‘আমি একদিনও না দেখিলাম তারে’

আপডেট : ২০ মার্চ ২০১৯, ১০:২৭ পিএম

ফকির লালন মুখে মুখেই গানের পদ রচনা করতেন। ফকির মানিক ও ফকির মনিরুদ্দিন শাহ্ বাঁধাগান লিখে নিতেন। মনে নতুন গান উদয় হলে হাঁক দিতেন ‘আয় রে আয়, পোনা মাছের ঝাঁক এসেছে’। মনিরুদ্দিন গান শুনে বাঁধাগান লিখতে গেলে তিনি হৈ হৈ করে উঠতেন ‘লিখিস না, ছিনায় রাখ। এসব গান লোকে জানলে সারা বিশ্বে হই চই হবে। কেউ বুঝবে কেউ বুঝবে না’। মনিরুদ্দিন শাহ্ লিখে রাখতেন। নিজ হাতে বাস্তবে তিনি কয়টা গানের খাতা লিখেছিলেন, সে তথ্য সঠিকভাবে না পাওয়া গেলেও তার একটি হাতখাতা ফকির মন্টু শাহের হেফাজতে দেখেছিলাম। অরিজিনাল এ খাতাটিতে পর পর ৫৯৭টি গান আছে। মনিরুদ্দিন শাহের হাতের লেখা পরিচ্ছন্ন। কোথাও তেমন কাটাকুটি হয়নি।পান্ডুলিপির শেষভাগে আদ্যক্ষরের বরাতে সাজানো আছে ঝকঝকে সূচিপত্র। কিছু পাতায় উই লেগেছিল বটে কিন্তু মন্টু শাহ খুব যত্ন করে পুরো খাতার পাতাগুলোকে লেমিনেটিং করে নিয়েছেন। খাতা দেখাতে দেখাতে মন্টু শাহ একটু হতাশ হন। তারপর বলেন  ‘খাতাটা সরকারে চাইলে কোনো জাদুঘরে দিয়ে দেব। আমি মারা গেলে তো এ খাতাও এক সময় হারাইয়া যাবে’। তার কথাই কি সত্যি হলো! তিনি দেহত্যাগ করেছেন কয়েক বছর আগে। জানি না সেই খাতাটা উনি কার কাছে রেখে গেছেন। যাহোক, মনিরুদ্দিন শাহের হাতখাতাটা লোকসাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। হ্যান্ডনোটের আদলে লেখা অরিজিনাল এ পান্ডুলিপিটিকে বাঁচিয়ে রাখতে এখনই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

জীবদ্দশাতেই লালন ফকিরের গান বহুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। শিষ্যদের ধারণা গানের সংখ্যা দশ হাজারেরও বেশি। প্রকৃতপক্ষে তার এত বিপুল সংখ্যক গান পাওয়া যায় না। শোনা যায় কোনো কোনো শিষ্যের মৃত্যুর পর অছিয়ত মোতাবেক গানের খাতা তাদের কবরে পুঁতে দেওয়া হয়েছিল। অধিকন্তু সমসময়ে অনেক ভক্ত খাতা নিয়ে গিয়ে আর ফেরত দেননি। সাধুদের কাছে গান হলো জ্ঞান; তাদের সাধনসংগীত। মূলত গানের পদ-পদাবলীকে সাধুরা কালামের সমতুল্য ভাবেন। ফলে সুরের চেয়ে পদাবলীর অন্তর্জালের সারকথাকেই বাউলরা মহৎ মনে করেন। লালনকে সন্ধান করতে গেলে বারেবারে তাই গানের কাছে সমর্পিত হতে হয়। তার জীবন সবার মতো নয়। তিনি বাস করেন চেনা-অচেনার মাঝামাঝি বন্দরে। তিনি কী বিশ্বাস করতেন, কী তার ধর্মমত, জীবনপ্রণালী ইত্যাদি সবই তার গানের দিব্যকথার মধ্যে বিরাজমান। অচেনা মানুষ ফকির লালন জীবনভর খুঁজে চলেছেন অচিনপাখিকে। সহজ কথায় বেঁধেছেন জীবনের গভীরতম গান ‘খাঁচার ভিতর অচিনপাখি/কম্নে আসে যায়/আমি একদিনও না দেখিলাম তারে।’

তার সহজাত কাব্যজ্ঞান এবং শব্দ-ছন্দ এত উচ্চতর ছিল যে নেহায়েত সাদামাটা শব্দগুলোও আন্তরিকভাবে উঠে আসত তার গীতিকবিতায়। সার্থক কলাকৌশল ও মানানসই ব্যঞ্জনায় বাংলা, ইংরেজি, ফারসি, আরবিসহ অন্যান্য সকল শব্দকে তিনি সমানে ব্যবহার করেছেন। সহজ শব্দ ব্যবহার করে গভীর কথার এমন আধ্যাত্মিক গীতিকবিতা একমাত্র লালন শাহ্-ই সফলভাবে সার্থক করে তুলতে পেরেছিলেন। যেমন এক ‘আয়না’ শব্দকেই তিনি তিন-চার রকম মানানসই কায়দায় ব্যবহার করেছেন তার গানে। বাড়ির কাছে আরশিনগর, মন তুমি পাড়াহীন দর্পণ অথবা আয়নাআঁটা রূপের ছটা, আয়নামহল কিংবা শুধুই আয়না পদগুলো সুন্দর মানিয়ে যায় লালনগানে।

লালন গানের ধারা মূলত বহুমাত্রিক। অন্যতম ধারাটি প্রবাহিত হয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস এবং প্রেম-প্রার্থনার সঙ্গে। সংখ্যাগত দিক থেকে মুসলমান সম্প্রদায়ের ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কিত গান সর্বাধিক হলেও সনাতন হিন্দু ধর্মমতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ গানের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। সে যাই হোক, একজন সাধক-কবি হিসেবে লালনের প্রধান কৃতিত্ব হলো তার গান সর্বজনগ্রাহ্য। গ্রাহ্য শব্দকে মনমতো ব্যবহার করে তিনি জীবনের নিগূঢ় রহস্যের কথা বলতে পেরেছিলেন। গীতিকথার আধ্যাত্মিক সৌন্দর্য এতটাই গভীর এবং সাবলীল যে সুদূর দেশের মানুষরাও অনুবাদ করতে থাকে তার গান। অনেক আগেই বহু গান ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। জাপানি, ফারসি, ইতালীয় এবং হিন্দি ভাষাতেও চলছে তর্জমা এবং অনুবাদের কাজ। ইংরেজ লালন গবেষক জেমস্-এর কথাই ধরা যাক। জেমস্ ‘খাঁচার ভিতর অচিনপাখি কম্নে আসে যায়’-সহ বেশ কয়েকটি গানের ইংরেজি অনুবাদ করেন। তার ছন্দময় অনুবাদটির দু-পাঁচ লাইনের মধ্যেই পাওয়া যায় ভাষাগত ভঙ্গিমার আধ্যাত্মিক ভাব-How does the unknown bird go/into the cage and out again?/Could I but seize it./I would put the fetters of my heart/around it’s feet..

গোরা পাগল, হর গোবিন্দ, রাধাশ্যাম, শ্যামানন্দ, গগন হরকরা, অধর চাঁদ, পদ্মলোচন, দীনদয়ালসহ ভারত উপমহাদেশের আরও কিছু বাউল পদকর্তার দেখা মিললেও লালনের মতো করে জীবনের গভীর ভাববোধকে এমন সর্বজনগ্রাহ্য করে এ বাংলায় আর কেউ বলতে পারেননি বলেই মনে হয়। অবশ্য মরমি গানের বিচারে লালনের সঙ্গে দেওয়ান হাছন রাজার গানের খানিক মিল পাওয়া যায়। লালন অচিনপাখিকে সন্ধান করেছেন এবং পাখি দিয়েই অচিনপাখির উপমা টেনেছেন। অন্যদিকে হাছন রূপক সেই পাখিকেই ডেকেছেন ময়না বলে। লালন যাকে খাঁচা বলেছেন, হাছন তাকেই পিঞ্জিরা জ্ঞান করেছেন। মূলত তারা দু’জনই পাখিরূপে আত্মার সন্ধান করেছেন। খাঁচা কিংবা পিঞ্জিরা সেখানে আমাদের পার্থিবদেহ-আত্মার বাতাবরণ ‘মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দি হইয়ারে/কান্দে হাছন রাজার মন মনিয়ায়রে।’

বাংলার বাউল ফকিরদের মতো চীনা দার্শনিকদের মধ্যেও কিছু কিছু আধ্যাত্মিক পদকর্তার সন্ধান মেলে। ঐসব প্রাচীন চীনা দার্শনিকদের তেমন কোনো তথ্য পাওয়া না গেলেও দার্শনিক কুনফুসিয়াস এবং তাও কে কিং-এর নাম খুব উল্লেখযোগ্য। কুনফুসিয়াসের অধিকাংশ প্রবচন যদিও নীতিগত বিষয়ের ওপর তথাপিও তার কিছু রহস্যময় ও আধ্যাত্মিক প্রবচন আছে। যেমন We know so little about life, how can we then know about death?-Confucius A_ev I am a transmitter and not an originator, I am one who believes in and love the ancients-Confucius..
অন্যদিকে তাও কে কিং আধ্যাত্মিকতার জগতে কনফুসিয়াসের চেয়েও বেশখানিক আগে চলেন। তার অনেকগুলো প্রবচন আছে যেগুলো যেমন আধ্যাত্মিক তেমন রহস্যময়। তাছাড়া তার প্রবচনে বাউলধর্মী উদাসী মনেরও পরিচয় মেলে There is something that existed before the earth and the sky began and its name is the way-Tao ke Ching একজন কবি কতটা শব্দকে শাসন করতে পারেন, কতটা বেমানান বিদঘুটে শব্দকে ভাবরসে আচ্ছন্ন করে রাখতে পারেন, তা তার শব্দ সমন্বয় ক্ষমতা থেকে খানিক আন্দাজ করা যেতে পারে। আপাত এবং আলাদাভাবে ‘কোতা’ শব্দটা খাপছাড়া শোনালেও তিনি এ শব্দকে সফলভাবে ব্যবহার করেছেন ‘কুত্বি যখন কফের জ্বালায়/তাবিজ তাগা বাঁধবি গলায়/তখন কি হবে ভালায়/মস্তকের জল শুষ্ক হলে।’

‘কোতা’ শব্দকে লালন শুধু ব্যবহারই করেননি, সুরের সঙ্গে এর সমন্বয় করে একটি মানানসই আধ্যাত্মিক গীতিকবিতায় পরিণত করেছেন যা হৃদয়কে সহজগ্রাহ্য করে তোলে। ‘কোতা’ শব্দের মতো আরও অনেক শব্দের কথা বলা যেতে পারে যেমন ভড়ুয়া বাঙ্গাল, জলছ্যাচা কল, প্যালা দেওয়া, আবাল গুদড়ী, তালো ডোঙ্গা, খাজলত, ইল্লত, খুসকি জারী, ইঞ্জিল কল, বাটপার ইত্যাদি। লালনের বহুবিধ গানে অহরহ এরকম দেশি-বিদেশি শব্দ ও শব্দযুগলের সংমিশ্রণ ঘটেছে। এসব শব্দকে স্বতন্ত্রভাবে অনেকটা বেসুরো ও বেমানান ঠেকলেও লালন পদাবলীতে শব্দগুলোকে এমন কায়দায় ব্যবহার করেছেন যে, সুরের সঙ্গে যোগ হয়ে তা এক নিগূঢ় ভাববোধ এনে দিয়েছে-‘ভালো জলছ্যাচা কল পেয়েছ মনা/ডুবারুজন পায় সে রতন/তোর কপালে ঢনঢনা’। লালন গানের একটি প্রজ্ঞাময় দিক হলো শব্দের সরল গাঁথুনির সঙ্গে সুরের একান্ত মনোনিবেশ। শব্দের কাছে এসে সুর এমনভাবে মজেছে যে এদের মাদকতা এবং ভাবরস সহজেই মানবমনকে প্রজ্ঞানন্দে বিভোর করে তোলে ‘বাড়ির কাছে আরশি নগর/সেথা এক পড়শি বসত করে/আমি একদিনও না দেখিলাম তারে’

বাউলরা দেশময় ছড়িয়ে থাকলেও তাদের মন পড়ে থাকে লালনের বারামখানায়। সংখ্যাতীত ভক্ত অনুরাগী, আউল-বাউল সাধু-বৈষ্ণব আর ফকির-দেওয়ানাদের পদচারণায় ক্রমেই ভারী হয়ে যায় সাধুবাজার। ভাবজগতের মধ্যে বেজে ওঠে তিন পাগলে হলো মেলা নদে এসে। ১১৭৯ বঙ্গাব্দের ১ কার্তিক (১৭৭২ খ্রিস্টাব্দ) লালন ফকিরের জন্ম বলে ধারণা করা হয়ে থাকে। ১২৯৭ বঙ্গাব্দের ১ কার্তিক (১৭ অক্টোবর ১৮৯০) তার দেহাবসান ঘটে। বাংলার এই মহান ভাবসাধক জীবদ্দশাতে তার ভক্ত অনুসারীদের নিয়ে ফাল্গুনে ‘দোল পূর্ণিমা’র উৎসব পালন করতেন। তারই ধারাবাহিকতায় এখনো প্রতি বছর দোল পূর্ণিমায় এবং তার দেহাবসানের তিথি পহেলা কার্তিকে ছেউড়িয়ায় লালন-আখড়ায় এই সাধুসঙ্গ হয়ে থাকে। ২০ মার্চ এবারের দোল পূর্ণিমাতেও বুধবার থেকে শুরু হয়েছে তিনদিনব্যাপী লালন স্মরণোৎসব। দোল পূর্ণিমায় বাংলার এই মহান ভাবসাধকের প্রতি প্রণতি জানিয়ে তার গান নিয়ে আমার এই শ্রদ্ধাঞ্জলি।

লেখক : কবি ও লালন গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত