উন্নয়ন-চাহিদা মেটাতে শেয়ারবাজারের দিকে নজর দেওয়া জরুরি

আপডেট : ২৯ মার্চ ২০১৯, ১০:০৫ পিএম

সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় জিডিপির প্রাক্কলিত প্রবৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৮%। বিগত প্রায় দুই দশকের স্থিতিশীল ও ক্রমবর্ধমান প্রবৃদ্ধি ২০২০ সালে সমাপ্য এ পরিকল্পনার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের আশাবাদকে খুব ভালোভাবে সমর্থন করে। তবে এ জন্য স্থূল দেশজ বিনিয়োগ জিডিপির ( Gross Domestic Product ) ৩৪.৪ শতাংশ আর এফডিআই (Forein Direct Investment ) ৯.৫৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীতকরণের কথা বলা হয়েছে। ২০১৫ সালে এর হার ছিল যথাক্রমে ২৮.৯৭ শতাংশ ও ১.৬০ বিলিয়ন ডলার। এ জন্য সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়ে বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। কিন্তু এত বড় তহবিল আসবে কোত্থেকে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

বিগত ডিসেম্বর ২০১৮ পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর নন-পারফরমিং ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৩,৯১১ কোটি টাকা; এরই মধ্যে এ শ্রেণিভুক্ত ৩৭,৮৬৬ কোটি টাকা অবলোপন করা হয়েছে। এ অবস্থায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে তারল্য সংকট দেখা যাবে, তা খুবই স্বাভাবিক। এর প্রমাণ অবশ্য পাওয়া যায় ব্যাংক কর্র্তৃক আমানতের বিপরীতে প্রদেয় মুনাফা ও লগ্নিকৃত অর্থের জন্য ধার্য কৃত সুদের হারে। সরকারের কাছে অঙ্গীকার করেও অনেক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান তাদের নয়-ছয়ের প্রতিশ্রুতি প্রকৃত অর্থেই নয় ছয় করে ছেড়েছেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের কাছে এক ব্যক্তি ১০টি টাকা ধার চাইতে ওয়াদা করেন যে, এ জন্য তিনি সারা জীবন তার কাছে ঋণী হয়ে থাকবেন। এ নাটকের প্রত্যক্ষদর্শী তার এক বন্ধু দীর্ঘদিন পর ঐ ব্যক্তির প্রতিশ্রুতির অবস্থা জানতে চাইলে কবি ঘোষণা করেন যে, তার আর যত দোষই থাকুক না কেন, সে সত্যবাদী; এখনো সে ঋণী হয়ে আছে।

আসলে দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ দিয়ে দেশকে শিল্পায়িত করা বা অবকাঠামো উন্নয়ন করা ব্যাংকের কাজও নয়, প্রাথমিক পর্যায়ে স্বল্প সঞ্চয়ের আমলে এটা তার একটা নির্দেশক  (demonstrative) কাজ হতে পারে মাত্র। কারণ, ব্যাংক আমানত গ্রহণ করে তিন মাস, ছয় মাস, এক বছর, দুই বছর, বড় জোর পাঁচ বছরের জন্য। কিন্তু ওই সব ক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। বিশ বা ত্রিশ বছরের আগে সুদাসল উশুল করার কোনো সুযোগ সেখানে নেই। এর মধ্যে আমানতের একটা অংশের যদি নন-পারফরমিং লোনে রূপান্তর ঘটে, তাহলে তারল্য সংকটের আরও অবনতি হয়। এটা মোকাবিলা করার জন্য চড়া সুদের জিপি ফান্ডসহ (General Providend Fund) সরকারি সঞ্চয় স্কিমগুলোর পাশাপাশি ব্যাংকগুলোকে নিজেদের মধ্যে আমানত সংগ্রহ করার প্রতিযোগিতায় নামতে হয়। বাজারে নতুন নতুন ব্যাংকের আবির্ভাব এই প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করে ফেলে। আবার চড়া সুদ নন-পারফরমিং লোনের অন্যতম প্রধান কারণ। এভাবে ‘চড়া সুদে ঋণ-বড় নন-পারফরমিং লোন-তারল্য সংকট-চড়া সুদে আমানত সংগ্রহ’ এর একটি দুষ্টচক্র তৈরি হয়। এই চক্রের মধ্যে থেকে উন্নয়ন-চাহিদার বিশাল পুঁজি সরবরাহ করা ব্যাংকিং সেক্টরের পক্ষে সম্ভব নয়, বাস্তবসম্মতও নয়। তার প্রধান কাজ হলো অর্থনীতির সহজ পাঠের মতো আয় বুঝে ব্যয় করা; চলতি মূলধন ও স্বল্পমেয়াদি ঋণ সরবরাহ করা।

আমাদের জিডিপির  (Gross Domestic Product) পরিমাণ এখন ২৮৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আকার অনুযায়ী বিশ্ব অর্থনীতিতে তার অবস্থান ৪২তম। একে ৩০ এর মধ্যে স্থান পেতে হলে জিডিপির পরিমাণ বিলিয়ন থেকে ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে হবে। এর জন্য বিপুল এফডিআই (Foreign Direct Investment)-এর যেমন প্রয়োজন হবে, তেমনি দরকার হবে পুঁজিবাজারের উন্নয়নের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি পুঁজির ব্যাপক সমাবেশ ঘটানোর। কারণ, পুঁজিবাজারই একমাত্র জায়গা যেখান থেকে বিনা সুদে বিনিয়োগের জন্য বিশাল বিশাল অংকের তহবিল জোগান দেওয়া যায়। আমাদের দেশে মানুষ নিজের কষ্টার্জিত অর্থ কর হিসেবে দিতে ভীষণভাবে কুণ্ঠাবোধ করে। বিশ্বে সর্বোচ্চ মিলিয়নিয়ার তৈরির এই দেশে প্রকৃত করদাতার সংখ্যা মাত্র এক মিলিয়ন। অবিশ্বাস্য? আবার কর-ভার বাড়িয়ে বড় বড় প্রকল্প অর্থায়ন করলে জনঅসন্তোষ বাড়ে যা গণতান্ত্রিক সরকারকে সব সময় পীড়িত করে। তবে সবাই বিনিয়োগ করতে চায়। সম্ভাবনাময় প্রকল্পের অংশীদার হতে বিনাসুদে বিনিয়োগে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এখানেই পুঁজিবাজারের কারিশমা, এখানেই পুঁজিবাজারের স্বাতন্ত্র্য। তা ছাড়া এর মাধ্যমে উন্নয়নের অংশীদারিত্ব প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব হয়; সমাজে বৈষম্য কমিয়ে আনার ক্ষেত্র তৈরি হয়। তবে এ বাজারটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং মানুষের আস্থার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। কেবল স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসনের মাধ্যমেই এই আস্থাশীলতা অর্জন করা সম্ভব। এ দেশে পুঁজিবাজার অর্থনৈতিক উন্নয়নে এখন পর্যন্ত কোনো ঔজ্জ্বল্য দেখাতে পারেনি। তার নানা কারণও ছিল। তবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের এই পর্যায়ে অমিত সম্ভাবনাময় এই উৎসকে কাজে লাগানোর প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য।

এ দেশে ১৯৫৪ সালে প্রথম ঢাকায় স্টক এক্সচেঞ্জ স্থাপন করা হলেও তাতে লেনদেন শুরু হয় ১৯৫৬ সালে। এরপর ১৯৯৫ সালে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে দেশের দ্বিতীয় স্টক একচেঞ্জ স্থাপন করা হয়। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ( DSE) বয়সের দিক থেকে প্রবীণ হলেও এর আকার-আয়তন এবং কর্মকাণ্ডে এতে এখনো নবীনের ছাপ স্পষ্ট। মাত্র সাড়ে তিনশর মতো স্ক্রিপ এ বাজারে সক্রিয়ভাবে কেনাবেচা হয়। এর বর্তমান বাজার মূলধন  (Market Capitalization) ৪৭ বিলিয়ন ডলারের আশপাশে ঘুরপাক। জিডিপির পরিমাপে এর হার মাত্র ১৭ শতাংশ; অর্থাৎ এটি একটি অবমূল্যায়িত পুঁজিবাজার। পুঁজিবাজারের ধনকুবের ওয়ারেন বাফেটের মতে বাজার মূলধন-জিডিপি অনুপাতই হলো পুঁজিবাজারের মান নির্ণয়ের একক সর্বোত্তম অনুপাত। এই অনুপাত ৭৫ থেকে ৯০ শতাংশের মধ্যে থাকলে তা যুক্তিসম্মতভাবে মূল্যায়িত বলে গণ্য করা হয়। বর্তমানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (উঝঊ) তালিকাভুক্ত স্ক্রিপগুলোর মূল্য-আয় গড় অনুপাত (চ/ঊ ৎধঃরড়) ১৫/১৬ এর মতো। ঐতিহাসিকভাবে এই অনুপাত ১৫ থেকে ২০ এর মাঝে নড়াচড়া করে। এ মুহূর্তে অর্থনীতির সব সূচকে বাংলাদেশ ভালো করলেও এবং মূল্য-আয় অনুপাতে অধিকাংশ স্ক্রিপ দৃশ্যত লোভনীয় পর্যায়ে থাকলেও পুঁজিবাজারের দুরবস্থা কেন, কেন বাজারে লেনদেনে খরা চলছে, সঞ্চয় ও আয় বাড়ার পরও কেন মানুষ পুঁজিবাজারমুখী হচ্ছেন না, বরং যারা এখানে এসেছিলেন তারা কেটে পড়ছেন, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ২০১০ সালের পর দেশে পুঁজিবাজার উন্নয়নে অনেক সংস্কার করা হয়। দেশে সঞ্চয়ের হারও এখানে বেশ ভালো; গড়পড়তা ২৯%। সরকারি কর্মচারীরা এখন যে অবসর-সুবিধা পান, তার পরিমাণ বেশ লোভনীয়; আগের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। তার একটা অংশ এ বাজারে অবশ্যই আসার কথা। কিন্তু তার পরও পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে পারছে না। অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের এর কারণ খুঁজে বের করা দরকার। আমি তাদের কেউই নই; সাধারণ মানুষদের একজন। আমার সাদা চোখে কতগুলো বিষয় খটকা লাগে। আবার কতগুলো অভিযোগ কানে আসে, যেগুলো গভীর উৎকণ্ঠা তৈরি করে। স্বচ্ছতা ও সুশাসনের প্রশ্নে ক্ষত তৈরি হওয়ার আগেই এগুলো পরিষ্কার হওয়া জরুরিÑ

ক) আইপিও (Initial Public Offering) : আইপিও নিয়ে বড় অভিযোগ এই যে, বিগত এক দুই দশকে যেসব কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়েছে, তাদের অধিকাংশই নিম্নমানের। প্রসপেক্টাসে তাদের অত্যন্ত সম্ভাবনাময় গোলাপি চিত্র অঙ্কন করা থাকলেও উদ্যোক্তাদের আবদ্ধ শেয়ার বিমুক্ত ও বিক্রি হওয়ার পর কোম্পানি স্বমূর্তিতে আবির্ভূত হয়। তখন রথের উল্টোযাত্রা শুরু হয়, অর্থাৎ কোম্পানি ক্রমশ লোকসান করতে থাকে। তখন স্ক্রিপের (Scrip) বাজারমূল্য ফেসভ্যালুর নিচে নেমে যায়। তাতে উদ্যোক্তাদের কোনো ক্ষতি নেই; বরং লাভ। কারণ, তারা ততদিনে সিংহভাগ শেয়ার উচ্চমূল্যে বিক্রি করে আম-ছালা দুটোই বগলদাবা করে পগার পাড়ি দিয়েছেন। ভুক্তভোগী হন কেবল অবোধ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। প্রকৃত লাভজনক প্রতিষ্ঠান ও পেশাদারি উদ্যোক্তাদের বাজারে নিয়ে আসার মাধ্যমেই কেবল এই সংকট মোকাবিলা কারা যায়।

 খ) উদ্যোক্তাদের শেয়ার ধারণ : কোম্পানির উদ্যোক্তা/পরিচালকদের ব্যক্তিগতভাবে ২% এবং সমষ্টিগতভাবে ন্যূনতম ৩০% শেয়ার ধারণ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ন্যূনতম সীমার অতিরিক্ত ধারণকৃত শেয়ার বিক্রির ক্ষেত্রে তাদের আগাম ঘোষণা দিতে হয়। কিন্তু তারা এসব নিয়মের ধার ধারেন না। দুর্বল মৌলভিত্তির শেয়ারের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ধারণকৃত শেয়ারের একটা অংশ পর্যন্ত তারা গোপনে সুযোগ বুঝে বিক্রি করে দেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে তারা ঘোষণা দিয়ে নিকটাত্মীয় বা আপন জনের কাছে শেয়ার হস্তান্তর বা দান করেন। এরপর সেই আপনজন বা আত্মীয় সুবিধামতো সময়ে নির্বিঘে সেগুলো কোনো ঘোষণা ছাড়াই বিক্রি করে দেন। কারণ, উদ্যোক্তাদের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তার আপনজন বা আত্মীয়র সেটা নেই। এ এক আজব নিয়ম। নিয়ম অমান্য করার জন্যই বুঝি এ ফাঁক রেখে দেওয়া হয়েছে। এই ফাঁক দ্রুত বন্ধ করা দরকার।

গ) কোম্পানি ডিলিস্টকরণ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা : বর্তমান নিয়ম অনুসারে কোনো কোম্পানি পর পর পাঁচ বছর ডিভিডেন্ড দিতে বা এজিএম অনুষ্ঠানে ব্যর্থ হলে ডিএসই তাকে ডিলিস্ট করতে পারে। এরূপ বেশ কয়েকটা কোম্পানিকে এরই মধ্যে ডিলিস্ট করাও হয়েছে। এ এক আজব ব্যবস্থা; এতে উদ্যোক্তাদের শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে তাদের বরং দায়মুক্তি দেওয়া হয়। আর বিনিয়োগকারীরা হয়ে পরেন নিঃস্ব। কারণ, এ ব্যবস্থায় হাউসে শেয়ার কেনাবেচা বন্ধ হয়ে পড়ে। কোম্পানিরও ওই শেয়ারগুলো ইস্যু মূল্যে কিনে ফেরত আনার কোনো দায় নেই। এ জন্য অনেক চতুর উদ্যোক্তা সযতনে তার কোম্পানিকে ডিলিস্টেড হতে সহায়তা করেন।  আবার ডিলিস্টেড হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ব্যবস্থাপনা কীভাবে করা হবে, শেয়ার হোল্ডারদের দায় কীভাবে মেটানো হবে, উদ্যোক্তারা নয় ছয় করে প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করলে বা তার কোনো অঙ্গপ্রতিষ্ঠানে সম্পদ পাচার করলে তাদের কী করা হবে, তার জন্য স্পষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা এখনো করা হয়নি। ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়ার মতো মনে হয়। এ ক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী দেশের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করলেই সুফল পাওয়া যাবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

ঘ) শেয়ারবাজার নিয়ে শিক্ষামূলক কার্যক্রম : শেয়ারবাজার সম্পর্কে সাধারণ মানুষ ও বিনিয়োগকারীদের সচেতন করে তোলার জন্য বর্তমানে বাংলাদেশ সিকিউরিটি অ্যান্ড একচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বেশ কিছু কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কয়েকটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলও এ জাতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের নির্দেশ যে, কোনো নির্দিষ্ট স্ক্রিপ নিয়ে সেখানে আলোচনা করা যাবে না। এটা কেমন কথা? কোম্পানি যদি তার তথ্য লুকিয়ে বিনিয়োগকারীদের পকেট কাটতে পারে, কোনো দুষ্টচক্র যদি মন্দ কোম্পানির শেয়ার মূল্য কারসাজি করে বা গুজব ছড়িয়ে আকাশচুম্বী করতে পারে, মানুষের যদি ধারণা জন্মে যে, একই অনিয়মের জন্য কোনো ব্যাখ্যা ছাড়া ভিন্ন ভিন্ন কোম্পানির জন্য কর্তৃপক্ষ আলাদা আলাদা ব্যবস্থা গ্রহণ করছে, স্বচ্ছতা ও সুশাসনের প্রশ্নে এই অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগে তা নিয়ে মুক্ত আলোচনা করতে দোষ হবে কেন? বরং তাতে বিনিয়োগকারীরা আরও বেশি সচেতন ও শিক্ষিত হয়ে উঠবে আর উদ্যোক্তারাও সতর্ক হবেন, বিএসইসিরও স্বচ্ছ ভাবমূর্তি গড়ে উঠবে। তা না করে কে নো স্ক্রিপের দাম বেড়ে গেলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ গতানুগতিকভাবে যে টেমপ্লেট প্রশ্ন করে টেমপ্লেটেড উত্তর পায়, তা কি কৌতুকের খোরাক জোগায় না?

ঙ) সতর্কতামূলক ব্যবস্থা : ডিএসই/বিএসএসি তাদের ওয়েব সাইটে পুঁজিবাজার সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করে জেনে বুঝে তারপর বিনিয়োগ করতে পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু এ ব্যবস্থা কতটুকু কার্যকর তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এর চেয়ে বরং ইলেকট্রনিক মাধ্যমে কোম্পানি, ডিএসই, বিএসইসি ও বিনিয়োগকারীদের প্রতিনিধি মিলে বিতর্কমূলক আলোচনা করা হলে তা আরও শিক্ষণীয় ও ফলপ্রসূ হতে পারে।

চ) মিউচুয়াল ফান্ড : ক্ষুদ্র ও অপেশাদার বিনিয়োগকারীদের জন্য পেশাদারদের দ্বারা পরিচালিত অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকির বিনিয়োগ-হাতিয়ার হিসেবে মিউচুয়াল ফান্ডকে আমরা জানতাম। এখন ডিএসইতে তালিকাভুক্ত এ ফান্ডের দিকে নজর দিলে, এই সব পেশাদারদেরই মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন আসে। বাজার স্থিতিশীল করার অজুহাতে বিএসইসি যে বেশ কিছু ক্লোজড অ্যান্ড মিউচুয়াল ফান্ডের মেয়াদ ১০ বছরের স্থলে এক তরফা ২০ বছর করে আদেশ জারি করে, তা কি আইন সম্মত, না বাজারের জন্য হিতকর হয়েছে? একজন বিনিয়োগকারী কিছু দিনের মধ্যে কিছু নগদ অর্থ পাওয়ার আশায় এই ফান্ড কিনে এক সুন্দর সকালে আবিষ্কার করেন যে, ওই টাকা পেতে তাকে আরও ১০ বছর অপেক্ষা করতে হবে। এতে আস্থার অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ফান্ডের বর্তমান স্বাস্থ্য দেখে; ৩৮টি ফান্ডের মধ্যে ৩৫টি স্ক্রিপ্টের দর ফেসভ্যালুর নিচে। এর খোল নলচে পাল্টানো দরকার।

ছ) বৈচিত্র্যের অভাব : ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ওয়েবসাইট অনুযায়ী ২২১টি ট্রেজারি বন্ডসহ মোট ৫৮১টি স্ক্রিপ্ট সেখানে তালিকাভুক্ত। কিন্তু শুধু ইকুইটি শেয়ার ছাড়া অন্য কোনো ধরনের বিনিয়োগ হাতিয়ার সেখানে লেনদেন হতে দেখা যায় না। শেয়ারের পাশাপাশি ডিবেঞ্চার, বন্ড, ডেরিভ্যাটিভস ইত্যাদি বিনিয়োগ-হাতিয়ার থাকলে বাজার আরও বিস্তৃত ও স্থিতিশীল হতে পারে।

জ) নিরীক্ষার মান : দেশে নিরীক্ষার মান নিয়ে সব সময়েই বিনিয়োগকারীদের মনে প্রশ্ন ও সন্দেহ রয়েছে। তবে আইপিও এর ক্ষেত্রে এই অভিযোগ বেশি করা হয়। কাগজে-কলমে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় গোলাপি কোম্পানি বাজার থেকে টাকা তুলে নেওয়ার দু-তিন বছরের মাথায় যখন লোকসানি কারবারে পরিণত হয়, তখন এ সন্দেহ সাধারণ্যে সহজে কল্কে পায়। কোম্পানির নিজের টাকায় নিয়োজিত নিরীক্ষক কি তার নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবেদন দিতে পারে, এ ধারণা অধিকাংশ লোকে পোষণ করে। নিরীক্ষকের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে আইন সংশোধন করে বিএসইসি নিজের অর্থে মান সম্পন্ন নিরীক্ষক নিয়োগ দিয়ে প্রত্যাশী কোম্পানির হিসাব-কেতাব নিরীক্ষা করাতে পারে এবং কোম্পানির কাছ থেকে অগ্রভাগে এ কাজের ফি আদায় করতে পারে।

ঝ) একাধিক হিসাব-নিকাশ সংরক্ষণ : অভিযোগ আছে যে, অনেক কোম্পানি দু-তিন রকমের হিসাবকিতাব নির্বাহ করে এবং যেখানে যেটা সুবিধাজনক সেখানে সেটা দাখিল করে উদ্যোক্তারা সুবিধা নেন আর সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের বঞ্চিত করেন। সব জায়গায় অনলাইনে প্রতিবেদন দাখিল ও তা সহজে যাচাইযোগ্য করা হলে বর্তমান যুগে এ সমস্যা সহজেই মোকাবিলা করা যায়।

বর্তমানে শেয়ারবাজার সম্পর্কে মানুষের ধারণা খুবই নেতিবাচক। তারা মনে করে যে, ব্যাংকে টাকা রাখলে তা না বাড়লেও অন্তত তার হানি হবে না। কিন্তু পুঁজিবাজারে টাকা আনলে তা আর ফেরত আসবে না; লাভ তো দূরের কথা। কারণ, ব্যাংক ডুবে গেলে সরকার তা উদ্ধারে এগিয়ে আসে, ব্যাংক থেকে ঋণ করে কেউ খেলাপি হলে মামলা-মোকদ্দমা হয়, জড়িতদের কতক ক্ষেত্রে সাজা হয়, নির্বাচনে দাঁড়াতে বাধা দেওয়া হয় ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু শেয়ারবাজারে এসবের কোনো বালাই নেই। এখানে একজন আরেকজনের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে নির্বিঘেœ কেটে পড়তে পারেন। কোম্পানির কারবার লাটে উঠলে উদ্যোক্তা দাবি করেন যে, তার নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত কারণ এ জন্য দায়ী; তার কোনো দোষ নেই। নিরীক্ষা প্রতিবেদন ও আন্ডাররাইটারের প্রত্যয়ন এর বড় প্রমাণ। বিএসইসি বলে যে, তারা রেকর্ডপত্র দেখে অনুমোদন দিয়েছে, সেগুলো তো সব ঠিকই ছিল। নিরীক্ষক দাবি করেন, তাদের কাছে যেসব রেকর্ডপত্র উপস্থাপন করা হয়েছে, সেগুলো যাচাই করে তারা সঠিক মন্তব্যই করেছেন। এ যেন সুকুমার রায়ের ‘কার দোষ’ গল্পের সার্থক মহড়া। দেয়াল গড়া শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা ভেঙে পড়ায় রাজা রাজমিস্ত্রিকে ঠ্যাঙাতে ডেকে পাঠান। রাজমিস্ত্রি শুধায় যে, সুরকি খারাপ ছিল, তার কোনো দোষ নেই। সুরকিওয়ালা দোষ দিল মসলা মেশানোর ত্রুটিপূর্ণ পাত্রের কারিগর কুমোরের ওপর। কুমোর জানাল যে, এক সুন্দরী তার বাড়ির সামনে দিয়ে যেতে তাকে চমকে দেওয়ায় পাত্রটা খারাপ হয়। সুন্দরী বলল যে, শ্যাকরা তার দুল জোড়া সময়মতো না দেওয়ায় তাকে কুমোরের বাড়ির সামনে দিয়ে যেতে হয়েছিল। শ্যাকরা জানাল যে, ডুবুরি মুক্তা দিতে দেরি করায় তার গহনা গড়তে বিলম্ব হয়। শেষমেশ ডুবুরিকে পাকড়াও করা হলে সে মিনতি করে বলল যে, শুক্তিতে যদি ভালো মুক্তা না জন্মায়, তবে সে কোত্থেকে তা সময়মতো আনবে। শুক্তি তো সমুদ্রের তলায়। তাকে কীভাবে শাস্তি দেওয়া যাবে? অগত্যা সবাই মাথা চুলকাতে লাগল।

অপরের ঘাড়ে দোষ চাপানোর দিন অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। নিজের কাঁধে যারা বোঝা নিতে পারেন, তাদের দায়িত্ব দিলেই কেবল পরিস্থিতির উন্নতি হবে। অন্যথায় যে তিমিরে সেই তিমিরেই আমরা থাকতে বাধ্য হব। আমরা তা চাই না। আমাদের এখন হতে হবে সূর্যালোকে উদ্ভাসিত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত