‘আমার সমাজতন্ত্র’ (সমাজতন্ত্রের উত্থান, পতন ও ভবিষ্যৎ) শিরোনামে বাংলা ভাষায় রাজনীতি, অর্থনীতি, রাষ্ট্র ও সমাজ নিয়ে একটি সুগভীর বিশ্লেষণমূলক গ্রন্থ রচনার জন্য অধ্যাপক আজিজুর রহমান খানকে সশ্রদ্ধ সাধুবাদ। আমাদের ভাষা আন্দোলনের একুশের মাসে প্রথমা প্রকাশন থেকে বইটির দ্বিতীয় মুদ্রণ প্রকাশিত হয়েছে। নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, তুমি যদি কোনো মানুষের সঙ্গে কথা বলো, যে ভাষা সে বোঝে সে ভাষায় তাহলে সেটা তার মাথায় প্রবেশ করে; আর তুমি যে ভাষায় কথা বলো সেই নিজ ভাষায় যদি তুমি কথা বলতে পারো তাহলে সেটা তার হৃদয়ে পৌঁছে যায়। আমরা বাঙালি, বাংলা ভাষায় কথা বলি, আজিজুর রহমান খান আমাদের ভাষাতেই এই জ্ঞানগর্ভ বইটি লিখেছেন এজন্য তাকে আমি আবারও ধন্যবাদ জানাই।
অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম বাংলা ভাষায় কেন বিশ্বমানের পদার্থবিজ্ঞান, রসায়নবিদ্যা কিংবা অর্থনীতির গ্রন্থ নেই? তিনি বলেছিলেন, কারণ বাংলাভাষী বিশ্বমানের কোনো পদার্থবিজ্ঞানী, রসায়নশাস্ত্রবিদ কিংবা অর্থনীতিবিদ নেই। আজিজুর রহমান খানকে এ কারণে আমার ব্যতিক্রম মনে হয়েছে যে, তিনি যেমন বিশ্বমানের অর্থনীতিবিদ তেমনি তিনি মাতৃভাষা বাংলাতেই গ্রন্থটি রচনা করেছেন। কাজেই এই বইটি একটি বিশ্বমানের মর্যাদা দাবি করে বলে আমি মনে করি। অনেকে বাংলাভাষার প্রকাশযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন যে, বাংলা ভাষায় কি সত্যি সত্যি দর্শনের, অর্থনীতির, আইনের কিংবা পদার্থবিজ্ঞানের সিরিয়াস বই লেখা সম্ভব? আমার মনে হয় যে বাংলাভাষায় যে প্রকাশযোগ্যতার কোনো ঘাটতি নেই, আজিজুর রহমান খানের এই বইটি এই প্রশ্নের একটি ভালো জবাব হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনায় যে প্রকাশযোগ্যতার কোনো ঘাটতি নেই, বাংলা ভাষায় লিখে সারা দুনিয়া কাঁপিয়ে দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সে কথা বহু আগেই, সেই ১৯১৩ সালেই প্রমাণ করে দিয়ে গেছেন। আর অন্যান্য বিদ্যাচর্চায় যে বাংলা ভাষায় উচ্চমানের লেখা সম্ভব সেই চর্চায় আজিজুর রহমান খান সর্বশেষ সংযোজন। তার ভাষা সাবলীল, গতিময়, বোধগম্য এবং কত অল্পকথায় যে কত বেশি বলা যায় আমার মনে হয় এই বই তার একটা বড় উদাহরণ হতে পারে। বিষয়ের ওপর প্রবল দক্ষতা থাকলেই কেবল এমন বই লেখা সম্ভব। জার্মান কবি গ্যেটের একটা উক্তি ছিল, ‘কমপ্রেশন ইজ দ্য ফার্স্ট সাইন অব আ মাস্টারম্যান’। মানে ‘সংকোচন সামর্থ্যই সুনিপুণ ব্যক্তির প্রথম নিদর্শন’। অর্থাৎ বিন্দুর মধ্যে কে সিন্ধুকে প্রকাশ করতে পারে সেটাই হচ্ছে একজন মহৎ মানুষের বড় যোগ্যতা।
সমাজতন্ত্রের মতো এত বড় একটা বিষয়, যা তাত্ত্বিকভাবে ও প্রায়োগিক দিক থেকেও সারা বিশ্বকে প্রবলভাবে আলোড়িত করেছিল, আচ্ছন্ন করেছিল, মাত্র একশ’ ঊনষাট পৃষ্ঠার একটি বইয়ে পূর্বাপরসহ একশ’ বছরের সেই ইতিহাস সুনিপুণভাবে গ্রন্থিত করেছেন আজিজুর রহমান খান। এই বইয়ে তিনি খুবই কম ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেছেন এবং বাংলায় অনেক নতুন পরিভাষাও আমাদের উপহার দিয়েছেন। এই বইয়ে বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনসের গদ্যরীতির বহু প্রশংসা তিনি করেছেন এবং আমরা জানি অর্থনীতি বই লিখলেও কেইনসের বইগুলো সু-সাহিত্যের মর্যাদা পেত। কেইনসের গদ্যভাষার যে প্রশংসা লেখক করেছেন, আমিও এই লেখকের বাংলা গদ্যভাষাও সেই গুণে গুণান্বিত বলে মনে করি এবং বিশ্বাস করি যে, বহু পাঠকই বইটি পড়লে এ বিষয়ে একমত হবেন। অর্থনীতিবিদ হলেও কেইনস ‘ব্লুমসবারি গ্রুপ’ নামে খ্যাত সাহিত্য-শিল্প গোষ্ঠীর সদস্য ছিলেন এবং কেমব্রিজের আর্ট থিয়েটারও কেইনসের সৃষ্টি। সমাজতন্ত্র নিয়ে আলোচ্য এই বইটি পাঠেও পাঠক কখনো ছোটগল্পের, কখনো উপন্যাসের আখ্যানের আবার কখনো কখনো কাব্যরসের আস্বাদ পেতে থাকবেন।
‘আমার সমাজতন্ত্র’ বইটিতে লেখক বিভিন্ন জায়গায় রবীন্দ্রনাথ থেকে অনেক উদ্ধৃতি দিয়েছেন, এ থেকে বোঝা যায় তিনি গভীরভাবে রবীন্দ্রনাথ অধ্যয়ন করেছেন, রবীন্দ্রনাথের গান শুনেছেন এবং সাহিত্যের মনোযোগী পাঠক হিসেবেই লেখকের ভাষা এমন গীতল, সাবলীল ও সুন্দর। কার্ল মার্কসের কথা বলতে গিয়ে লেখক বলেছেন, মার্কস তার বিখ্যাত বই ‘জার্মান ইডিওলজিতে’ আশা প্রকাশ করেছেন যে, ‘ভবিষ্যতের এই সমাজে একই মানুষ দিনের একসময়ে পশু শিকারি, অন্যসময়ে মৎসজীবী এবং আরেক সময়ে শিল্পসমালোচক হতে পারবে (পৃষ্ঠা-৩৮, আমার সমাজতন্ত্র)।’ কার্ল মার্কসের এই স্বপ্নকে ধরে লেখক এই বইয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রে এমন বাস্তবতা সম্ভব কি না সেই আলোচনা করেছেন, মূলত এটাই আমাকে আজ এই বই নিয়ে এই লেখা লিখতে উৎসাহ জুগিয়েছে। মার্কসের তত্ত্বে সমাজের স্বার্থ ও ব্যক্তির বিকাশের মধ্যে যে বিরোধ রয়েছে তার সম্ভাবনা কিন্তু স্বীকার করা হয়নি। মার্কস মনে করতেন, ব্যক্তির চাইতে সমাজ গুরুত্বপূর্ণ, গোষ্ঠী গুরুত্বপূর্ণ ফলে ব্যক্তির স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে হলেও গোষ্ঠীর স্বার্থ-সমষ্টির স্বার্থরক্ষা করতে হবে। তিনি মনে করতেন সমষ্টি যদি উন্নত হয় তাহলে ব্যক্তির বিকাশ এমনিতেই ঘটবে। কিন্তু আমরা দেখেছি যে, তেমনটা আসলে হয়নি। মার্কসের কিছুটা আগে জন স্টুয়ার্ট মিল এ বিষয় নিয়ে কথা বলে গেছেন। সমাজতন্ত্রে যে বৈষম্যহীন সমাজের কথা বলা হয়, সবার মধ্যে সমতার কথা বলা হয়Ñ মিল সেগুলোর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। কিন্তু সমষ্টির জন্য সব স্বার্থ ত্যাগ করতে হলে ব্যক্তির বিকাশটা কীভাবে হবে? ব্যক্তির সৃজনশীলতার কী হবে? এই আশঙ্কা থেকেই মিল সমাজতান্ত্রিক চিন্তা থেকে সরে এসেছিলেন।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সমাজতন্ত্রের নানা রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করলে জন স্টুয়ার্ট মিলের এই আশঙ্কাকেই সত্য বলে মনে হয়। দেশে দেশে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সমষ্টির কাছে ব্যক্তির বিকাশ নানাভাবে মার খেয়েছে বলেই আমরা দেখতে পাই। আজিজুর রহমান খান বলছেন, ‘মার্কসের তত্ত্বে সমাজের স্বার্থ ও ব্যক্তির বিকাশের মধ্যে বিরোধের সম্ভাবনা স্বীকার করা হয়নি। তার সমাজতন্ত্রে ব্যক্তি তার সৃষ্টিশীলতার পূর্ণ প্রকাশ অর্জন করবে একাধারে দর্শনিক, শিল্পী ও শ্রমজীবীর ভূমিকায়। পক্ষান্তরে আমরা উল্লেখ করেছি, জন স্টুয়ার্ট মিল সমাজতন্ত্রের সমতা ও সমদর্শিতার ভূয়সী প্রশংসা করলেও সমাজতন্ত্র সম্বন্ধে উৎসাহকে সংযত করেছিলেন এই শঙ্কায় যে, সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ব্যক্তির ওপর সমষ্টির স্বৈরশাসন অনিবার্য, যার ফলে ব্যক্তির অন্তঃস্থিত ক্ষমতার প্রকাশ অসম্ভব। বিদ্যমান সমাজতন্ত্রের অভিজ্ঞতা মিলের শঙ্কার সত্যতা প্রমাণ করেছে। ব্যক্তির স্বাধীনতা এই ব্যবস্থায় সর্বতোভাবে সীমাবদ্ধ হয়েছে, চিন্তার স্বাধীনতার অভাবে ব্যক্তির সৃষ্টিশীলতা খর্ব হয়েছে।’
রুশ বিপ্লবের নেতা ভøাদিমির ইলিচ লেনিনের কথা আমরা এ প্রসঙ্গে আলোচনায় আনতে পারি। বৃহত্তর গণতন্ত্রের কথা বলে তিনি সর্বজনীন ভোটাধিকার এবং তার ভিত্তিতে নির্বাচনকে ‘বুর্জোয়া গণতন্ত্র’ বলে উপহাস ও প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কিন্তু সেই বৃহত্তর গণতন্ত্র লেনিন কিংবা তার উত্তরসূরিরা দেখিয়ে যেতে পারেননি। বরং লেনিন একটা একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যেখানে ব্যক্তির মতপ্রকাশের কোনো অধিকার ছিল না, স্বাধীনতা ছিল না। এই বইয়েও লেখক দেখিয়েছেন যে, লেনিন যে বিপ্লব করেছিলেন সেখানে বৃহৎ রাশিয়ার জনগণের কোনো অংশগ্রহণ ছিল না। রুশ সামরিক বাহিনীর তিরিশ হাজার সেনার সমর্থন নিয়ে তিনি জারতন্ত্রকে উৎখাত করে এবং সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ফলে এটা বলা যায় যে, বিপ্লবের যে সাবজেক্টিভ কন্ডিশন বা অবজেক্টিভ কন্ডিশনের কথা কার্ল মার্কস বলেছিলেন তার কোনো প্রতিফলন লেনিনের রুশ বিপ্লবে দেখা যায়নি। রাশিয়ার বিপ্লব একটা মিথ হয়ে আছে, আসলে সেখানে রাশিয়ার আপামর জনসাধারণের তেমন কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। এই মিথকে আমাদের ভাঙতে হবে।
বিপ্লবের আগের রাশিয়া এবং বিপ্লবের পরের রাশিয়ার তুলনা করলে আমরা দেখব ব্যক্তির বিকাশ, সৃষ্টিশীলতা ও স্বাতন্ত্র্য, ব্যক্তির অধিকার বিপ্লব-উত্তর রাশিয়ায় প্রবলভাবে মার খেয়েছে। বিপ্লবের আগে রাশিয়া শিল্প-সাহিত্যে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ছিল। তলস্তয়, দস্তয়ভস্কি, গোর্কি, পুশকিন, আন্তন চেখভ, ইভান তুর্গেনিভ, নিকোলাই গোগল এরা সবাই বিপ্লবপূর্ব রাশিয়ার ফসল। কিংবা বিপ্লবের সময়ের কথা যদি বলি, আলেক্সান্দার ব্লক, ভøাদিমির গুমিলভ, আনা আখমাতোভা তাদের সৃষ্টিশীলতার শিখরে। সের্গেই ইয়েসেনিন এবং মায়াকোভস্কি উদীয়মান কবি। ভাসিলি কান্দিনস্কি, মার্ক শাগাল ও কাজিমির মালেভিচ চিত্রশিল্পে অভিনব আন্দোলন সৃষ্টি করছেন। সের্গেই দিয়াজিলেভের ব্যালে নৃত্যের দল ইউরোপকে বিমুগ্ধ করছে। সংগীতে সের্গেই রাহমানিয়েভ, ইগর স্ত্রাভিনস্কি প্রমুখ বৈপ্লবিক ধারা প্রবর্তন করছেন। কিন্তু বিপ্লবের মধ্য দিয়ে সোভিয়েত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর এই সৃষ্টিশীলতা মুখ থুবড়ে পড়ে যা ছিল মর্মান্তিক। শিল্পী-কবি-সাহিত্যিকদের ওপর বিপর্যয় নেমে এসেছিল, বিপ্লব-উত্তর রাশিয়ায়। বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি না পাওয়া ব্লকের মৃত্যু হয় ১৯২১ সালে। ১৯২২ সালে আখমোতভার রচনা নিষিদ্ধ হয়। ১৯২৫ সালে ইয়েসেনিনের আত্মহত্যা বা মতান্তরে পুলিশ কর্র্তৃক গুপ্তহত্যা। ১৯৩০ সালে মায়াকোভস্কির আত্মহত্যা। কারাবাস ও পদচ্যুতির পর ১৯৩৫ সালে মালেভিচের মৃত্যু রাশিয়ার শিল্প-আন্দোলনের এক করুণ অধ্যায় হয়ে আমাদের দিকে বিশাল প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে। রবীন্দ্রনাথের রাশিয়ার চিঠি থেকে এ প্রসঙ্গে চমৎকার উদ্ধৃতি এখানে উল্লেখ করতে পরি। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘সমষ্টির কারণে ব্যষ্টির অত্যাচার। ছাঁচে ঢালা মনুষ্যত্ব কখনোই টেকে না। সজীব মনের তত্ত্বের সঙ্গে বিদ্যার তত্ত্ব যদি না মেলে, তাহলে হয় একদিন ছাঁচই ফেটে চুরমার হবে, নয় মানুষের মন যাবে মরে, আড়ষ্ট হয়ে, কিংবা কলের পুতুল হয়ে দাঁড়াবে’ (রাশিয়ার চিঠি, পৃষ্ঠা-৪)। ১৯৩০ সালে রাশিয়া ভ্রমণের পর রবীন্দ্রনাথের এই দার্শনিক উপলব্ধি সত্যিই বিস্ময়কর। কিন্তু বিপ্লব-উত্তর রাশিয়া অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বিশ্বজুড়ে যে প্রভাব তৈরি করতে পেরেছিল, রুশ বিপ্লবের প্রভাব যেভাবে দুনিয়ার এ প্রান্ত থেকে সে প্রান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল সেটাও বিস্ময়কর। রাশিয়ার বিপ্লব নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এই বইয়ের লেখক বিখ্যাত ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ এরিক হব্সবম্-এর একটি উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছেন। ‘বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে শক্তিমান যে সামরিক যন্ত্র জারশাসিত রাশিয়াকে চূর্ণবিচূর্ণ করেছিল, তাকে পরাজিত করে সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ থেকে বিশ্বের দুটি পরাশক্তির একটি হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল। সপ্তম ও অষ্টম শতাব্দীতে, তুলনায় শ্লথ ও সীমাবদ্ধ, ইসলামের বিজয় ছাড়া এই মতাদর্শের জয়যাত্রার আর কোনো তুলনা নেই।’ (পৃষ্ঠা-৭৩)
সমাজতন্ত্রের দ্রুত ও বিশ্বব্যাপী বিস্তারের সঙ্গে দুনিয়ায় ইসলামের বিস্তারের এই তুলনা খুবই গভীর বিশ্লেষণ দাবি করে। খুবই সংক্ষেপে হলেও এখানে উল্লেখ করতে চাই ইসলামের বিজয় ও বিস্তারের আগে আরবের শিল্প-সাহিত্য চর্চা এবং ইসলাম-পরবর্তী আরবের শিল্পচর্চার কথা। ইসলামে একটা সুনির্দিষ্ট ও কঠোর অনুশাসনের মধ্য দিয়ে শিল্পচর্চার যে বিধানের কথা বলা হয়েছে তার সঙ্গে বিপ্লবের পর সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার শিল্পচর্চারও তুলনা করা যেতে পারে। দুইখানেই আমরা দেখব, ব্যক্তির সৃষ্টিশীলতা প্রবলভাবে ব্যাহত হয়েছে। কিন্তু ইসলামেও কঠোর শরিয়তি বিধান ভিন্ন সুফি সাধকদের অধ্যাত্মবাদী ধারায় শিল্পচর্চার দারুণ বিকাশ দেখতে পাওয়া যায়, যাকে শরিয়তিরা স্বীকার করতে চান না। অন্যদিকে, সমাজতান্ত্রিক চিন্তারও তাত্ত্বিকভাবে নানা ভিন্ন ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণকে তথাকথিত সমাজতান্ত্রিক দলগুলো স্বীকার করতে চায় না। তারা ‘লাল বইকে ধর্মগ্রন্থ, কার্ল মার্কসকে পয়গম্বর আর রাশিয়াকে মক্কা মনে করে’। সমাজতন্ত্রের অনুসারীদের এই ধারাকেই বিপ্লব-উত্তর রাশিয়া কিংবা আমাদের বাংলাদেশেও আমরা দেখেছি। এই চর্চাই ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সৃষ্টিশীলতাকে বরাবর বাধাগ্রস্ত করে এসেছে।
