৃদরোগ : চল্লিশ পেরোলেই নিয়মিত হৃদযন্ত্রের পরীক্ষা প্রয়োজন। মেনোপজের পরে মহিলাদের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। অধিক ওজন হলে শরীরে রক্ত সরবরাহ করতে হৃৎপিন্ডের অধিক কাজ করতে হয়। যার ফলে হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

করণীয় : নিজেকে চিন্তামুক্ত রাখার চেষ্টা করা।  মাঝে মাঝে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া। শরীরের রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা। এছাড়া ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা। নিয়মিত হাঁটা-চলা ও ব্যায়াম করে নিজেকে সুস্থ রাখা যায়। প্রচুর পরিমাণে শাক-সবজিও খেতে হবে।

এছাড়াও মেনোপজের পর অনেকের রক্তচাপ বড়ে যায়।  দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পেতে পারে। তবে ডায়াবেটিস থাকলে চোখের সমস্যার ব্যাপারে অধিক যতœশীল হতে হবে। পর্যাপ্ত পানি গ্রহণ না করার ফলে কিডনি সংক্রান্ত নানা রোগ দেখা দিতে পারে। তাই পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে এবং কিডনির কোনো সমস্যা দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে তার জন্য চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত