প্রাইভেট প্লেসমেন্ট শেয়ার

বিক্রয় নিষেধাজ্ঞা বাড়াতে চায় ডিএসই

আপডেট : ১৫ মার্চ ২০১৯, ১২:০৭ এএম

পুঁজিবাজারের বর্তমান তারল্য সংকটে বিভিন্ন কারণের সঙ্গে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) প্রক্রিয়ায় থাকা কোম্পানির প্রাইভেট প্লেসমেন্ট শেয়ার ইস্যুও দায়ী। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির আগেই এ পদ্ধতিতে শেয়ার ইস্যু করায় বড় অঙ্কের অর্থ আটকে যাচ্ছে। এ কারণেই প্রাইভেট প্লেসমেন্ট শেয়ারের বিক্রয় নিষেধাজ্ঞার (লক-ইন) মেয়াদ বাড়িয়ে তিন বছর করার প্রস্তাব দিতে যাচ্ছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালনা পর্ষদ। গত বুধবার ডিএসইর পর্ষদ সভায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রাইভেট প্লেসমেন্ট শেয়ারের বিক্রয় নিষেধাজ্ঞা বাড়াতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কাছে প্রস্তাব পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ডিএসই। পাশাপাশি আইপিও অনুমোদনের সময় স্টক এক্সচেঞ্জের পক্ষ থেকে এসব শেয়ারে তিন বছরের লক-ইন আরোপের সুপারিশ করা হবে।

এ বিষয়ে ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুঁজিবাজারে তারল্য সঙ্কটের জন্য প্রি আইপিও প্লেসমেন্ট অনেকাংশে দায়ী। প্রি আইপিও প্লেসমেন্ট পুরোপুরি অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে এবং এ কারণে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এসব শেয়ারধারীরা পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারী নন। কোম্পানি তালিকাভুক্তির পর এরা প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে বেরিয়ে যান।

বর্তমানে প্লেসমেন্ট শেয়ার যে সঙ্কট তৈরি করছে, সেটি যদি এখনই নিয়ন্ত্রণে আনা না যায়, তা হলে আবারও ১৯৯৬ ও ২০১০ সালের মতো পুঁজিবাজারে রক্তক্ষরণ হতে পারে বলে সতর্ক করে দেন তিনি।

মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, আমরা প্রাইভেট প্লেসমেন্ট বন্ধ করে দিতে বলছি না। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি ও তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে আমরা প্রাইভেট প্লেসমেন্ট ও এর বিপরীতে প্রাপ্ত বোনাস শেয়ারে বিক্রয় নিষেধাজ্ঞা তিন বছর করতে বিএসইসির কাছে প্রস্তাব পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। একই সঙ্গে উদ্যোক্তাদের বোনাস শেয়ারেও নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব দেওয়া হবে। তিনি বলেন, পুঁজিবাজারে আইপিওর যে চাহিদা রয়েছে, তাতে আমার মনে হয়েছে প্রাইভেট প্লেসমেন্টের প্রয়োজনীয়তাই নেই। প্লেসমেন্ট শেয়ারের মাধমে অর্থ সংগ্রহ করে কোনো কোনো কোম্পানিকে পালিয়ে যেতে দেখেছি। আবার কিছু কোম্পানি বন্ধও হয়ে গেছে।

বর্তমানে উদ্যোক্তা শেয়ারে তিন বছরের বিক্রয় কিংবা স্থানান্তরের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আর প্রাইভেট প্লেসমেন্টের ক্ষেত্রে আইপিও প্রসপেক্টাস অনুমোদনের সময় থেকে এক বছরের বিক্রয় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে প্রসপেক্টাস অনুমোদন থেকে লেনদেন শুরু পর্যন্ত যে সময় ব্যয় হয়, তাতে প্লেসমেন্ট শেয়ারের নিষেধাজ্ঞা আসলে ছয় থেকে সাত মাসে নেমে আসে।  পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অনেক কোম্পানিই আইপিও আবেদনের আগে মূলধন বৃদ্ধির মাধ্যমে বড় অঙ্কের প্লেসমেন্ট শেয়ার ইস্যু করছে। অনেক ক্ষেত্রেই আইপিও আকারের তুলনায় প্লেসমেন্ট ইস্যুর পরিমাণ বেশি হতে দেখা গেছে। এ প্রক্রিয়ায় মূলধন উত্তোলন করা হলেও এর ব্যবহার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোম্পানিগুলো দেখায় না বলে অভিযোগ রয়েছে। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহের অনুমোদন পাওয়া কপারটেক ইন্ডাস্ট্রিজের প্রাক আইপিও চার কোটি শেয়ারের মধ্যে ৪৫ দশমিক ১ শতাংশ হচ্ছে উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে। অবশিষ্ট শেয়ার প্লেসমেন্টে বিক্রি করেছে কোম্পানিটি। আবার আইপিওতে আরও দুই কোটি শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে ২০ কোটি টাকা সংগ্রহ করবে। এক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, আইপিওর চেয়ে প্লেসমেন্ট শেয়ার বেশি। আইপিওর অনুমোদন পাওয়া জেনেক্স ইনফোসিস লিমিটেডের ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি লক্ষ করা গেছে।  প্রাক আইপিওতে এ কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকদের শেয়ার ৪৬ শতাংশের কম। অবশিষ্ট শেয়ার প্লেসমেন্টে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে ইস্যু করা হয়েছে। আইপিও সাইজও প্লেসমেন্টের তুলনায় কম। আইপিওর অনুমোদন পাওয়া প্রায় সব কোম্পানির ক্ষেত্রেই এমনটি দেখা গেছে।

কোম্পানিগুলো আইপিওতে আসার আগে বিএসইসির কাছ থেকে মূলধন উত্তোলনের অনুমতির মাধ্যমে প্লেসমেন্ট শেয়ার ইস্যু করছে। ফলে আইপিওর আগেই বড় অঙ্কের মূলধন সংগ্রহ করছে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো।      

প্রসঙ্গত পুঁজিবাজারে বড় ঊর্ধ্বগতির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১০ সালে প্লেসমেন্ট বাণিজ্য জমজমাট হয়ে ওঠে। সে সময় অন্তত ৪০টি কোম্পানি বিপুল পরিমাণ প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রি করে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। এর মধ্যে কিছু কোম্পানি রয়েছে, প্লেসমেন্ট ইস্যুর পর গত ৯ বছরেও তালিকাভুক্ত হতে পারেনি।  ২০১০ সালে প্রাইভেট  প্লেসমেন্টে এনার্জিপ্রিমা লিমিটেড ১৫৫ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করলেও আজ পর্যন্ত পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারেনি। একই সময়ে আনন্দ শিপইয়ার্ড লিমিটেডও একই পদ্ধতিতে ১৪০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। কিন্তু এর উদ্যোক্তারা খেলাপি হয়ে পড়ায় আট বছরেও তালিকাভুক্ত হতে পারেনি। ২০১০ সালে জিএমজি এয়ারলাইন্স প্লেসমেন্টের মাধ্যমে ২৫০ কোটি টাকা সংগ্রহ করার পর কোম্পানিটি স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়।  প্লেসমেন্ট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে আরেকটি বাজার সৃষ্টি হওয়ায় পুঁজিবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন ডিএসই পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত