এমবিবিএস পাস করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) ছেড়েছিলেন ১৯৯৯ সালে। এরপর আর আসা হয়নি ডা. লোটে শেরিংয়ের। কমপক্ষে ২০ বছর পর নিজের সেই পীঠস্থানে আবারও ফিরলেন। তবে শুধু চিকিৎসক বা সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবেই নন; ফিরলেন একেবারে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী হয়ে। গত রবিবার স্মৃতির সেই ক্যাম্পাসে পুরনো বন্ধু সহপাঠীদের সঙ্গে উদযাপন করলেন বাংলা নববর্ষ। কাটালেন প্রায় ৩ ঘণ্টা।
নিজের ক্যাম্পাসজীবনের ফেলে আসা দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে রীতিমতো নস্টালজিক হয়ে পড়লেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী। স্মৃতিচারণ করলেন ছাত্রজীবনে কঠোর অধ্যবসায়ের সেই দিনগুলো। এখানে পড়া অবস্থাতেই একবার চিকিৎসকের অবহেলাতেই তার জীবন বিপন্ন হতে বসেছিল বললেন সেই গল্পও। সবচেয়ে বেশি অবাক করে দিলেন সুন্দর অনর্গল বাংলায় কথা বলে।
ভবিষ্যতের চিকিৎসকদের ‘রোগী বন্ধু’ হওয়ার সুপরামর্শও দিলেন। জানিয়ে দিলেন, ভালো চিকিৎসক হওয়ার চেয়েও জরুরি ভালো মানুষ হওয়া। প্রায় ২৭ মিনিটের বক্তৃতা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনলেন সবাই।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ২৮তম ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থী ভুটানের প্রধানমন্ত্রী গত রবিবার বেলা ১১টার দিকে হেলিকপ্টারযোগে ময়মনসিংহে পৌঁছান। পহেলা বৈশাখ উদযাপন করতে কলেজ ক্যাম্পাসে আসেন। দুপুর ১২টার দিকে কলেজ মিলনায়তনে দেওয়া এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে খুলে বসেন স্মৃতির ডালি। সংবর্ধনা শেষে তিনি কলেজ গ্যালারিতে নিজের ২৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং অন্তরঙ্গ সময় পার করেন। আড্ডা দেন বাংলাদেশের তার বন্ধু সহপাঠীদের সঙ্গে।
মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. আনোয়ার হোসেন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ও ভুটানের প্রধানমন্ত্রীকে ক্রেস্ট উপহার দেন। অনুষ্ঠানে ত্রাণ ও দুর্যোগ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান, স্বাস্থ্য সচিব জি এম সালেহ উদ্দিন বক্তব্য রাখেন। এ সময় ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. টান্ডি দরজি, স্বাস্থ্যমন্ত্রী লায়োনপু দিহেন ওয়াংমু, প্রধানমন্ত্রীর সহর্ধমিণী ডা. উগেন ডেমা, জেলা প্রশাসক ড. সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
১৯৯১ সালে মমেকে পড়তে আসেন লোটে শেরিং। ১৯৯৯ সালে এখান থেকে এমবিবিএস পাস করেন। পরে সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও আইপিজিএমআর বা পিজি হাসপাতালের (বর্তমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) সার্জারি বিভাগে এফসিপিএস কোর্স শেষ করে ভুটান ফিরে যান ডা. লোটে শেরিং।
চতুর্থ বর্ষেই জীবন বিপন্ন হতে বসেছিল : ডা. লোটে শেরিং বলেন, আমি তখন চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। থাকতাম কলেজ ছাত্রাবাসের ওয়েস্ট ব্লকের ২০ নম্বর কক্ষে। একদিন রাতে হঠাৎ পেট ব্যথা অনুভব করলাম। সঙ্গে ছিলেন আমার হলের সিনিয়র বন্ধু ডা. সিলভা রাজত। সেই রাতে আমি তিনবার বমি করেছিলাম। পরের দিন সকালে সে আমাকে হাসপাতালের আউটডোরে নিয়ে গিয়েছিল।
‘তখনকার সময়ে আমরা আবাসিক চিকিৎসককে আরপি বলতাম। ছাত্র এবং রোগী হিসেবে এর আগে কখনই তার কাছে যাওয়া হয়নি। তার কক্ষে প্রবেশ করে আমি আমার রোগের লক্ষণগুলো বলার চেষ্টা করছিলাম। তখন তিনি আমাকে থামিয়ে দিতে চাইলেন। আমি বললাম অনেক দিন যাবৎ আমি এই সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। এরপর উনি ন্যূনতম অপেক্ষা না করে আমাকে ওমিপ্লাজল এবং ব্যথানাশক ওষুধ দিয়ে দিলেন’Ñ বললেন লোটে শেরিং।
‘ওইটা নিয়ে আমি আবার আমার ২০ নম্বর কক্ষে চলে গেলাম। বিশ্রাম নিলাম। যদিও ওমিপ্লাজল, রেনিটিডিন কোনো কিছুই কাজ করল না। পরের দিন সকালবেলা আমি আবারও বন্ধুসহ একই আরপির কাছে গেলাম। তখন তিনি বললেন, যদি ক্লাস না করে বিশ্রাম নিতে চাও স্টুডেন্ট কেবিনে গিয়ে ভর্তি হও। আমি একটি স্টুডেন্ট কেবিনে ভর্তি হয়ে গেলাম। যেহেতু আবাসিক ডাক্তার অ্যাডমিশন দিয়েছেন মেডিসিনে তাই মেডিসিনের অধ্যাপকরা রাউন্ডে আসছেন। কিন্তু কোনো কিছুই হচ্ছে না’Ñ হতাশা নিয়েই সে রাতের কথা বলছিলেন ডা. লোটে।
‘আমি জানি না ঠিক কতদিন পর ভিন্ন একটি গ্রুপের ডাক্তাররা ওই স্টুডেন্ট কেবিন পরিদর্শন করতে আসলেন। সম্ভবত সার্জারি ডাক্তারদের একটি টিম। সন্ধ্যার সময় আমি স্পষ্ট মনে করতে পারছি একজন ভদ্রলোক বললেন, আরে এই ছেলেটা এভাবে পড়ে আছে কেন? কতদিন ধরে এভাবে আছে? এটা তো অ্যাপেনডিসাইটিস। এটা তো ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। ব্যাপারটা আমাদের সঙ্গে আলোচনা করলেই হতো। তার দ্রুত অস্ত্রোপচার দরকার। আমি নিজেই এটি করব’Ñ বললেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী।
‘ডাক্তার আমাকে বলল চিন্তা কোরো না, চিন্তার কোনো কারণ নেই। যদিও তোমার পিতা-মাতা এখান থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছেন। আমি এ ধরনের হাজারো সমস্যা সমাধান করেছি। তুমি নিশ্চিত থাকো, তোমার কোনো সমস্যা হবে না। সেদিন রাতে সম্ভবত ৯টা থেকে ১০টায় অপারেশন থিয়েটারে ছিলাম। আমার অ্যাপেনডিকস বেরিয়ে এলো। এটি বিশাল ছিল। এরপর আমি দুই থেকে তিন সপ্তাহ কেবিনে অবস্থান করলাম। আমি বিরতি নিলাম। এরপর সময়মতো আমি আমার ক্লাস শুরু করলাম।’
সংবর্ধনা মঞ্চের সামনে দর্শক সারিতে বসে থাকা সবার উদ্দেশে ডা. লোটে শেরিং বলেন, ‘তখন আমার কী মনে হয়েছে জানেন? যেটা আমরা সব সময়েই অনুভব করি। কিন্তু সেদিন নিজের সাথে হয়েছে বলে আমার মনে আছে। আমরা আমাদের কাজটা একটু হালকাভাবে নিলে আরেকজনের জীবনের মূল্য দিতে হতে পারে। সেজন্য অবশ্যই ব্যাপারগুলোকে সিরিয়াসলি নেবেন। আমরা রোগীদের সঙ্গে সব সময় থাকি। কিন্তু রোগীরা আমাদের সঙ্গে সব সময় থাকে না। তারা আমাদের কাছে খুবই অল্প সময়ের জন্য আসেন। সেজন্য প্রত্যেক রোগীকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত।’
সে রাতের সেই মহানুভব চিকিৎসকের কথাও বললেন ডা. শেরিংÑ ‘যিনি আমাকে অপারেশন করেছিলেন তিনি অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম। তিনি রোগী হিসেবে আমার মাঝে আত্মবিশ্বাস তুলে এনেছিলেন। সেদিন থেকে অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম এবং আমর মাঝে সম্পর্কটা পাল্টে গেছে। সেদিন থেকে তিনি শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্ককে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। আসলে চিকিৎসা পেশাই সর্বোৎকৃষ্ট পেশা।’
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কৃতিত্ব ডা. দরজির : ডা. লোটে শেরিং নিজের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পেছনে পুরো কৃতিত্ব দিয়েছেন তার কেবিনেটের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. টান্ডি দরজিকে। তার সঙ্গে দরজিও পড়েছেন ময়মনসিংহ মেডিকেলে। তার চেয়ে চার ব্যাচ সিনিয়র ছিলেন। সেই স্মৃতিচারণ করে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৯১ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত আমি ও আমার সহপাঠী ডা. টান্ডি দরজিসহ কলেজ ছাত্রাবাসে ২০ নম্বর কক্ষে থেকেছি। এখনো একসাথে আমরা রাজনীতি করছি। আমাদের মাঝে আজ অবধি কোনো মনোমালিন্য হয়নি। আজ তার কারণেই আমি প্রধানমন্ত্রী হয়েছি।
আড্ডা দিলেন সহপাঠী বন্ধুদের সঙ্গে : ২৮তম ব্যাচের ছাত্র ও ডা. লোটে শেরিংয়ের কলেজ জীবনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ডা. মো শফিকুল বারী তুহিন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডা. লোটে শেরিং কঠিন অধ্যবসায়ের জোরেই সাফল্যের স্বর্ণশিখরে পৌঁছুতে সক্ষম হয়েছেন। কলেজজীবনে লাইব্রেরিতেই তিনি বেশি সময় দিতেন। লোটে একেবারেই নিরহংকারী। ভুটানের প্রধানমন্ত্রী হয়ে আমাদের মাঝে এসে তিনি বলে গেছেন, বন্ধুত্বের টানেই তিনি এখানে এসেছেন। অনেকক্ষণ আমাদের সঙ্গে গল্প করেছেন। স্মৃতিচারণ করেছেন। লোটেকে ঘিরে দুই দেশের মধ্যে ভ্রাতৃপ্রতিম সম্পর্ক আরও জোরদার হবে বলে আমরা আশাবাদী।
ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর কলেজজীবনের আরেক বন্ধু ডা. আসাদুজ্জামান রতন বলেন, লোটে শেরিং একদমও বদলাননি। ছাত্রজীবনেও যেমন মন-মননের অধিকারী ছিলেন এখনো ঠিক তেমনই আছেন। তার সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটাতে পেরে আমাদের ভালো লেগেছে। এই সময়টা আমাদের জীবনে ইতিহাস হয়ে থাকবে।
এম-২৮ ব্যাচের শিক্ষার্থী অধ্যাপক ডা. রুহুল কুদ্দস রুপম জানান, মেডিকেল কলেজের অডিটোরিয়ামে সংবর্ধনা শেষে দুপুর ১২টার দিকে ডা. লোটে শেরিং স্ত্রী ডা. উগেন ডেমাকে সঙ্গে নিয়ে কলেজের ২ নম্বর গ্যালারিতে আসেন। সহপাঠীরা তাকে কাছে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। সহপাঠীদের পক্ষ থেকে এম-২৮ ব্যাচের আগামী পুনর্মিলনীতে ডা. লোটেকে আমন্ত্রণ জানানো হলে তিনি পরবর্তী পুনর্মিলনী ভুটানে করার প্রস্তাব দিয়েছেন।
ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর আরেক সহপাঠী ডা. রোকশানা করিম জানান, ডা. লোটে গ্যালারিতে আসার পর উপস্থিত অধিকাংশ সহপাঠীকে নাম ধরে কাছে ডেকে নেন। আরেক সহপাঠী ডা. শফিকুল বারী জানান, প্রায় ৩০ মিনিট তিনি আমাদের সঙ্গে কাটিয়েছেন। এই সময়ে সহপাঠী বন্ধুরা ডা. লোটে এবং তার সহধর্মিণীর সঙ্গে সেলফিও তুলেছেন।
