মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক যশোর রোডের (যশোর-বেনাপোল সড়ক) শতবর্ষী গাছগুলো কেটে ফেলার দাবি জানিয়েছে এলাকাবাসী। এই দাবিতে গতকাল মঙ্গলবার যশোর-বেনাপোল সড়কের বিভিন্ন অংশে মানববন্ধন হয়েছে। বেনাপোল স্থলবন্দর সংলগ্ন সড়কটি পুনর্নির্মাণের কাজ চলায় গাছের শেকড় কাটা পড়ছে। এতে দুর্বল হয়ে গাছগুলো উপড়ে পড়ার অবস্থা হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ঝড়-বৃষ্টিতে সড়কের ঝিকরগাছার কলাগাছি এলাকায় দুটি ও বৃষ্টির আগে আরও দুটি বড় গাছ উপড়ে পড়ে। এতে বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ঘটনার পর সড়কের পাশে বসবাসকারী বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। সড়কের ৬২০টি শতবর্ষী গাছ ঝড়-বৃষ্টিতে উপড়ে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ গাছ অপসারণের দাবিতে এরই মধ্যে ১০টি পরিবারের পক্ষ থেকে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করা হয়েছে।
ঝিকরগাছা, গদখালী, নাভারণ ও বেনাপোলে মানববন্ধন করে পুরনো গাছ কেটে সড়ক প্রশস্ত করার দাবি জানান স্থানীয়রা। মানববন্ধনে থাকা ঝিকরগাছার দেউলি গ্রামের মমিনুর রহমান বলেন, রাস্তার পাশের বেশির ভাগ গাছ সড়কে হেলে পড়েছে। এতে দুর্ঘটনার শঙ্কা বাড়ছে। নাভারণ এলাকার বাসিন্দা শাহজাহান ও রফিকুল ইসলাম বলেন, যারা ঢাকায় বসে গাছ রক্ষার দাবি করছেন, তারা আসলে এই সড়কে কখনো আসেন না। কিন্তু এখানকার বাসিন্দারা টের পাচ্ছে এসব গাছ তাদের জন্য কত ঝুঁকিপূর্ণ।
যশোর-বেনাপোল সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ সব গাছ কেটে সড়ক প্রশস্ত করার দাবিতে এদিন সংবাদ সম্মেলন করে বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ (কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরোয়ার্ডিং) অ্যাসোসিয়েশন। সংস্থাটির নেতারা বলেন, ‘বেনাপোল দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর। এই বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানিবাহী গাড়িসহ প্রতিদিন ৫ হাজারেরও বেশি গাড়ি যাতায়াত করছে। চার দেশের ট্রানজিট করিডর বেনাপোল-পেট্রাপোল সড়ক। বছরে ৩০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য চলছে এই বন্দরে। সরকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে রাজস্ব পাচ্ছে ১০ হাজার কোটি টাকা। অথচ এই বাণিজ্যে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে অপ্রশস্ত সড়কের দুই পাশে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ গাছ। যার বেশির ভাগ মরে গেছে। এখনই গাছ না কাটলে ভবিষ্যতে চরম খেসারত দিতে হবে সবাইকে।’
এ বিষয়ে যশোর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সাইফুজ্জামান পিকুল বলেন, ‘যশোর-বেনাপোল মহাসড়ক পুনর্নির্মাণের কারণে দুই পাশের ৬২০টি শতবর্ষী গাছ ঝুঁকিতে রয়েছে। গাছ না কাটার জন্য উচ্চ আদালতের নির্দেশ রয়েছে। কিন্তু মানুষের জানমালের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ গাছগুলো অপসারণ করা দরকার।’
সড়ক ও জনপথ বিভাগ যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘যশোর শহরের দড়াটানা থেকে বেনাপোল বন্দর পর্যন্ত ৩৮ কিলোমিটর সড়ক পুনর্নির্মাণে ৩২৮ কোটি টাকা ব্যয় হবে। মহাসড়কের পাশের শতবর্ষী গাছ রেখেই দুই পাশে ৫ ফুট করে মোট ১০ ফুট সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। যেখানে গাছ নেই সেখানে রাস্তা হচ্ছে ৩০ ফুট আর যেখানে গাছ আছে সেখানে রাস্তা থাকছে ২৪ ফুট। তিন ফুটের বেশি গভীর করে রাস্তা খনন করে পুনর্নির্মাণ কাজ চলছে। এতে গাছের কিছু শেকড় কাটা পড়লেও কিছু করার নেই।’
সড়ক সম্প্রসারণের প্রকল্পটি পাস হয় ২০১৭ সালের মার্চে। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়। এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের ১৮ জানুয়ারি ছয় মাসের জন্য গাছ কাটার ওপর স্থগিতাদেশ জারি করে হাইকোর্ট। এরপর সরকার গাছগুলো না কাটার সিদ্ধান্ত নেয়। সড়ক ও জনপথ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, এই সড়কের দুই পাশে গাছ রয়েছে ২ হাজার ৩১২টি। এর মধ্যে ২০০টিরও বেশি গাছের বয়স ১৭০ বছরেরও বেশি। রাস্তাটি ভারতের কলকাতা পর্যন্ত বিস্তৃত।
