২০১২ সালে তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকান্ডে ১১৩ জনের প্রাণহানির ঘটনার পরের বছর রানা প্লাজা ধসে নিহত হন ১১শরও বেশি শ্রমিক। তারপর থেকে পোশাক মালিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গার্মেন্টসে ব্যবহৃত সব ধরনের অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র, ফায়ার ডোর আমদানিতে শুল্ক অব্যাহতি দিয়েছে সরকার। আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনে ব্যবহৃত অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র, ফায়ার ডোরসহ অগ্নিপ্রতিরোধক অন্যান্য যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ আমদানিতেও পোশাক খাতের মতোই সুবিধা চেয়ে আসছেন অন্য খাতের মালিকরাও। তিন দিনের ব্যবধানে রাজধানীর বনানীর এফ আর টাওয়ার ও গুলশান ডিএনসিসি মার্কেটের কাঁচাবাজারে অগ্নিকান্ডের ঘটনার পর অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মো. শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন এ বিষয়ে কথা বলেছেন রায়ান বণিকের সঙ্গে
রানা প্লাজা ধসের পর পোশাক খাত অগ্নিনির্বাপষণ যন্ত্র বিনাশুল্কে আমদানির সুযোগ পেয়েছে। এই সুযোগ অন্য সবাইকে দেওয়া উচিত বলে মনে করেন কি-না?
রানা প্লাজা ধসের পর বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফেরাতে শুরু করেছিল। ওই সময় অ্যাকর্ড, অ্যালায়েন্স পোশাক খাতের মানোন্নয়নে কাজ শুরু করে। প্রত্যেকটি কারখানাতেই অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাপনায় বাড়তি বিনিয়োগ করতে হয়েছে। বিশ্বমানের জরুরি নির্গমন সিঁড়ি নির্মাণ, ফায়ার ডোর, ফায়ার হাইড্রেন্ট স্থাপন করতে হয়েছে। এসব করতে গিয়ে মালিকদের অনেক অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়। তখনই ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে কারখানায় অগ্নিনির্বাপণে ব্যবহৃত যন্ত্র ও উপকরণ বিনাশুল্কে আমদানির প্রস্তাব দেওয়া হয়। সরকার তা মেনে নিয়েছে। এতে পোশাক খাতের উন্নতি হয়েছে। ২০১৩ সালে স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের কারখানায় নাশকতার আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর পোশাক খাতে কোনো অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেনি।
অন্য খাতের ব্যবহারের জন্যও অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র আমদানিতে শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহার করা না হলেও কম হারে শুল্ক থাকা উচিত। কারণ, দেশেও এখন ফায়ার ডোর তৈরি হচ্ছে। দেশে উৎপাদিত ফায়ার ডোরের মান উন্নয়নে সরকারের নীতি সহায়তা অব্যাহত রাখা দরকার।
ফায়ার হাইড্রেন্টও কি দেশে উৎপাদিত হচ্ছে?
ফায়ার হাইড্রেন্ট উৎপাদনে বিনিয়োগ আসেনি। তবে এ খাতেও বিনিয়োগ দরকার। কীভাবে এটি করা যায় সেদিকে নজর দিতে হবে।
উঁচু ভবনগুলোতে অগ্নিকান্ডের সময় পানির সংকট দেখা দেয়। এক্ষেত্রে করণীয় কী?
ঢাকায় জমির অনেক সংকট। অল্প জমিতেই হাইরাইজ ভবন নির্মিত হচ্ছে। এসব ভবনের প্রতিটিতে আলাদা করে পানির সংরক্ষণাগার নির্মাণ করা সম্ভব নয়। প্রতিটি ভবনে পানির রিজার্ভার করতে হলে ভবন নির্মাণের মতো জায়গাই থাকবে না। তাই কেন্দ্রীয়ভাবে পানির রিজার্ভার নির্মাণ করতে হবে। প্রতিটি এলাকায় একটি করে রিজার্ভার নির্মাণ করা হলে অগ্নিকান্ডের সময় পানির সংকট হবে না।
বহুতল বাণিজ্যিক ভবন মালিকদের উদ্দেশ্যে কী বলবেন আপনি?
ভবন ব্যবহারকারীদের অগ্নি দুর্ঘটনা প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। কিন্তু এ ধরনের কোনো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই। বহুতল ভবনে আগুন প্রতিরোধে বহু ধরনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোরও নিয়মিত মনিটরিং করা হয় না। মনিটরিং আরও জোরদার করা উচিত।
কারখানাগুলোর অগ্নিবীমা থাকলেও বেশিরভাগ বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবনের অগ্নিবীমা নেই। ফলে আগুনে ক্ষতিগ্রস্তরা বীমা সুবিধা পান না। এক্ষেত্রে করণীয় কী?
বাংলাদেশ দরিদ্র অবস্থা থেকে অর্থনৈতিক উন্নতির দিকে এগুচ্ছে। এতদিন মানুষ থাকা-খাওয়ার চিন্তায় ব্যস্ত ছিল। বাড়তি সুরক্ষার কথা তারা ভাবেনি। দেশ যখন উন্নয়নের দিকে অগ্রসর হতে থাকে, তখন ধীরে ধীরে অন্য প্রয়োজনগুলোও গুরুত্ব পায়। এখন সে সময় আসছে। আগামী দিনগুলোতে অবশ্যই বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবনগুলোকে অগ্নিবীমার আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে ভবন ব্যবহারকারীদের সচেতনতাও বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
গুলশানে অগ্নিকান্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণে কোনো উদ্যোগ এফবিসিসিআই নেবে কি?
গুলশান কাঁচাবাজারে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের বেশিরভাগই ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী। অনেকের মালামাল পুড়ে গেছে। তাদের পুনর্বাসনসহ স্বল্প সুদে মূলধনের জোগান দিতে সংশ্লিষ্টদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন।