গণতন্ত্রের প্রাথমিক শর্ত

আপডেট : ১৭ মার্চ ২০১৯, ১০:১৪ পিএম

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের দু’টি অত্যাবশ্যকীয় ভিত্তি। এ দুই বস্তু আমাদের দেশে আগে ছিল না, এখনো নেই। পৃথিবীর যেসব দেশ গণতান্ত্রিক বলে দাবি করে সেখানে এরা আছে বলে বলা হয়, কিন্তু খুব যখন প্রয়োজন পড়ে তখন দেখা যায় তারা নেই। আমেরিকার নেতৃত্বে যখন পুঁজিবাদী বিশ্বের ইরাক ও আফগানিস্তান দখল চলল তখন সেই ঘটনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ছিল এমন কথা কেউ বলতে পারবেন না। দাবি করা হয়েছিল ইরাকে এমন সব ওয়েপনস অব মাস ডেস্ট্রাকশন রয়েছে যেগুলোর একটি মাত্র আঘাত অসংখ্য মানুষকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট; পইপই করে খোঁজা হলো কিন্তু আক্রমণ-উন্মাদেরা তেমন কোনো অস্ত্রের খবর বিশ্ববাসীকে দিতে পারল না। তবু দখল করা হলো, হত্যা এবং রক্তপাতের কোনো সীমা-পরিসীমা রইল না, কিন্তু না দেখা গেল স্বচ্ছতা না দায় রইল জবাবদিহিতার। আফগানিস্তান দখলের অজুহাত ছিল তালেবানদের হটানো, যে তালেবানরা একদা মার্কিনিদের হাতেই তৈরি হয়েছিল, সোভিয়েত ইউনিয়নের কর্তৃত্ব থেকে আফগানিস্তানকে ‘মুক্ত’ করার জন্য। সে-দেশে মানুষ ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি ঘটেছে বিপুল; তালেবানরা নিশ্চিহ্ন হয়নি, তারা নানা উপায়ে ফিরে এসেছে। আফগানিস্তানের ধ্বংসকাণ্ডের জন্য আমেরিকাকে জবাবদিহিতার কাঠগড়াতে দাঁড়াতে হয়নিÑ না বিশ্ববাসীর কাছে, না নিজ দেশের জনগণের কাছে।

স্বচ্ছতা থাকলে ধরা পড়ত যে উভয় ক্ষেত্রেই আসল উদ্দেশ্য ছিল দেশ দু’টির জ্বালানি তেল ও খনিজসম্পদ হস্তগত করা; সেই সঙ্গে ছিল সমরাস্ত্র তৈরি এবং সেনাবাহিনীতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা। আমেরিকা এটাও দেখাতে চেয়েছে যে তারা দুর্ধর্ষ, যা ইচ্ছা তাই করতে পারে। ইসরায়েলিরা
ফিলিস্তিনে প্রতিনিয়ত মানুষ হত্যা করছে, সে জন্য কারও কাছে জবাবদিহিতার প্রয়োজন নেই। কোন যুক্তিতে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করে তাদের বাসভূমি দখল করে বসে আছে তার জবাবও ইসরায়েল কখনো দেয়নি, দেবেও না। মিয়ানমারে কী ঘটছে সে ব্যাপারে স্বচ্ছতা নেই দেখে ‘গণতান্ত্রিক’ বিশ্ব বেশ ক্ষুব্ধ ছিল, সে-দেশের নিষ্ঠুর সামরিক জান্তার ওপর নানাবিধ চাপও প্রয়োগ করা হয়েছে, যাতে তারা ‘উদার’ হয়। শেষ পর্যন্ত নাকি খানিকটা উদারতা প্রকাশে সম্মত হয়েছে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের কেন নাগরিক অধিকার দেওয়া হচ্ছে না, কেন তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে, তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। তাদের ঘরবাড়ি কেন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেওয়া হয়েছে, হত্যা করে এবং হত্যার হুমকি দিয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে কেন পাহাড়ে জঙ্গলে নৌকায় পালিয়ে থাকতে বাধ্য করা হচ্ছে তার কোনো ব্যাখ্যা উদারতা-প্রদর্শনকারী শাসকরা উপস্থিত করছে না। গণতান্ত্রিক বিশ্ব থেকেও এ ব্যাপারে কোনো প্রতিবাদ উঠছে না। অং সান সু চি মানবাধিকারের পক্ষে দাঁড়িয়ে অবর্ণনীয় কষ্ট ভোগ করেছেন, বিশ্ব তার প্রতি সহানুভূতি জানিয়েছে, কিন্তু তিনি নিজে রোহিঙ্গাদের দুর্দশা লাঘবের পক্ষে প্রথমে কোনো কথা বলেননি, পরে যা বলেছেন তা হতভাগ্য রোহিঙ্গাদের পক্ষে যায়নি।

আমাদের নিজেদের দেশেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বিলক্ষণ অভাব রয়েছে। আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোকে জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করার বাধ্যবাধকতা মানা হয় না। সংসদের কার্যক্রমের দিকে তাকালে দেশে কোনো বিরোধী দলের উপস্থিতি আছে বলে টের পাওয়া যায় না। শেয়ারবাজারে কেলেঙ্কারি হয়, অপরাধীরা ধরা পড়ে না। পদ্মা সেতুর ব্যাপারে বিশ্বব্যাংকের অভিযোগের ভিত্তিটা কী জানা যায় না। সরকারি ব্যাংক থেকে হলমার্কওয়ালারা কীভাবে হাজার হাজার কোটি আত্মসাৎ করল সেটা রহস্যই রয়ে যায়। সাংবাদিক সাগর-রুনি দম্পতিকে কারা এবং কেন হত্যা করল সেটা পরিষ্কার হয় না। ইলিয়াস আলী ঢাকার রাস্তা থেকে উধাও হয়ে কোথায় চলে গেল তার কোনো হদিস নেই। এ ধরনের বড় বড় ঘটনার ক্ষেত্রেই যখন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার চিহ্ন পাওয়া যায় না, তখন ছোটখাটো অপরাধের যারা ভুক্তভোগী তারা ন্যায়বিচার পাবেন এমন আশা নিশ্চয়ই বাস্তবসম্মত নয়। বাস্তবেও তেমনটাই দেখা যাচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে; খুন, ধর্ষণ, আত্মহত্যা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব দিক দিয়ে দেশ এখন ঘটনাবহুল। অভাব কেবল ওই দুই বস্তুরÑ স্বচ্ছতার ও জবাবদিহিতার, যে সবের অভাব ঘটলে গণতন্ত্র আছে এমনটা বলা মুশকিল।

কিন্তু গণতন্ত্র তো এমনি এমনি আসে না, তার জন্য চাপের দরকার পড়ে। আর সেই চাপটা দিতে পারে অন্য কেউ নয়, জনসাধারণই। যে জন্য প্রত্যেক দেশেই জনগণের জন্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায় শাসক শ্রেণিকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অনুশীলনে বাধ্য করা। নিজের দেশে গণতন্ত্র এলে তবেই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামে অংশগ্রহণ করা সম্ভব। সুখের বিষয় এইটুকুই যে, বোধটা পৃথিবীব্যাপী এখন পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে, আমাদের দেশেও এই বোধের বিকাশ ও দৃঢ়তা প্রয়োজন। নইলে যতই গণতন্ত্রের কথা বলি-না কেন, গণতন্ত্র আকাশকুসুমই রয়ে যাবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত