উপজেলা আ.লীগের সভাপতি হয়ে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন রুহুল আমিন

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০১৯, ০৩:৫৫ এএম

ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় আলোচনায় আসেন উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি রুহুল আমিন। গত শুক্রবার আটকের পর গতকাল শনিবার রাতে তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কর্মকর্তারা জানান, হত্যাকারীরা নুসরাতের গায়ে আগুন লাগানোর পর মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সহসভাপতি রুহুল আমিনকে ফোনে ‘কাজ হয়ে যাবার’ বার্তা জানায়। ওই সময় রুহুল বলেন, ‘আমি জানি। তোমরা পালিয়ে যাও। আমি থানায় যাচ্ছি।’ রুহুল আমিনের এমন নির্দেশের পর তার সহযোগীরা ঘটনাস্থল থেকে হত্যাচেষ্টাকারীদের সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলে করে সরিয়ে নেয়।

সোনাগাজী উপজেলার চরচান্দিয়া ইউনিয়নের উচিয়াঘোনা কেরানি বাড়ির কোরবান আলীর ছেলে রুহুল আমিন। পড়াশোনা করেছেন তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত। তার বড় ভাই আবুল কাশেম ও আবু সফিয়ান যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী। সেখানে তারা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কয়েকজন।

স্থানীয় ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়,  নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার পর শুরু হয় একে ‘আত্মহত্যা’ বলে প্রচারের চেষ্টা। এটি সমন্বয় করেন থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন ও রুহুল আমিন। সহযোগিতা করেন 

 

 কাউন্সিলর মাকসুদ আলম। টাকার জোগান দেন অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার। দায়িত্ব ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ঘটনাকে আত্মহত্যা বলে প্রচার করা এবং নিজেদের আইডি থেকে অপপ্রচার চালানো। অর্থের জোগানের জন্য ঘটনার আগের দিন ৫ এপ্রিল মাদ্রাসার ভেতরের পুকুর থেকে সোয়া এক লাখ টাকার মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করেন রুহুল আমিন ও মাকসুদ আলম।

সোনাগাজী সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটির সহসভাপতি রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। বিএনপি-যুবদল নেতাদের সঙ্গে সখ্য রেখেও অল্প দিনে তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ পদে চলে আসতে সক্ষম হন। একসময়ের জাতীয় পার্টির সদস্য রুহুল আমিন সোনাগাজী ফরিদ সুপার মার্কেটের সামনের এক সমাবেশে উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ফয়জুল কবিরের হাতে ফুল দিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন।

আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৭ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার পর ৪ বছর দলীয় কোনো কার্যক্রমে অংশ নেননি রুহুল। ২০০১ সালে চলে যান সৌদি আরব। সেখানে ট্যাক্সি চালাতেন। ২০০৯ সালে সোনাগাজী ফিরে আসেন। ২০১৩ সালে উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনের আগে ৪৪ নম্বর কাউন্সিলর মনোনীত হন তিনি। ২০১৫ সালে রুহুল অনেকটা আকস্মিকভাবে সোনাগাজী ছাবের পাইলট হাই স্কুলের পরিচালনা কমিটির সভাপতি মনোনীত হন।

স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি সূত্র জানায়, ডা. গোলাম মাওলা শহীদ ছাবের পাইলট হাই স্কুলের পরিচালনা কমিটিতে সভাপতি পদে প্রার্থী ছিলেন। কিন্তু সোনাগাজী বাজারের পশ্চিমাংশের একটি পক্ষ হঠাৎ করে রুহুল আমিনকে সেখানে নিয়ে যায় এবং অভিভাবক সদস্যসহ কয়েকজন সদস্যকে চাপ প্রয়োগ করে তাকে সভাপতি করতে বাধ্য করে। শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যানের মাধ্যমে স্থানীয় সংসদ সদস্য হাজী রহিম উল্লাহ সভাপতি মনোনীত হলেও সভাপতির চেয়ারে বসতে পারেননি। তিনি অভিযোগ করেন, রুহুল আমিন ও তার লোকজন জোর করে পদটি দখল করে নেয়।

ওই সূত্রটি জানায়, ২০১৫ সালে জেলা আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতার টেন্ডারবাজি ও অনিয়ম-দুর্নীতির বিরোধিতা করায় হঠাৎ রহিম উল্লাহকে বাদ দিয়ে এক নম্বর সহসভাপতি করা হয় রুহুল আমিনকে। এরপর ২০১৭ সালে ফয়জুল কবির চিকিৎসাধীন থাকার সুযোগে প্রথমে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হন রুহুল আমিন। ২০১৮ সালের শুরুতে উপজেলা আওয়ামী লীগের এক সভায় রুহুল আমিনকে প্রথমে উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয়। জাতীয় নির্বাচনের আগে কোনো কাউন্সিল ও দলীয় রেজুলেশন ছাড়াই নিজেকে সভাপতি ঘোষণা দেন রুহুল আমিন। আর এসবের নেপথ্যে ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতা।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ফয়জুল কবির বলেন, ‘আমি পদ থেকে পদত্যাগও করিনি, আবার আমাকে বাদও দেওয়া হয়নি। আমি অসুস্থতার কারণে দলীয় কার্যক্রমে অংশ নিতে পারছি না। তাহলে অন্য কেউ কীভাবে এ পদে এলেন, তা বোধগম্য নয়।’

স্থানীয় ও আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা যায়, সভাপতি হওয়ার পর  থেকে রুহুল বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। একসময় হাজী রহিম উল্লাহর লোকজন ছোট ফেনী নদীর মুহুরী প্রকল্প অংশের বালুমহাল ও ছোট ফেনী নদীর সাহেবের ঘাট এলাকায় বড় বালুমহাল নিয়ন্ত্রণে রাখত। উপজেলা সভাপতি হওয়ার পর রুহুল আমিন ও তার লোকজন এর দখল নেয়। এখনো এ দুটি বালুমহালে কয়েক কোটি টাকার বালু রয়েছে।

সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র মাদ্রাসার একাধিক সূত্র জানায়, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সোনাগাজী পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর শেখ মামুন ওই মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন। কিন্তু ছয় মাস আগে নানা কৌশলে শেখ মামুনকে বাদ দিয়ে রুহুল আমিন সদস্য মনোনীত হন। এর কিছুদিনের মধ্যেই তিনি সহসভাপতি বনে যান। নানা অপকর্ম ঢাকতে এবং নিজের প্রভাব বলয় বাড়াতে বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ-উদ-দৌলা নিজে রুহুলকে সদস্য হওয়ার সুযোগ করে দেন।

অভিযোগ রয়েছে, মাদ্রাসার মার্কেটের ১২টি দোকান, ভেতরের বিশাল পুকুরের মাছ চাষ ও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নানা উপায়ে আদায় করা বাড়তি টাকারও ভাগ পেতেন সহসভাপতি রুহুল আমিন ও আরেক সদস্য ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকসুদ আলম। এই ক্যাম্পাসের বাইরেও মাদ্রাসার রয়েছে জমিসহ কোটি টাকার সম্পদ।

মাদ্রাসার এক শিক্ষক বলেন, ‘সিরাজ আমাদের প্রায়ই বলতেন, “শোনো, রুহুল, মাকসুদ এরা সবাই অশিক্ষিত। এরা থাকলে দুই রকম সুবিধা। একদিকে এরা কোনো বিষয়ে উচ্চবাচ্য করবে না। আবার সব সময় আমাদের পক্ষেও থাকবে”।’

আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের নেতা হলেও রুহুল আমিনের সখ্য বেশি বিএনপি-যুবদলের ক্যাডারদের সঙ্গে। রুহুল আমিনের চাচাতো ভাই চরচান্দিয়া ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মিয়াধন। রুহুলের সখ্য থাকা অন্যদের মধ্যে আছে ইয়াবাসহ পুলিশের হাতে আটক দুলাল ওরফে বাটা দুলাল, ইয়াবা বিক্রেতা হেলাল, সিরাজ ওরফে সিরাজ ডাকাত, আবুল কাশেম ওরফে কাশেম মাঝি, সাবমিয়া, ফকির বাড়ির গোলাপ, আব্দুল হালিম সোহেলসহ বেশ কয়েকজন।

স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সদস্য আবুল কালাম বাহারকে গলা কেটে হত্যার চেষ্টা করে রুহুল আমিনের ক্যাডাররা। সোনাগাজী সদর ইউনিয়ন যুবলীগ নেতা স্বপন, চরদরবেশ ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হোসেন আহমেদ, মতিগঞ্জ ইউনিয়ন যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান লিটনসহ অনেকেই বিভিন্ন সময় হামলা-মারধরের শিকার হয়। রুহুলের অনুগত না হওয়ায় বাদ দেওয়া হয় পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আবসার ও উপজেলা আওয়ামী লীগের উপ-তথ্য সম্পাদক আব্দুর রহিম খোকনকে।

এসব বিষয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতারা কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

নুসরাত হত্যা মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কারাবন্দি সিরাজ-উদ-দৌলার স্ত্রী সম্প্রতি ব্যাংক থেকে মোটা অঙ্কের টাকা তুলে তা আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিনকে দিয়েছেন। রুহুল আমিন নিজেই এসব টাকা থানা পুলিশসহ হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া বিভিন্ন জনকে সরবরাহ করেন।

গত রবিবার গভীর রাতে নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যা মামলার আসামি নুর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীমের ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে ১৩ থেকে ১৪ জনের নাম আসে। তবে এ হত্যাকাণ্ডে ২৫ থেকে ২৬ জন জড়িত বলে ধারণা করা হয়। জবানবন্দিতে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সহসভাপতি রুহুল আমিনের সম্পৃক্তির বিষয়টিও আসে।

 

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত