রাজধানীর ভাটারা থানার এসআই শাহিন মোহাম্মদ আমানুল্লাহ ধর্ষণের শিকার এক তরুণীকে সহায়তা না করে এবং মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারের উদ্যোগ না নিয়ে উল্টো প্রায় পাঁচ মাস ধরে তাকে নানাভাবে হয়রানি করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অস্বীকার করে উল্টো ওই তরুণীর চরিত্রহননের চেষ্টা করেছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। দল বেঁধে ধর্ষণের ঘটনার অভিযোগকে থানাপুলিশ ধর্ষণচেষ্টার মামলা গ্রহণ করেছিল। কিন্তু ওই তরুণীর অব্যাহত চেষ্টার পর আদালতের আদেশে মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে পাঠানোর এক সপ্তাহের মাথায় জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তারের পর মামলাটি ধর্ষণের মামলায় রূপান্তরিত হয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই ঢাকা মহানগর (উত্তর) এসআই আল আমিন শেখ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চাঞ্চল্যকর এই ধর্ষণ মামলার তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে জেলে পাঠানো হয়েছে। তারা ধর্ষণের কথা স্বীকারও করেছে। এটি ধর্ষণচেষ্টা নয়, পরিকল্পিত গণধর্ষণ। মামলার অন্যতম আসামি বর্ষাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। দ্রুত সময়ের মধ্যেই তাকে গ্রেপ্তারে সক্ষম হব বলে আশা করছি।’
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন মামলার প্রধান আসামি নবীরুল ইসলাম (৩৮), তার সহযোগী শাহাদাত হোসেন (৩৫) ও মো. কাউসার (২২)। নবীরুল লালমনিরহাটের হাতীবান্ধার পূর্ব সারডুবির মৃত সোলেমানের ছেলে, কাউছার ময়মনসিংহের ত্রিশালের রায়গ্রাম এলাকার বুলবুল আহম্মেদের ছেলে এবং শাহাদাত কুমিল্লার বড়ুয়ার পুষ্করিণীর পাড় এলাকার মৃত ইয়াসিনের ছেলে। তারা তিনজনই গাড়িচালক।
রাজধানীর একটি কলেজের প্রথম বর্ষে পড়ুয়া ওই তরুণীর অভিযোগ, বছর দুই আগে শিল্পকলা একাডেমিতে বর্ষা রহমান নামে এক মেয়ের সঙ্গে পরিচয়ের পর ঘনিষ্ঠতা হয়। এক পর্যায়ে বর্ষা তার বন্ধু নবীরুলের সঙ্গে তাকে পরিচয় করিয়ে দেয়। নবীরুল তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চাইলেও তিনি রাজি হননি। এক পর্যায়ে বর্ষার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। কিন্তু বর্ষার চেষ্টায় তাদের মধ্যে আবার যোগাযোগ হয়। গত বছরের ১২ অক্টোবর বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে ওই তরুণীকে কৌশলে নবীরুলের হাতে তুলে দিয়ে নিজে সটকে পড়ে বর্ষা। তাকে একটি প্রাইভেটকারের নিয়ে দুই সহযোগীকে নিয়ে ওই তরুণীকে ধর্ষণ করে নবীরুল। ধর্ষণে বাধা দেওয়ায় আঘাত করে রক্তাক্ত করে ওই তরুণীকে। পরে খিলক্ষেত এলাকায় রাস্তার পাশে ফেলে রেখে যায়। ওই রাতেই রাজধানীর ভাটারা থানায় অভিযোগ নিয়ে গেলে সারা রাত তাকে থানায় বসিয়ে রেখে পরদিন ধর্ষণচেষ্টার মামলার নেওয়া হয়। এরপর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই শাহিন আসামি না ধরে তার সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলতে চান। রাজি না হওয়ায় তাকে লাগাতার ফোন করে বিরক্ত করতেন।
ধর্ষিতা ওই তরুণী গতকাল শুক্রবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ধর্ষণের বিচার চাইতে গেলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ভাটারা থানার এসআই শাহিন মোহাম্মদ আমানুল্লাহ আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করার প্রস্তাব দেয়। সে আসামি না ধরে আমাকে ফোনে বিরক্ত করতে থাকে। আমি তখন মানসিকভাবে খুবই বিপর্যস্ত ছিলাম। এমন সময় ওই এসআইয়ের এমন প্রস্তাব আমাকে আরও অসহায় করে তোলে। একবার ভেবেছিলাম আত্মহত্যা করব। পরে তদন্ত কর্মকর্তার ফোন নম্বর ব্লক করি এবং তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনের আবেদন করি।’
নতুন তদন্ত কর্মকর্তা এসআই বিলকিসও আসামি আটক করতে পারেনি। এর মধ্যে আসামিরা ওই তরুণীকে অব্যাহত হুমকি দিতে থাকে। নিরুপায় হয়ে তিনি এ বছরের ৭ জানুয়ারি বিচার চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে একটি আবেদন করে। পরে মামলাটি গত ১৯ মার্চ পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের কাছে পাঠায় আদালত। এরপর ২৭ মার্চ মামলার তিন আসামিকেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই।
জানতে চাইলে গত সোমবার এসআই শাহিন মোহাম্মদ আমানুল্লাহ প্রথমে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোনো ধর্ষণের ঘটনায় ঘটেনি। আমি এখন ব্যস্ত আছি। পরে ফোন দেন।’ পরে মঙ্গলবার তিনি বলেন, ‘আমি ওই মেয়েকে বলেছিলাম “অ্যাজ অ্যা ফ্রেন্ড” আমাকে পুরা ঘটনা বলো। কিন্তু সে আমাকে ভুল বোঝে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ওই মেয়ের বান্ধবী বর্ষা আমাকে বলেছে, এর আগেও নবীরুল ইসলামের সঙ্গে মদের পার্টিতে গেছে ওই মেয়ে। যেবার ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে সেবার ছিল তৃতীয়বার।’
থানাপুলিশের হয়রানির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ভাটারা থানার তৎকালীন ওসি এসএম কামরুজ্জামান (বর্তমানে গুলশান থানায়) বলেন, ‘ওই তরুণী যে অভিযোগ করে তার ভিত্তিতেই আমরা মামলা নিয়েছি। তাকে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে পাঠিয়েছি। সে তখন মেডিকেলও করতে চায়নি। পরে মামলাটি পিবিআইতে স্থানান্তরিত করা হয়। ধর্ষিতাকে তদন্ত কর্মকর্তার বন্ধুত্বের প্রস্তাব দেওয়ার বিষয়টি আমার জানা নেই।’
