তারা একেকজন যেন রূপান্তরের গল্পের একেকটি চরিত্র। দারিদ্র্য, সামাজিক বাধাকে টপকে তারা যেন একেকজন নারী মুক্তির মশাল। গত কয়েক বছরে একঝাঁক কিশোরী ফুটবলার এভাবেই নিজেদের প্রকাশ করেছে গোটা জাতির সামনে। নির্ভীক ও প্রত্যয়ী রূপে তারা দেশের পতাকা ওড়াচ্ছেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। পরপর দুবার এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়নশিপের মূল পর্বে নাম লিখিয়ে তারা দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। কিন্তু বিরাটনগরে এসে যেন সেই বিজয়িনী রূপটা ঠিক দেখা যাচ্ছে না। ভুবনজয়ী কিশোরীরাই হুট করে যেন হারিয়ে ফেলেছেন আত্মবিশ্বাস। সেই প্রত্যয় উধাও একটি মাত্র হারে। নেপালের কাছে গ্রুপ নির্ধারণী ম্যাচে ৩-০ গোলে হেরে সেমিফাইনালে তাদের পড়তে হচ্ছে আসরের ফেভারিট ভারতের সামনে। গতবারের মতো ফাইনালের মঞ্চে যেতে তাই বাংলাদেশকে গড়তে হবে ইতিহাস। এমন ম্যাচে নামতে তাই সবার আগে প্রয়োজন মানসিক দৃঢ়তা। হৃদয়ে বুনে নিতে হবে একটাই মন্ত্র ‘আমরাও পারব ভারতকে হারাতে।’ কিন্তু একটি মেয়ের কণ্ঠেও যে নেই সেই দৃঢ়তা। তবে কি লড়াইয়ের আগেই হেরে যাচ্ছে বাংলাদেশ?
টিম হোটেল থেকে বিরাটনগরের দিল্লি পাবলিক স্কুলের দূরত্ব প্রায় ৫ কিলোমিটার। মূল শহরের ধুলোময় পথ পেরিয়ে খানিকটা নির্মল পরিবেশে গড়ে ওঠা এই স্কুলের মাঠে গতকাল ফুরফুরে মেজাজে অনুশীলন সেরেছে বাংলাদেশ দল। অনুশীলন শেষে বাফুফের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর পল স্মলি মেয়েদের ওপর আস্থা রাখার কথাই বললেন, ‘মেয়েদের মধ্যে হয়তো কিছুটা ভয় এবং উৎকণ্ঠা কাজ করছে। কারণ ভারত অনেক অভিজ্ঞ দল। তাদের সিনিয়র খেলোয়াড় আছে অনেক এবং আমরা খুবই অনভিজ্ঞ ও তরুণ একটি দল। তবে আমার মনে হয় মেয়েরা অন্যরকম একটি ম্যাচ খেলবে ভারতের বিপক্ষে। আমরা ভেতরে ভেতরে তাদের উজ্জীবিত করার চেষ্টা করছি। বলতে পারি যতটা সম্ভব ইতিবাচক মানসিকতা নিয়েই ম্যাচটা খেলবে মেয়েরা।’
শীর্ষ পর্যায়ে কখনই ভারতকে হারাতে পারেনি বাংলাদেশের মেয়েরা। তবে নেপাল ও ভারতের তুলনা করে পল স্মলি জানালেন, প্রতিপক্ষ হিসেবে নেপাল অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল। একই সঙ্গে কখনো হারাতে না পারার চাপকে জয় করতে পারলেই বড় কিছুর আশা করছেন এই অ্যাংলো-অস্ট্রেলিয়ান কোচ, ‘এই পর্যায়ে এসে সব ধরনের চাপ সামলানোর সামর্থ্য থাকতে হবে। আমরা জানি আমাদের কিছু সমস্যা আছে। তবে বিশ্বাস থাকতে হবে। প্রত্যেকে যদি তাদের দায়িত্বগুলো সঠিকভাবে পালন করে তবে ভারতের বিপক্ষেই অবশ্যই সুযোগ থাকবে আমাদের।’
ভারত মোকাবিলায় মানসিক দৃঢ়তা থাকা জরুরি, এটা অনুধাবন করছেন ফুটবলাররাও। মুখে ভারতকে হারানোর কথা তারা বলছেন না ঠিক, তবে আগেই হেরে বসতে রাজি নন। আর এজন্যই আগের ম্যাচের ভুল-ত্রুটিগুলো কাটিয়ে ভারতের বিপক্ষে নিজেদের উজাড় করে দিতে বদ্ধপরিকর তারা। ডিফেন্ডার আঁখি খাতুন যেমনটা বললেন, ‘ছোটখাটো ভুলের জন্যই নেপালের বিপক্ষে গোল খেয়েছি। এগুলো নিয়ে আমাদের মধ্যে অনেক কথা হয়েছে। ভারত নিঃসন্দেহে অভিজ্ঞ দল। আমাদের চেয়ে সবদিক দিয়েই এগিয়ে। তবে আমাদের বিশ্বাস রয়েছে আমরা ভালো করতে পারব।’
গ্রুপের দুটি ম্যাচ ইনজুরির কারণে খেলা হয়নি ফরোয়ার্ড কৃষ্ণা রানী সরকারের। তবে সেমিফাইনালের আগে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছেন তিনি। ভারতের সঙ্গে অতীতে তিনটি ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা থেকেই ভালো কিছুর আশা করছেন তিনি, ‘এর আগে ভারতের সিনিয়র দলের বিপক্ষে তিনটি ম্যাচ খেলেছি। এর মধ্যে দুটি ছিল গত সাফে। সেবার গ্রুপ পর্বে ড্র আর ফাইনালে হেরেছিলাম। আমাদের দলের শক্তি গত সাফের তুলনায় বেড়েছে। সে তুলনায় ভারত একই জায়গায় আছে বলে মনে করি। সুতরাং গতবার যদি আমরা তাদের সঙ্গে ড্র করতে পারি এবার নিশ্চয়ই তার চেয়ে ভালো কিছুই হবে।’ এই ভারতের কাছেই গত নভেম্বরে মিয়ানমারে অলিম্পিক বাছাই পর্বে ৭-১ গোল বিধ্বস্ত হতে হয়েছিল বাংলাদেশকে। তবে এবার সেরকম কিছু হবে না বলেই বিশ্বাস মিডফিল্ডার মিসরাত জাহান মৌসুমীর, ‘সেই আসরের ভুলগুলো নিয়ে আমরা অনেক কাজ করেছি। অনেক অভিজ্ঞতাও হয়েছে। আশা করি ওই ভুলগুলো হবে না। নিজেদের স্বাভাবিক খেলা খেলতে পারলে ভালো একটা ম্যাচ উপহার দিতে পারব।’
শহিদ রঙ্গশালা স্টেডিয়ামে ম্যাচটা শুরু হতে এখনো বেশ কয়েক ঘণ্টা বাকি। এ সময়টায় হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরে আসুক বাংলাদেশ শিবিরে এটাই প্রত্যাশা।
