কোন পথে নির্বাচনী ব্যবস্থা

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০১৯, ০৯:৩৯ পিএম

দেশে নির্বাচন আসে, নির্বাচন হয় এবং কেউ জেতে, কেউ হারে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দেশের নির্বাচনে একচেটিয়া বিজয়ীরা উৎসব করে, নানা রকমের উৎসবের ভেতর দিয়ে বিজয়ের উল্লাস প্রকাশ করে। তারা মিছিল করে, এবং মিছিলের নিচে পদদলিত হয় তারা যারা জেতেনি, জিতবে না, যাদের জন্য জিতবার কোনো উপায় নেই, পরাজয়ই যাদের আজন্ম বিধিলিপি। না, পদদলিতরা বিরোধী দলের লোক নয়, বিরোধীরা তো লুকিয়ে থাকে, পালিয়ে বাঁচে। পদদলিতরা সাধারণ মানুষ। ১১ মার্চ তারিখ ঘটেছে এক ঘটনা, কুড়িগ্রামে; পরের দিন কাগজে যেটা এসেছে এই রকমের শিরোনাম দিয়ে, ‘বিজয় মিছিল পাড়িয়ে মারল শিশুটিকে’। (পুড়িয়ে নয়, পাড়িয়ে) শিশুটির অপরাধ সে বিজয় মিছিল দেখতে গিয়েছিল। উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন একজন, তিনি বিজয় মিছিল বের করেছেন; শিশুটি উৎসব দেখতে গেছে, এবং প্রাণ হারিয়েছে পদপিষ্ট হয়ে।

এবারের উপজেলা নির্বাচনে অবশ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা বলতে তেমন কিছু নেই। এরই মধ্যে অধিকাংশ চেয়ারম্যান বিনা ভোটেই নির্বাচিত হয়ে গেছেন, যেমন ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদের নির্বাচনে ১৫৩ জন সদস্য নির্বাচিত হয়ে গিয়েছিলেন, যার জন্য কোনো ভোটের দরকার পড়েনি। কোনো প্রকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল না। কথাই তো আছে যে আগের হাল যেদিকে যায় পিছের হালও সেদিকে চলে, এবারের উপজেলা নির্বাচনেও জাতীয় নির্বাচনের মতোই ঘটনা ঘটেছে; তার মধ্যেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা কোথাও কোথাও হয়েছে, সে-সব ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের সঙ্গেই আওয়ামী লীগের লড়াই ছিল, ‘বিদ্রোহী’রা দলের মনোনয়নের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে, এবং বেশ কিছু ক্ষেত্রে জিতেছেও, যেমন কুড়িগ্রামের ওই উপজেলাটিতে, সেখানে আওয়ামী লীগের নৌকার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগেরই আরেকজন, আকবর হোসেন হিরো, আনারস নিয়ে দাঁড়িয়ে গেছেন; নৌকা হেরে গেছে, তার পরে আনারসওয়ালাদের বীরত্বব্যঞ্জক উন্মত্ত বিজয়োল্লাস এবং পদদলিত হয়ে শিশুটির মৃত্যু। শিশুটির বাবা একজন জেলে, মাছ ধরে খায়।

উপজেলা নির্বাচন নিয়ে খবর আরও আছে। যেমন নির্বাচনী সহিংসতায় রাঙ্গামাটিতে একজন নির্বাচন কর্মকর্তা এবং চারজন আনসারসহ সাত জন নিহত হয়েছেন; এবং তার কয়েক ঘণ্টা পরেই নিহত হয়েছেন ওই এলাকারই আওয়ামী লীগের একজন নেতা। আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায়, এ কথা এখন আর সত্য নয়, পাহাড় মাঝেমধ্যেই অশান্ত হয়, বাঙালি-পাহাড়ি বিরোধ বাধে, এখন দেখা দিয়েছে নির্বাচন নিয়ে দলীয় বিরোধ। ওই একই দিনে সমতলে সুনামগঞ্জে দলীয় ঘাতকের হাতেই প্রাণ হারিয়েছেন আরেকজন স্থানীয় আওয়ামী নেতা। ওদিকে একটি দৈনিক প্রথম পাতায় লিখেছে, ‘ভোটারে নয়, পুলিশেই আস্থা প্রার্থীদের!’ খবরটি বলছে, ‘উপজেলা নির্বাচনে বিজয়ী হতে প্রতিদ্বন্দ্বী বিভিন্ন প্রার্থী ভোটার নয়, পুলিশের ওপরই ভরসা করছেন। বিভিন্ন প্রার্থী ও আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে কথা বলে এবং অনুসন্ধানে এই তথ্যের সত্যতা মিলেছে। জানা গেছে, নৌকার প্রার্থীর পাশাপাশি বিদ্রোহী প্রার্থীও জয় পেতে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে নিয়ামক মনে করছেন। বিভিন্ন প্রার্থীর এ ধরনের বিস্তর অভিযোগও জমা পড়েছে নির্বাচন কমিশনে (ইসি)। তবে ইসি এ ব্যাপারে কঠোর মনোভাব দেখাচ্ছে। অভিযোগের মুখে বিভিন্ন স্থানে পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবুও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নির্ভরতা পুলিশই।’ (দেশ রূপান্তর, ১৮ মার্চ) ভোটের ব্যাপারে নির্ভর করা গেলেও নিরাপত্তার ব্যাপারে পুলিশের ওপর যে নির্ভর করা যাচ্ছে তা নয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচনেও খুন-খারাবি প্রচুর হচ্ছে। এক গ্রামের লোক অন্য গ্রামের লোককে লাঠিসোঁটা-বাঁশ-সড়কি নিয়ে আক্রমণ করছে। যেমন গত মাসের ১৭ তারিখের একটা খবর। জয়পুরহাটের কানাই উপজেলায় সংঘর্ষে দুজন খুন হয়েছে, আহত হয়েছে বারজন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে আক্রমণকারী এবং আক্রান্ত উভয়েই আওয়ামী লীগেরই লোক।

প্রসঙ্গ যখন উঠলই তখন স্মরণ করা যাক যে, ২০১৮-এর শেষে জাতীয় নির্বাচনে ভোট ছাড়া কোনো প্রার্থী যে জিতেছে এমনটা কেউ বলতে পারবেন না; সকলেই বিপুল সংখ্যক ভোট পেয়ে জিতেছেন, তবে ভোট দিতে ভোটারদের দিনের আলোতে ভোটকেন্দ্রে যেতে হয়নি, তাদের পরিশ্রম লাঘবকরণের সদ্বিবেচনায় তাদের হয়ে প্রশাসনের লোকেরাই রাতের বেলাতে ভোটের বাক্স ভরে দিয়েছেন। এমনকি নির্বাচন কমিশনের মাননীয় প্রধান পর্যন্ত একটি বেঁফাস মন্তব্যে ঘটনার সত্যতা ফাঁস করে দিয়েছেন। শাক দিয়ে মাছ ঢাকা একটি ইতিহাসপ্রসিদ্ধ রীতি বটে; কিন্তু মাছের সাইজ যদি বেখাপ্পা রকমের বড় হয় তবে বেচারা শাকদের অসুবিধা ঘটে, মাছের সর্বাংশ ঢেকে রাখতে তারা ব্যর্থ হয়। এক্ষেত্রে তেমনটাই ঘটেছে।

বাংলাদেশের বড় মাপের মিত্র দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আঁধার রাতের এই নির্বাচনকে যে মেনে নেয়নি তা নয়, মেনে নিয়েছে; কারণ মেনে না নিলে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যে অসুবিধা, কিন্তু তবু তাদের স্টেট ডিপার্টমেন্ট চক্ষুলজ্জার খাতিরে হলেও নিজেদের বিশ্ব মানবাধিকার প্রতিবেদনে বাংলাদেশ পরিস্থিতির মূল্যায়নে বিরূপ মন্তব্য না করে পারেনি। মন্তব্যটা এ রকমের, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগ গত ডিসেম্বর মাসে অকল্পনীয় একপেশে সংসদীয় নির্বাচনের মাধ্যমে পাঁচ বছর মেয়াদের জন্য টানা তৃতীয়বার নির্বাচিত হয়েছে। ওই নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু বিবেচিত হয়নি। বিরোধী পোলিং এজেন্ট ও ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, জালভোট প্রদানসহ অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। নির্বাচনের আগে প্রচারের সময় হয়রানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তার ও সহিংসতার কারণে বিরোধী অনেক প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের মিছিল-সমাবেশ ও স্বাধীনভাবে প্রচার কঠিন হয়ে পড়ার বিশ্বাসযোগ্য তথ্য রয়েছে।’ এসব পর্যবেক্ষণ মার্কিন সরকারের, তবে দেশের ভেতর থেকে আমরা যারা নির্বাচনের গোটা প্রক্রিয়াটা দেখেছি ও অনুভব করেছি তাদের অভিজ্ঞতা ছিল অনেক বেশি প্রত্যক্ষ ও প্রসারিত। এবং অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেদনে এ তথ্যও দেওয়া আছে যে, ‘আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের তাদের পর্যবেক্ষণ মিশন পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সময়সীমার মধ্যে বাংলাদেশ অ্যাক্রিডিশন (অনুমতিপত্র) ও ভিসা দেয়নি।’ বলা হয়েছে যে, ‘ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের ২২টি এনজিওর মধ্যে মাত্র ৭টিকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।’ মার্কিনিদের নিজেদের দেশে মানবাধিকার দুর্দশা যাই হোক না কেন, অন্যদেশের মানবাধিকার লঙ্ঘন বিষয়ে রাষ্ট্রটি বেশ সরব থাকে; আমাদের ব্যাপারেও বিলক্ষণ সচেতন আছে দেখা যাচ্ছে। তাদের প্রতিবেদনে বাংলাদেশে যেসব মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয় তার একটা তালিকা দেওয়া হয়েছে। তালিকায় উল্লেখ রয়েছে; ‘বেআইনি বা বিনা বিচারে হত্যা, গুম, নির্যাতন, সরকার বা তার পক্ষে বেআইনি বা পরোয়ানা ছাড়া আটক, কঠোর ও জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ কারাগার পরিস্থিতি, রাজনৈতিক বন্দি, ব্যক্তিগত বিষয়ে বেআইনি হস্তক্ষেপ, সেন্সরশিপ, সাইট ব্লক ও আপত্তিকর বিবৃতি এবং এনজিও কর্মকা-ের ওপর নিয়ন্ত্রণ, শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হওয়া ও সংগঠন করার অধিকারের ওপর উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বিধিনিষেধ, স্বাধীনভাবে চলফেরার ওপর উল্লেখযোগ্য বিধিনিষেধ, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার ওপর বিধিনিষেধ, অবাধ ও সুষ্ঠু এবং প্রকৃত নির্বাচন না হওয়া, দুর্নীতি ও মানবপাচার।’ তালিকাটা ছোট নয়। তালিকা এখানেই শেষও হয়নি, দেখা যাচ্ছে রয়েছে এ তথ্যও যে বাংলাদেশে বলবৎ আছে ‘স্বতন্ত্র শ্রমিক সংগঠনগুলোর ও শ্রমিকদের ওপর বিধিনিষেধ ও ভয়ংকর মাত্রায় শিশুশ্রম’। কৃষকের মানবাধিকার কোন দশায় আছে তার উল্লেখ অবশ্য নেই, গণধর্ষণ ও শিশুধর্ষণ বাদ পড়েছে, বোধ করি ধরে নিয়েছে এসব তো আছেই, চলবেই; ভাবছে বোধ করি যে উল্লেখ করাটা অপ্রাসঙ্গিক।

আমেরিকার ওই পর্যবেক্ষণ-প্রতিবেদনে দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথাও চলে এসেছে। বলা হয়েছে, ‘নিরাপত্তা বাহিনী যেসব নিপীড়নমূলক কাজ করে সেগুলোর জন্য দায়মুক্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে।’ আবার এটাও উল্লেখ করা হয়েছে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনকালে দায়ের-করা মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাদ- হয়েছে, এবং আরও অনেক বিরোধী রাজনীতিকের নামে মামলা রয়েছে। প্রতিবেদনের মতে নির্বাচনের আগে পুলিশ নাকি ‘প্রায় চার লাখ পঁয়ত্রিশ হাজার বিএনপি সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে। বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিরুদ্ধে অন্তত ৮৬টি মামলা আছে’। প্রতিবেদনটি জানাচ্ছে যে, তদন্তকারীরা বলেছেন, ‘মানবাধিকার পর্যবেক্ষকরা এসব মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশপ্রণোদিত বলে মনে করে।’ গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রসঙ্গও বাদ যায়নি। বলা হয়েছে, ‘সরকারের সমালোচনাকারী গণমাধ্যমগুলো নেতিবাচক চাপের মধ্যে রয়েছে। তারা বিজ্ঞাপন হারিয়েছে। এবং এ কারণে অনেকে স্বেচ্ছায় সেন্সরশিপ আরোপ করেছেন। সরকার টেলিভিশনগুলোর সম্পাদকীয় নীতিতে নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।’ (কালের কণ্ঠ, ১৪ মার্চ ২০১৯) প্রতিবেদন প্রণেতারা অবশ্য এটা খেয়াল করেনি যে, নগণ্য ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে গণমাধ্যমের প্রায় সবটাই এখন সরকার-সমর্থক। এদের মালিকরা হয় ব্যবসায়ী, নয়তো সরকারি দলের লোক, কেউ কেউ আবার দুটোই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত