রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি

অনশন তৃতীয় দিনে ‘খোঁজ নেয়নি কেউ’

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০১৯, ০২:২৫ এএম

রানা প্লাজার সামনে আহত শ্রমিকদের অনশন কর্মসূচির তৃতীয় দিনে অনশনরত দুজন অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। রানা প্লাজা ধসে ক্ষতিগ্রস্ত সবার ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন, স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ ও দোষীদের শাস্তি নিশ্চিতসহ ১১ দফা দাবিতে গত সোমবার দুপুর থেকে এ কর্মসূচি পালন শুরু করে রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় আহত শ্রমিকরা। অসুস্থ হয়ে পড়া আহত দুই শ্রমিক তাদের শরীরে স্যালাইন লাগিয়ে কর্মসূচি চালিয়ে গেলেও তাদের অনশন ভাঙানো কিংবা দাবি পূরণের আশ্বাস দেওয়ার জন্য প্রশাসনের কেউ সেখানে যাননি। এ পরিস্থিতিতে কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে অনশনরত আহত শ্রমিকরা। 

অনশনরত ‘রানা প্লাজা সারভাইভারস অ্যাসোসিয়েশন অব সাভার’-এর সভাপতি মাহমুদুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আজ রানা প্লাজা ধসের ছয় বছর পূর্ণ হলো। গত তিন দিন ধরে ১১ দফা দাবি আদায়ে আমরা কয়েকজন অসহায় শ্রমিক অনশন করছি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এখন পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে কেউ আমাদের কোনো খোঁজ নেয়নি। অসুস্থ হয়ে পড়ায় আমাকে স্যালাইন লাগানো হয়েছে। এভাবে চললে হয়তো মারাও যেতে পারি। কিন্তু তার পরও দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা অনশন চালিয়ে যাব।’

একই সংগঠনের সহসভাপতি বাকি বিল্লাহ বলেন, ‘রানা প্লাজা ধসের পর আমরা শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ি। যে অনুদান পেয়েছিলাম তা চিকিৎসার পেছনেই ব্যয় হয়ে গেছে। বর্তমানে বেকার অবস্থায় দুর্বিষহ জীবনযাপন করায় আমরা বাধ্য হয়ে দাবি আদায়ে অনশন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কিন্তু প্রশাসনের কেউ আমাদের যৌক্তিক দাবির বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।’

নিহত-নিখোঁজদের প্রতি ফুলেল শ্রদ্ধা

রানা প্লাজা ধসের ছয় বছর পূর্তি উপলক্ষে গতকাল বুধবার রানা প্লাজার সামনের অস্থায়ী শহীদ বেদিতে ধসের ঘটনায় নিহত ও নিখোঁজদের প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন। এদিন নিহত ও নিখোঁজ পরিবারের সদস্যরাও আসেন শ্রদ্ধা জানাতে। ফুল দেওয়ার পাশাপাশি শ্রমিকরা অবিলম্বে রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় অভিযুক্তদের বিচার ও নিহত- আহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন ও তাদের সন্তানদের শিক্ষার ব্যবস্থাসহ নানা দাবি জানান।

গতকাল সকাল থেকেই সাভারের বিভিন্ন শিল্প এলাকা থেকে শ্রমিকরা মিছিল নিয়ে এসে রানা প্লাজার সামনের অস্থায়ী বেদিতে ফুল দিয়ে নিহতদের স্মরণ করেন। এ সময় রানা প্লাজার সামনে কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে পুলিশ। অতিরিক্ত পুলিশের পাশাপাশি পুলিশের সাঁজোয়া যানও উপস্থিত ছিল সেখানে।

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের ব্যানারে ভবনধসের ঘটনায় জড়িতদের শাস্তি এবং উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দাবি করে মানববন্ধন ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্টের সমাবেশে বক্তব্য রাখেন সৌমিত্র কুমার দাশ, আহসান হাবিব বুলবুল, আনিসুর রহমান ও কাওসার আহমেদ। অন্যদিকে বাংলাদেশ গার্মেন্ট অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের সমাবেশে বক্তব্য দেন শ্রমিকনেতা রফিকুল ইসলাম সুজন। এ ছাড়া গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির প্রধান সমন্বয়ক জুনায়েদ সাকি শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের বলেন, ‘এখনো ভবনধসের ঘটনায় জড়িতদের বিচার হয়নি। তাই রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানার বিচারের পাশাপাশি এ ভবনটি তদারকির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদেরও বিচারের আওতায় আনতে হবে।’

শ্রদ্ধা জানিয়েছে বাবা-মা হারানো রিহান

গতকাল সকালে খালু আসাদুল হকের সঙ্গে রানা প্লাজার অস্থায়ী বেদিতে এসে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছে মা-বাবা হারানো রিহান। ছয় মাস বয়সী একমাত্র সন্তানকে রেখে কর্মস্থলে গিয়ে ২০১৩ সালের এই দিনে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিল্প দুর্ঘটনা রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় চাপা পড়ে মারা যায় রিহানের মা-বাবা।

রিহানের মা রানা প্লাজার ৪র্থ তলার একটি পোশাক কারখানায় অপারেটর এবং বাবা আয়রনম্যান হিসেবে কাজ করতেন। ভবন ধসের প্রথম দিনই রিহানের মা রেহানা বেগমের লাশ পাওয়া গেলেও বাবা মনসুর শেখের লাশ আট দিন পর সাভার অধরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে পাওয়া যায়।

রিহানের খালু আসাদুল হক বলেন, ‘মা-বাবার মৃত্যুর সময় রিহান নানির বাড়িতে ছিল। ওর বাবার মৃত্যুর পর দাদা-দাদি নাতির দায়িত্ব না নেওয়ায় এখনো সে নানির কাছেই থাকে। সরকারি তহবিল থেকে যে সহযোগিতা পাওয়া গেছে তা দিয়ে একটি জমি কেনা হয়েছে। এখন ওর লেখাপড়া এবং সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য দেশের বিত্তবান লোকজনের সহযোগিতা প্রয়োজন।’

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভার বাসস্ট্যান্ডের পাশে রানা প্লাজা নামের বহুতল ভবনটি ধসে পড়লে ১ হাজার ১৭৫ শ্রমিক নিহত হন। আহত হন ২ হাজারের বেশি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত