সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনার লক্ষ্যে মহাসড়কের ১০ মিটারের মধ্যে কোনো দোকান বা স্থাপনা নির্মাণ না করার পরামর্শ দিয়েছে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল। মহাসড়কের পাশে থাকা সব হাট-বাজারের ইজারা বাতিল ও দোকানের মুখ উল্টো দিকে রাখার সুপারিশও করা হয়েছে। পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা জোরদার ও দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সুপারিশ প্রণয়নের লক্ষ্যে গঠিত কমিটির প্রতিবেদনে মোট ১১১টি সুপারিশ করা হয়েছে। আজ বুধবার বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) কার্যালয়ের সভায় এসব সুপারিশ চূড়ান্ত করে আগামীকাল বৃহস্পতিবার তা সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের সভাপতি ও সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান বলেন, ‘কমিটির সব সদস্যের মতামতের ভিত্তিতে এসব সুপারিশ তৈরি করা হয়েছে। এগুলো বাস্তবায়িত হলে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আসবে।’ তিনি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতিও। ২২ সদস্যের এই কমিটিতে সদস্য হিসেবে আছেন সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির (মালিকদের সংগঠন) সভাপতি মশিউর রহমান রাঙ্গা, ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্লাহ, নিরাপদ সড়ক চাই-এর চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. শামসুল হক।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাইওয়ে পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মহাসড়কের পাশে ২৩০টি হাট-বাজার রয়েছে। যার মধ্যে ১৮৪টি সরকারিভাবে ইজারা দেওয়া। হাট-বাজারে প্রচুর লোকসমাগম হয়। এসব স্থানে প্রচুর দুর্ঘটনা ঘটে ও যানজট হয়। এই সমস্যা সমাধানে মহাসড়কের একেক পাশে ১০ মিটার করে মোট ২০ মিটার এলাকায় কোনো ধরনের বাজার ও দোকান রাখা যাবে না। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা থাকলে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুসারে ব্যবস্থা নিতে হবে।
আরও বলা হয়, মহাসড়কে কোনো ধরনের গতিরোধক রাখা যাবে না। কোনো সড়কে গাড়ির গতিসীমা ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটারের বেশি হলে সেখানে গতিরোধক দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। গার্মেন্ট এলাকাসহ কোথাও পথচারীদের জন্য ঝুঁকি থাকলে দুই সেট রাম্বল স্ট্রিপ দিতে হবে। পর্যায়ক্রমে সব সড়কে ডিভাইডার ও কম গতির গাড়ির জন্য আলাদা লেনের ব্যবস্থা করতে হবে। যাত্রা শুরুর আগে গাড়ি ও চালকের কাগজপত্র এবং নিরাপত্তা উপাদানগুলো ঠিক আছে কি না যাচাই করতে হবে। দূরপাল্লার বাস ছাড়ার আগে চালক-সহকারীসহ যাত্রীদের ভিডিও ধারণ করতে হবে।
সুপারিশে বলা হয়েছে, সব গাড়ির আয়ুস্কাল নির্ধারণ করতে হবে। ২০ বছরের পুরনো বাস ও ২৫ বছরের পুরনো ট্রাক চলাচল বন্ধ করতে হবে। মডেল আউট ট্রাকের রেজিস্ট্রেশন বন্ধ করতে হবে। চালকদের নির্দিষ্ট মজুরি দিতে হবে। দৈনিক বা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া যাবে না। মহাসড়কে নসিমন, করিমন, ভটভটি, রিকশা, লেগুনা নিষিদ্ধ করতে হবে। এলাকাভিত্তিক বা গ্রামীণ সড়কে চলার জন্য এগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। রাইড শেয়ারিং কোম্পানির জন্য নীতিমালা প্রণয়ন এবং চালকের জন্য প্রশিক্ষণ ও নিজ নিজ লোগো সম্বলিত পোশাক, ভেস্ট থাকতে হবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গাড়ি আমদানির অনুমতি দেওয়ার আগে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগের মাধ্যমে তা দেশের পরিবেশ ও সড়কের সঙ্গে মানানসই কি না যাচাই করে প্রতিবেদন নিতে হবে। প্রস্তুতকারক কর্র্তৃপক্ষের নির্ধারিত কারিগরি নির্দেশনা ছাড়া বাস-ট্রাকসহ সব মোটরযানে কোনো ধরনের পরিবর্তন-পরিবর্ধন করা যাবে না। বাসের আসনসংখ্যা বাড়ানো যাবে না। দুই আসনের মধ্যে কমপক্ষে ২৬ ইঞ্চি দূরত্ব রাখতে হবে। লেগুনা ও মাইক্রোবাসের সিটগুলো আরামদায়ক করতে হবে। সাইকেল ও রিকশার পেছনে রেট্রো-রিফ্লেক্টিভ স্টিকার লাগানো বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে রাতের আলোতে সেটা দৃশ্যমান হয়।
সুপারিশে আরও রয়েছে, শহরের ভেতর আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল না রেখে বাইরে নিয়ে যাওয়া। সিটি টার্মিনালে বহুতল পার্কিংসহ চালকদের বিশ্রাম ও সেমিনার কক্ষ রাখতে হবে। মহাসড়কে ট্রাকচালকদের জন্য বিশ্রামাগার ও পার্কিং ব্যবস্থা করা। টোল আদায় এবং ওজন স্কেলের জরিমানার নামে অনিময় দূর করা। সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের ৫ শতাংশ বরাদ্দ সড়ক নিরাপত্তার জন্য রাখা।
দূরপাল্লার বাস ও ট্রাকে প্রতি ৫ ঘণ্টা ট্রিপ দেওয়ার পর চালকের বিশ্রাম ও ৮ ঘণ্টা পর বিকল্প চালকের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি গাড়িতে লগবই রাখতে হবে। হাইওয়ে পুলিশ যাত্রার বিবরণসহ যাবতীয় পরীক্ষা করবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশের সড়ক-মহাসড়কে গতিসীমা ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটারের বেশি থাকলে স্কুল জোনিং করে দিতে হবে। ডিভাইডারবিহীন সড়কে রাম্বল স্ট্রিপ দিয়ে সেগমেন্টে ভাগ করে দিতে হবে। দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানে তিন সেট রাম্বল স্ট্রিপ ও সাইন মার্ক বসাতে হবে। সরু ব্রিজে সাইন মার্কিং করতে হবে।
সুপারিশে বলা হয়েছে, গণপরিবহনের যাত্রী, চালক, সহকারীদের করণীয় বিষয়গুলো লিফলেট বা স্টিকারের মাধ্যমে গাড়ির দৃশ্যমান স্থানে লাগাতে হবে। রাজধানী ঢাকার সব বাস টিকেটের মাধ্যমে পরিচালনা করতে হবে। সব ড্রাইভিং স্কুলের মানদণ্ড নির্ধারণ করে আন্তর্জাতিক মানের সিলেবাস প্রস্তুত ও সহজ ভাষায় ড্রাইভার ম্যানুয়াল তৈরি করতে হবে। পেশাদার চালকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষার্থীদের মাঝে ট্রাফিক আইন ও সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে ধারণা দিতে প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যক্রমে তা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
সুপারিশে রয়েছে, গাড়ির দৃশ্যমান স্থানে চালকের ছবি, লাইসেন্স, ফোন নম্বর ও কন্ডাক্টরের ছবি বাধ্যতামূলক করা। ভুয়া লাইসেন্স তৈরির বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা। শিক্ষানবিশ বা হালকা লাইসেন্স দিয়ে ভারী গাড়ি চালানো যাবে না। সড়কের মাঝখানে যাত্রী ওঠা-নামা করা যাবে না। চালকরা মোবাইল ফোনে কথা বলা ও হেডফোনে গান শুনতে পারবে না। বাস বা ট্রাকের ছাদে যাত্রী তোলা যাবে না। কেউ যাত্রী তুললে সেটি আটক করে ডাম্পিং করতে হবে। ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি বিশেষ করে হেডলাইট, ইন্ডিকেটর, দুর্বল ব্রেক, রাবার লাইনিং করা চাকা, রংচটা গাড়ি ও নষ্ট ওয়াইফারযুক্ত গাড়ি রাস্তায় চলতে না দেওয়া।
