২৩ বছর ধরে হন্যে হয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার যে ধারাবাহিক খুনি, ধর্ষককে গ্রেপ্তারের জন্য খুঁজছিল পুলিশ; তাকে ডিএনএ পরীক্ষার ধাপগুলোর মাধ্যমে আইনের হাতে তুলে দিয়েছেন বারবারা রে-ভেন্টার। স্বেচ্ছাসেবায় কাজ করা এই নারীকে নিয়ে লিখেছেন ওমর শাহেদ ও নওরীন সুলতানা
কীভাবে আপনি নিশ্চিত হলেন?’ এফবিআই (ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা) এজেন্ট বারবারা রে-ভেন্টারকে জিজ্ঞেস করলেন। ‘এই পরিবারের বংশধরদের তালিকা যখন আমাদের কাছে চলে এলো, তখনই নিশ্চিত হয়েছি’, অবসর পাওয়া বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের (গান, নাটক ইত্যাদি) কৌশলী ও উদ্ভিদের বংশগতি বিজ্ঞানী তাকে বললেন। এক সপ্তাহ পর, ২০১৮ সালের আগস্টে, জোসেফ ডিঅ্যাঙ্গেলো গ্রেপ্তার হলেন। আদালত তাকে ১৩টি খুুন ও ১৩টি অপরাধে অভিযুক্ত করে। পুলিশের তদন্তকারীরা বলেন, ৭২ বছরের মাঝারি উচ্চতার এই মানুষটি, একজন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা, তিনিই ‘দি গোল্ডেন স্টেট সিরিয়াল কিলার’। অনেক মানব হত্যা অপরাধে দুষ্ট এই কুখ্যাত খুনি ও ধর্ষক খুশিতে হাসতে হাসতে ১৯৭০ ও ৮০’র দশক পুরো ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যকে ডুবিয়ে দিয়েছিল। বারবারাকে এই মামলায় নিয়ে এসেছিলেন অঙ্গরাজ্যের কোন্ট্রা কোস্তা কাউন্টি বা জেলার অবসর নেওয়া সরকারি আইন পরিদর্শক পল হোলস। পলকেই এই ঘৃণ্য অপরাধীকে বংশগতির ধারা ব্যবহার করে গ্রেপ্তারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সাবেক এই সরকারি কর্মকর্তা উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দা, তিনি বারবারা ও তদন্তকারীদের জটিল ডিএনএ জ্ঞান অনুসরণের মাধ্যমে মানুষখেকোটিকে গ্রেপ্তারে প্রস্তাব করেন। বারবারাকে এ মামলায় পেয়ে তিনি খুব খুশি, বলেছেনও টেলিফোন সাক্ষাৎকারে, ‘তার অভিজ্ঞতা অমূল্য প্রমাণিত হয়েছে। যে সময় তিনি কাজটি করেছেন; তিনি তার সময়কে দেদার দান করেছেন। তার সঙ্গে মানুষ হিসেবে আলাপ করা আসলেই অসাধারণ অভিজ্ঞতা।’
ডিঅ্যাঙ্গেলো এখন ক্যালিফোর্নিয়ার সাইক্রামেন্টো জেলার জেলে বন্দি। এখনো তার জবানবন্দি বাকি। কর্তৃপক্ষ বিশ্বাস করে, তিনি কন্ট্রা কোস্তা জেলায় নয়টি ধর্ষণের জন্য আইনগতভাবেই দায়ী। গেল সপ্তাহে তাকে আরও চারটি মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। ডাকাতির সময় অপহরণেও তিনি অভিযুক্ত। আক্রমণগুলো তিনি কনকর্ড, সান রেমন ও ডালভিল শহরে ঘটিয়েছেন।
কে এই বারবারা রে-ভেন্টার? তিনি এখন ডিএনএঅ্যাডোপশন.কম নামের স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানে ‘অনুসন্ধানী দেবদূত’ হিসেবে স্বেচ্ছাসেবা দিয়ে থাকেন। এটি একটি অলাভজনক সংস্থা, যারা দত্তক নেওয়াদের কীভাবে ডিএনএ ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের জন্মদাতা পিতামাতাকে খুঁজে বের করতে হয়, শেখায়। ডিঅ্যাঙ্গেলো গ্রেপ্তার হওয়ার কয়েক মাস ধরে তার কৃতিত্ব হাওয়ার বেগে ছড়াচ্ছে; আগে তিনি তার এই দক্ষতাগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হারিয়ে যাওয়া মা-বাবার খোঁজ ও তার পরিবারের সদস্যদের বংশতালিকা খুঁজে বের করায় ব্যবহার করতেন। এই প্রথম কোনো ধারাবাহিক খুনির বিপক্ষে এই যোগ্যতা প্রয়োগ করলেন। যার শুরু ২০১৫ সালের মার্চে, একটি ই-মেইলে। বারবারা ডিএনএঅ্যাডোপশনে তাদের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সান বার্নাডিনো জেলার এক গোয়েন্দার ই-মেইল খুললেন। আগে অপহরণ করা হয়েছিল, এমন এক শিশুর পিতামাতাকে খুঁজে বের করতে তাতে অনুরোধ করা হয়েছিল। এক দশকের পুরনো একটি আলাদা, ধারাবাহিক খুনিকে যে এই সংশ্লিষ্টতার মাধ্যমে ধরে ফেলা সম্ভব হবে, বারবারা ধারণাই করতে পারেননি।
সেটির শুরু ২০০৩ সালে। তখন ল্যারি ভেনার নামের এক লোককে তার একত্রে বসবাসের বন্ধুকে হত্যার বিষয়ে আইনজীবীরা আদালতে কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেননি। মানুষটি ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের সবচেয়ে পুরনো রিচমন্ড শহরে ইউসুন জান নামের মেয়েটিকে হত্যাই করেনি, তার শরীরটিকে কেটে টুকরো টুকরো করেছে, বেড়ালের ঘরের মাটির নিচে পুঁতেছে। এরপর কন্ট্রা কোস্তা জেলার এক প্রধান আইনরক্ষক কর্মকর্তা (তারা এই পদাধিকারীদের শেরিফ বলেন) বারবারার সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। বারবারা নিজেকে ‘ম্যানি অ্যালিস’ ছদ্মনাম দিয়ে একটি শিশু যৌন হয়রানি মামলায় কাজ করেছিলেন। তাতে তিনি স্কটস ভ্যালি ট্রেইলার পার্কে হারিয়ে যাওয়া একটি মেয়েকে দত্তকও নিয়েছিলেন। অনেক দিন পর, ২০১৫ সালে সান বার্নাডিনোর সেই গোয়েন্দা এখন এক পূর্ণবয়ষ্ক, বিবাহিত ও তিন সন্তানের জননীর সঙ্গে কাজ করতে শুরু করলেন। নারীটিকে তিনি খুঁজে দেবেন, তিনি আসলে কে? এরপর তার ই-মেইল যখন তাকে বারবারার সঙ্গে সংযোগ ঘটিয়ে দিল; অনেক অন্ধকার ঘটনার আলোর দিশারী অনুভব করলেন, হয়তো স্বাভাবিকভাবেই অনেক রহস্যের জট খুলতে চলেছে।
পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধান ও সেই নারীর ডিএনএ’র বংশগতির তথ্যগুলো পাবলিক জিনিওলজি (উদ্ভিদ ও প্রাণীর ক্রমবিকাশের ধারাবিষয়ক বিজ্ঞান) ওয়েবসাইটগুলোতে তুলে দিলেন বারবারা। এরপর অনেক দেশের মানুষের সাহায্যে জানলেন, নারীটি ছিলেন ডাউন বোওডেন, তিনি এতিম, ১৯৮১ সালে ইংল্যান্ডের নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে হারিয়ে গেছেন। ওয়েসবাইটগুলোর দিকে তো চোখ সবারই। ফলে তার অপহরণকারীরা এমনকি এই ধরনের মামলাগুলোর তদন্তকারীরাও নিশ্চিত হলেন, এই তথ্য একমাত্র বারবারার পক্ষেই বের করা সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রে এটি তার দক্ষতার একটি প্রকাশমাত্র। এরপরই কর্তৃপক্ষ বারবারাকে এ ধরনের অমীমাংসিত রহস্যের সূত্রগুলোর সঙ্গে সংযোগ ঘটিয়ে দিল। তিনি প্রথম হাতে নিলেন বিয়ার ব্রুক হত্যাকারীদের অনুসন্ধান। এ মামলায় একজন মহিলা ও তিনজন নারীকে ধাতব বস্তু দিয়ে আঘাত করে নিউ হ্যাম্পশায়ারের বিয়ার ব্রুক স্টেট পার্কে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল। স্বেচ্ছাসেবা দেওয়া এই মনোমুগ্ধকর জিন বা বংশগতি গোয়েন্দার ক্যারিয়ারেও বারবারা ভ্যানার সম্পর্কে আরও জানতে থাকে। এই মানুষটি ২০১০ সালে ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সুসানভিল জেলার মরুভূমির মধ্যে একটি জেলে ২০১০ সালে মারা যান। জেলখানার ময়নাতদন্ত কর্মকর্তাদের কাছ থেকে বারবারা তার ডিএনএ সংগ্রহ করলেন, যাতে তার আসল পরিচয় বের করতে পারেন। পরে আবিষ্কার হলো, তিনি টেরি পেডার রাসমুসেন। কর্তৃপক্ষের বিশ্বাস, এই রাসমুসেনই পুরো জেলায় সংঘটিত কয়েকটি হত্যাকান্ডের হোতা। এই জটিল মামলায় বারবারার অভিনব এই অংশগ্রহণই হোলেসের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল। ফলে ২০১৭ সালে ‘দি গোল্ডেন গেট সিরিয়াল কিলার’ নামের ২৩ বছর ধরে পুরনো মামলাটির তদন্তকাজ চালিয়ে যাওয়া হোলেস তাকে ই-মেইলে বলেছিলেন, তার সাহায্য প্রয়োজন। মৃদুভাষী বারবারার মনে পড়ে “পল বলেছিলেন, ‘যদি এটি সমাধানে সাহায্য করতে পারি, তাহলে তা আমার টুপিতে সাফল্যের পালক পরিয়ে দেবে’।”
অক্টোবরের মধ্যে তিনি এই দাবার বোর্ডে চলে এলেন। হোলেস ও লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে আসা এফবিআইয়ের একটি দলকে তিনি গেডম্যাট নামের পাবলিক জিনিওলজি ওয়েবসাইটে টাকার বিনিময়ে তথ্য সংগ্রহ ও মূল্যহীন তথ্যের পরে আবার সেখানে অনুসন্ধানে সাহায্য করতেন। এই ধারাবাহিক খুনি সম্পর্কে আগে বেশি জানতেন না, কিন্তু বারবারা পত্রিকাগুলো থেকে খবরগুলো সংগ্রহ করে এই ব্যক্তির একটি পূর্ণ পরিচয় বের করার চেষ্টা করছিলেন। তার বিশ্বাস ছিল, তাদের অনুসন্ধানে লোকটি প্রায় কাছে চলে এসেছে। মনে পড়ে, ‘আমি গবেষণা শুরু করলাম। তাতে পুরোপুরি ভয়ংকর তথ্য আসতে লাগল।’ অনুসন্ধানী দলে সবার আগে থাকা খুব সতর্ক ও নিয়মতান্ত্রিক বারবারা দেখলেন, মামলাটি নিয়ে তার তদন্তকারীরা হাবুডুবু খাচ্ছেন। তার কাজে খুব খুুশি হোলেস। বললেনও “তিনি এলেন এবং তারপর থেকে বলতে ভালোবাসতেন ‘না, এভাবে নয়; আপনাদের এই পথে কাজটি করা প্রয়োজন।’ তিনি আমাদের ও মামলাটির কাঠামো দাঁড় করালেন।” বারবারা ক্যালিফোর্নিয়ার দক্ষিণের জেলা ভেঞ্চুরার অপরাধ গবেষণাগার থেকে দি গোল্ডেন স্টেট সিরিয়াল কিলারের অস্পৃশ্য ডিএনএ নমুনা নিলেন। এফবিআই সেটি দিয়ে তার একটি পরিচয় তৈরি করল ও গেডম্যাচে তুলে দিল। এভাবে দলটিকে সন্দেহভাজন অপরাধীর তিন পুরুষ আগের পরিচয় বের করে উন্নতির দিকে ঠেলে দিলেন বারবারা। বললেন, ‘আমার প্রথম কাজ ছিল অনেকগুলো একই ধরনের গাছের সারি তৈরি করা।’
বারবারা তার ক্যালিফোর্নিয়ার উত্তরের বাড়িতে বসে ল্যপটপ ও আপপ্যাডে একসঙ্গে কাজ করতেন। কাজগুলো ছিল সাঙ্কেতিক। তিনি কয়েক ডজন পারিবারিক বংশতালিকা তৈরি করলেন। বাকি নামগুলো সেটির নিচে দিয়ে দিলেন। খুনির বৈশিষ্ট্য তার ডিএনএ থেকে সংগ্রহ করে, অন্যান্য তথ্য জোগাড় করে; অপরাধীরা কোথায় কোথায় অপরাধ করতে যেতে পারে, তাদের পেছনে ছুটতে লাগল এই অনুসন্ধানী দল। সেই তালিকায় অবশ্যই ডিঅ্যাঙ্গেলো ছিলেন। “কাজের একপর্যায়ে বারবারা বললেন, ‘এই মানুষটি ইতালিয়ানদের মতো হতে পারেন’ এই তথ্য আমাদের অবাক করে দিয়েছিল”, মনে পড়ে হোলেসের। তিনি আরও বললেন, ‘প্রত্যক্ষদর্শীদের অ্যাকাউন্টগুলোর কোনো একটি তাকে ইতালিয়ান বলে চিহ্নিত করল, কিন্তু যখন নামটি জোসেফ ডিঅ্যাঙ্গেলো বলে বেরিয়ে এলো; আমাদের মনে হলো, বারবারার কাছে কিছু আছে।’ নয়টি নাম বাকি আছে, এমন সময় পুরো দল একটি বড় ব্রেক পেল; তখন একজন নারী যাকে তারা অপরাধীর একজন কাছের আত্মীয় হতে পারেন বলে অনুমান করছিলেন, তিনি নিজে থেকেই ডিএনএ পরীক্ষার জন্য এগিয়ে এলেন। তিনি ফিরে গেলেন খুনির মায়ের পরিবারের দিক থেকে দ্বিতীয় কাছের আত্মীয় হিসেবে। এপ্রিলের শুরুতে সেই তালিকা নেমে এলো ছয়জনে; তাদের একজন ডিঅ্যাঙ্গেলো। দি গোল্ডেন স্টেট সিরিয়াল কিলারের ডিএনএ শক্তিশালীভাবে নির্দেশ করে এই মানুষটির চোখ নীল। ফলে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বাকি সেই ছয়জনের নামের দিকে ডিএমভির (ডিপার্টমেন্ট অব মোটর ভেহিকেলস ডাটাবেজ ক্যালিফোর্নিয়ার এই তথ্যভান্ডারে গাড়ির চালকদের চোখের রং সংগ্রহ করা আছে) মাধ্যমে ছুটলেন। নিশ্চিতভাবে জানলেন, এ তালিকায় একজনেরই নীল চোখ ‘জোসেফ ডিঅ্যাঙ্গেলো’। তারা তাদের সন্দেহভাজনকে পেয়ে গেলেন।
বারবারা বললেন, ‘হরমোনের ওপর দাঁড়িয়ে আপনি খুঁজে চলেছেন। হঠাৎ একটি নাম বেরিয়ে এলো।’ সেই সূত্রের ওপর দাঁড়িয়ে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ছাড়িয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা মামলায় জড়িয়ে গেল। তারা সত্যিকার ডিঅ্যাঙ্গেলোর ডিএনএ’র নমুনা সংগ্রহ করল। পরে তাকে গ্রেপ্তার করা হলো। বারবারা রে-ভেন্টা তার নিজের জীবনে ফিরে গেলেন। তবে কখনো হোলেস বা অন্য কোনো আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তার সঙ্গে বারবারা দেখা করেননি।
