আইএমইডির সুপারিশ উপেক্ষিত

অনুমোদন পাচ্ছে ‘অস্বাভাবিক ব্যয়ের’ আখাউড়া-সিলেট রেললাইন

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০১৯, ০২:২৪ এএম

ব্যয় নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) আপত্তির পরও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া থেকে সিলেট পর্যন্ত মিটারগেজ রেললাইনকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের প্রকল্পটি অনুমোদন পেতে যাচ্ছে। আগামী মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভার নোটিসে প্রকল্পটি এক নম্বর তালিকায় রয়েছে। প্রকল্পটি নিয়ে আইএমইডি বেশ কিছু সুপারিশ করেছিল। একই সঙ্গে পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটিও (পিইসি) বেশ কিছু বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিল। এ প্রকল্পটি ৫ হাজার কোটি টাকা দিয়েই বাস্তবায়ন সম্ভব বলে মত দিয়েছিল পরিকল্পনা কমিশন। এ বিষয়ে রেল সচিব মোফাজ্জেল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রেল খাতে চলমান সংস্কারের অংশ

হিসেবে এই প্রকল্পটি অনুমোদনের প্রস্তাব করা হয়েছে। অনেক দিন আটকে থাকলেও প্রকল্পটি মঙ্গলবার একনেক সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন হতে যাচ্ছে। প্রকল্পটি নিয়ে পরিকল্পনা কমিশন বেশ কিছু বিষয়ে ক্ল্যারিফিকেশন চেয়েছিল। আমরা সেটা দিয়েছি। এরপরই প্রকল্প অনুমোদন হচ্ছে।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের অধীনে বিশাল কাজ হবে। আখাউড়া ও সিলেটের রেল স্টেশনকে পুরোপুরি সংস্কার করা হবে। এ ছাড়া এর কার্যক্রমের ব্যাপ্তিও অনেক বেশি। আইএমইডি বললেই হবে না। তারা না জেনে প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। আমাদের হিসাবে ব্যয় ঠিকই আছে।’

এই প্রকল্পে ২৩৯ কিলোমিটারের রেললাইন ডুয়েলগেজে রূপান্তর করতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬ হাজার ১০৪ কোটি টাকা। জিটুজি (সরকার টু সরকার) পদ্ধতিতে চীন সরকার এ প্রকল্পে ১০ হাজার ৬৫৪ কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে। বাকি পাঁচ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা সরকারি তহবিল থেকে বরাদ্দ দেওয়া হবে। বর্তমানে আখাউড়া থেকে সিলেট পর্যন্ত ২২৫ কিলোমিটার মিটারগেজ রেললাইন আছে। এই রেললাইনকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর করে ২৩৯ দশমিক ১৪ কিলোমিটারে উন্নীত করতে প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ১৭৬ দশমিক ২৪ কিলোমিটার মূল রেলপথ ও ৬২ দশমিক ৯০ কিলোমিটার লুপ লাইন রয়েছে।

প্রকল্পের এই ব্যয় প্রস্তাবকে অস্বাভাবিক বলে আপত্তি জানিয়েছিল পরিকল্পনা কমিশন। কমিশনের মতে, আখাউড়া থেকে সিলেট পর্যন্ত ডুয়েলগেজ লাইন হলে ট্রেন চলাচলের হার (ফ্রিকোয়েন্সি) বাড়বে না। এ রুটে ডাবল লাইন ও ডুয়েলগেজ নির্মাণ করা হলে এ প্রকল্প থেকে সুবিধা পাওয়া যাবে। অন্যথায় সরকারের এ বিশাল বিনিয়োগে জনগণের তেমন কোনো সুবিধা হবে না।

কমিশন আরও বলছে, প্রকল্পে ব্যালাস্ট (পাথর), স্লিপার, রেলসহ অন্যান্য উপকরণের পরিমাণ ও ব্যয় চলমান সমজাতীয় অন্যান্য প্রকল্পের তুলনায় অনেক বেশি। সব মিলিয়ে প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয় সমজাতীয় অন্য প্রকল্পের তুলনায় প্রায় ৫-৭ গুণ বেশি। এত ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন সমীচীন হবে না।

রেল বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ভারতের ঋণে কুলাউড়া থেকে শাহবাজপুর পর্যন্ত ৫২ দশমিক ৫৪ কিলোমিটার রেলপথ ডুয়েলগেজে রূপান্তরে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৪৫ কোটি টাকা। এ প্রকল্পে প্রতি কিলোমিটার ব্যয় পড়ছে ১০ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। পার্বতীপুর থেকে কাউনিয়া পর্যন্ত ৬৬ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার নতুন ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় পড়ছে ১৫ কোটি ১৪ লাখ টাকা। আখাউড়া থেকে লাকসাম পর্যন্ত বিদ্যমান ৯২ কিলোমিটার রেলপথ ডুয়েলগেজে রূপান্তর ও নতুন ৯২ কিলোমিটার ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণের কিলোমিটারপ্রতি গড় ব্যয় পড়ছে ১৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকা।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, ২০২৫ সালের জুন নাগাদ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সময়সীমা ধরে ২০১৫ সালে চীনের রেলওয়ে ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করে বাংলাদেশ।

এর আগে এ বিষয়ে রেলপথমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন দেশ রূপান্তরকে বলেছিলেন, ‘একনেকে এই প্রকল্প উপস্থাপন করা হবে বলে জানি। বিস্তারিত পেপার আমার কাছে আসেনি। না জেনে কোনো কিছু বলা সম্ভব নয়।’

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) কর্মকর্তারা জানান, চীনা ঋণে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সে দেশের কোম্পানির মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই কাজ দিতে হয়। প্রকল্পের নকশা ও বিস্তারিত পরিকল্পনা তৈরিতেও তাদের হাত থাকে। সে ক্ষেত্রে পণ্যের বা মজুরির বেশি মূল্য ধরা হলেও তা সংশোধনের সুযোগ নেই।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের প্রধান এনায়েত হোসেন বলেন, ‘এতে ভূমি অধিগ্রহণের বিষয় রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে গেলে ব্যয় এ রকমই হবে। তা ছাড়া সিলেট রেল স্টেশনটি বদলে যাবে। পাশাপাশি অন্য স্টেশনগুলোকেও আধুনিকায়ন করা হবে। সরকারিভাবে চীনা অর্থায়নের প্রকল্প ব্যয় একটু বেশিই হয়।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত