গণতন্ত্রের অভাবে দুর্নীতি ও জঙ্গিবাদ বাড়ে

আপডেট : ০৪ মে ২০১৯, ১০:০১ পিএম

নানা জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে অতি নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে জাতীয় সংসদে যোগ দিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা। ফলে অনেকের মনেই এই ধারণা আরও বদ্ধমূল হয়েছে যে, রাজনীতিতে খোলা চোখে আমরা যা দেখতে পাই, আসল ঘটনা হয়তো তার অন্তরালেই বেশি ঘটে। তাই জনমনে এই ধারণা এখন স্পষ্ট যে, হয়তো দ্বিপক্ষীয় আলোচনার টেবিলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির নেতাদের একটা গোপন সমঝোতা হয়েছে। হয়তো বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে কোনো আপসরফা হয়েছে দল দুটির মধ্যে। খালেদার মুক্তি হয়তো জামিনে হতে পারে, হয়তো প্যারোলেও হতে পারে। কিন্তু বিএনপি হয়তো প্যারোলে নয়, জামিনেই মুক্তি চায় খালেদার। কেননা, আমরা জানি যে, বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে প্যারোলে মুক্তি একটা অপমানজনক বিষয় হিসেবেই দেখা হয়। এ প্রসঙ্গে একবার বঙ্গবন্ধুর জেল থেকে বেরোনো নিয়ে সাংবাদিক এবিএম মূসার বলা একটা গল্পের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। মূসা ভাইয়ের একটা বই আছে, ‘মজিব ভাই’ নামে। সেখানে তিনি শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব সম্পর্কে লিখেছেনÑ বেগম মুজিব বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন যে, তিনি ৩২ নম্বরের বাসায় বঁটি নিয়ে বসে আছেন, মুজিব ভাই যাতে কোনো অবস্থাতেই প্যারোলে মুক্তি নিয়ে বাড়ি না আসেন, জনগণেই তাকে মুক্ত করে নিয়ে আসবে। এ থেকে বোঝা যায় প্যারোলে মুক্তিকে কতটা অপমানজনকভাবে দেখা হতো। এ ছাড়া বলা বাহুল্য যে, প্যারোলে মুক্তির ক্ষেত্রে নানা ধরনের শর্ত থাকে। ফলে সংগত কারণেই খালেদা জিয়াও হয়তো প্যারোলে মুক্তি চান না।

কিন্তু লক্ষ্য করবার মতো বিষয় হচ্ছে, বিএনপি গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশে যে রাজনীতি করছে, তার মূল ইস্যুই হচ্ছে খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়াকে বিভিন্ন মামলা-মোকদ্দমা থেকে মুক্ত করা, তাদেরকে কারাগার থেকে মুক্ত করা। দলের শীর্ষ

নেতৃত্বকে নির্দোষ প্রমাণ করা, তাদেরকে মুক্ত করার জন্য তথাকথিত দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার ধুয়ো তুলেই আবর্তিত হয়েছে বিএনপির রাজনীতি। এর মধ্য দিয়ে জনগণের ভাগ্যোন্নয়নের রাজনীতি বা জনমুখী রাজনীতি থেকে ক্রমাগত দূরে সরতে সরতে দলটি আরও বেশি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। জনগণের স্বার্থরক্ষার কোনো ইস্যুতে তারা জনগণের পাশে দাঁড়াতে পারেনি। মানুষও দিনের পর দিন কেবল নেতা-নেত্রীর মুক্তির দাবি দেখে দেখে এটা ভাবতে বাধ্য হয়েছে যে, আমাদের জন্য তো দলটি কিছুই বলছে না, করছে না। ফলে বলা যায় বিএনপি নিজেদের দলীয় ইস্যুর সঙ্গে জনগণের ইস্যুকে মিলিয়ে রাজনীতি করতে ব্যর্থ হয়েছে।

সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনের সময়েও বিএনপির এই রাজনৈতিক দোদুল্যমানতা এবং নেতৃত্বহীনতা প্রকটভাবে সামনে এসেছে। ‘ঐক্যফ্রন্ট’ নিয়েও তারা কিছুই করতে পারেনি। একবার বলেছে জোট শুরু হয়ে গেছে, একবার বলেছে জোটই শেষ কথা নয়, বিএনপির নিজস্ব অবস্থান আছে। কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জোট করা-না-করা নিয়েও দলটির নানা স্তরের নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা ছিল। ভোটের আগে আগে তারা বলেছে, সেনাবাহিনী মাঠে নামলে ভোট ভালো হবে। আবার বলেছে, তারা ভোটের মাধ্যমে ‘নীরব বিপ্লব’ করবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই দেখা যায়নি। আসলে এই সবকিছুর মধ্য দিয়েই বিএনপির জনবিচ্ছিন্নতা, জনগণের ওপর দলটির আস্থাহীনতাই ফুটে উঠেছে। আর এখন সবশেষ ঘটনায়, বিএনপির পাঁচ সংসদ সদস্যের শপথ নেওয়ার ঘটনায় দলটির এই ‘মুখে এক কথা বলে কাজে আরেকটা করার’ ধারাবাহিকতারই প্রমাণ পাওয়া গেল। গণফোরামের সংসদ সদস্যরা শপথ নেওয়ার পর বিএনপি তাদের ‘বেইমান’ বলেছে, ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলেছে, আবার এখন তাদের দলের সদস্যরাই শপথ নিয়ে সংসদে গেলেন। শুধু তা-ই নয়, বিএনপির একজন প্রথমে শপথ নেওয়ার পর তারা তাকে দল থেকে বহিষ্কার করল, প্রেস কনফারেন্স করে বারবার বলল, কোনো অবস্থাতেই তারা এই প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদে যাবে না। কিন্তু তারপর দেখা গেল দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ছাড়া বাকি সব সদস্যই শপথ নিলেন, সংসদে গেলেন। এর মধ্য দিয়ে আবারও রাজনৈতিক বক্তব্য-বিবৃতি দেওয়া কিংবা অবস্থান নেওয়ার বিষয়ে দলটির বিচক্ষণতা ও প্রজ্ঞার অভাব প্রকটভাবে সামনে এলো।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়েছে, মির্জা ফখরুলও হয়তো শপথ নেওয়ার জন্য ভেতরে ভেতরে প্রস্তুত ছিলেন। হয়তো দলের মহাসচিবের পদটি রক্ষার জন্যই তিনি শপথ নেননি। এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষ করা দরকার যে, বলা হচ্ছেÑ লন্ডন থেকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক জিয়ার নির্দেশ মোতাবেকই দলের সংসদ সদস্যরা এই শপথ নিয়েছেন। নির্বাচনের আগেও দলের মনোনয়ন নিয়েও এই কথা শোনা গেছে যে, তারেক জিয়াই সবকিছু ঠিক করে দিয়েছেন। কিন্তু তারেক জিয়া তো প্রায় এক যুগ ধরে দেশেই নেই। কিন্তু তিনি তো রাজনীতির মাঠেই নেই। একদিন এক টকশোতে আমার সঙ্গে থাকা বিএনপির এক নেতা বলছিলেন যে, দলের স্ট্যান্ডিং কমিটির সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, তারেক জিয়া যা বলবেন সেটাই সবাই মেনে নেবেন। কিন্তু এটা তো একটা রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া হতে পারে না। একটা দলের ভেতরেই যদি কোনো গণতন্ত্র না থাকে, তাহলে সে গণতান্ত্রিক রাজনীতিটা করবে কীভাবে। এই অবস্থায় এখনো যদি লন্ডন থেকেই দলের সবকিছু পরিচালিত হয় তো সেই দল দেশের রাজনীতিতে আর কী করবে? ফলে দল হিসেবেই বিএনপি একটা রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের জায়গায় চলে গেল কি না, এখন সংগত কারণেই সেই প্রশ্ন উঠছে।

অন্যদিকে, সবকিছু দেখে মনে হচ্ছে যে, আওয়ামী লীগও খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে চায়। কেননা, দুর্নীতি বা আর যা-ই কিছু বলা হোক না কেন, শেষবিচারে এটা একটা রাজনৈতিক মামলাই। তিনবারের একজন প্রধানমন্ত্রী আমৃত্যু কারাগারে রাখার ঘটনা রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগের জন্যও কোনো সুফল বয়ে আনবে না। যে কারণে আওয়ামী লীগও চায় তলে তলে কোনো সমঝোতা করে যেভাবেই হোক তাকে কারাগার থেকে বের করে আনতে। বিএনপির সংসদ সদস্যদের শপথ নেওয়ার নাটকের জবাব হয়তো এখানেই লুকিয়ে আছে।

কিন্তু যেটা খেয়াল রাখা দরকার যে, বিএনপির এই বর্তমান রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের দায় কিন্তু অনেকাংশে আওয়ামী লীগের। রাজনীতির মাঠে দলটিকে কোথাও দাঁড়াতে না দিয়ে, কথা বলতে না দিয়ে, নেতাকর্মীদের নামে হাজার হাজার গায়েবি মামলা দিয়ে, মিছিল-মিটিং করতে না দিয়ে, নির্বাচন পরিচালনা করতে না দিয়ে ধীরে ধীরে বিএনপিকে আজকে তারা এই জায়গায় কোণঠাসা করে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। এভাবে একটা বিরোধী দলকে ধীরে ধীরে একটা শূন্য জায়াগায় নিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই আওয়ামী লীগের জন্যও ভালো হয়নি, সংসদীয় রাজনীতির জন্য ভালো হয়নি এবং শেষ বিচারে দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্যও ভালো হয়নি। এখনকার ব্যবস্থাকে তো একটা ‘ট্রানজিশনাল ডেমোক্রেসি’ বা ‘ক্রান্তিকালীন গণতন্ত্র’ বলা হচ্ছে, কিন্তু আমরা তো আসলে একটা ‘সাবস্টেইনসিভ ডেমোক্রেসি’ বা ‘প্রকৃত গণতন্ত্রে’ যেতে চাই। কিন্তু দেশে কোনো শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকলে, সংসদে একটা নামকাওয়াস্তে দুর্বল বিরোধী দল থাকলে ‘প্রকৃত গণতন্ত্রে’ উত্তরণের এই প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। এ কারণে সরকারকে চোখে চোখে রাখা এবং দেশের নির্বাচন কমিশনসহ এই ধরনের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালীভাবে গড়ে তোলার কাজটিও বাধাগ্রস্ত হবে। এভাবে রাষ্ট্রকাঠামোটাই গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতাহীন হয়ে উঠবে।

রাষ্ট্র ব্যবস্থাটাই যখন গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতাহীন হয়ে ওঠে, তখনই সেখানে দুর্নীতি ও জঙ্গিবাদের মতো সমস্যাগুলো আরও প্রকট হয়ে উঠতে শুরু করে। আজকে যখন নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে কিংবা শ্রীলঙ্কায় একের পর জঙ্গি হামলা নিয়ে আমরা কথা বলছি, বাংলাদেশে জঙ্গি হামলা নিয়ে কথা বলছি, তখন এই রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা নিয়ে আমাদের আরও সচেতন হওয়ার প্রয়োজন আছে। কেননা, যে দেশগুলোতে রাজনৈতিক দলগুলো শক্তিশালী থাকে এবং সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে জঙ্গিবাদের মতো ইস্যুগুলো নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য থাকে, সেখানে রাজনৈতিকভাবে এবং সামাজিকভাবে জঙ্গিবাদের সমস্যা মোকাবিলা করাটা সহজ। যে দেশে রাজনৈতিক দলগুলো এমন সব জাতীয় ইস্যুতে দ্বিধাবিভক্ত, সেখানে জঙ্গিবাদের মাথাচাড়া দিয়ে ওঠাটা সহজ। এখন বিরোধী দলকে রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া করে দিয়ে, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে দিয়ে, জাতীয় সংসদকে অকার্যকর করে দিয়ে, একতরফাভাবে কিন্তু পুলিশ-র‌্যাব-সেনাবাহিনী দিয়ে সরকার জঙ্গিবাদ মোকাবিলা করতে পারবে না। জঙ্গিবাদের মতো ইস্যুতে জনগণের একটা সাধারণ মতৈক্য দরকার, রাজনৈতিক দলগুলোর একটা ঐকমত্য দরকার। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার এসবের তোয়াক্কা করছে না।

এখন কথা হলো নিউজিল্যান্ড বা শ্রীলঙ্কার মতো জঙ্গি হামলার ঝুঁকির মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে কি না। সবকিছু বিচার করলে এমন আশঙ্কা কিন্তু একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। কেননা বিগত দশকগুলোতে এখানে জঙ্গি তৎপরতাসহ ধর্মীয় উগ্রবাদী রাজনীতির যে উত্থান দেখা গিয়েছে তা পুরোপুরি নির্মূল হয়েছে, এমন কথা বলা যাচ্ছে না। দেশের ভেতরে এ ধরনের জঙ্গি তৎপরতার বীজ বা শেকড় যেমন রয়ে গেছে, তেমনি এখন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক জঙ্গিবাদী নেটওয়ার্কগুলোর সঙ্গেও তাদের যোগসূত্রের নানা খোঁজখবর মাঝেমধ্যেই সামনে আসছে। দেশের স্থানীয় জঙ্গি নেতা, মাস্টারমাইন্ডদের অনেকে হয়তো সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন বা পলাতক হয়ে গেছেন। কিন্তু নতুন করে যে অনেকে এমন তৎপরতায় যুক্ত হয়েছেন বা হচ্ছেন তার নমুনা আমরা মাঝে মধ্যেই নানা ঘটনায় দেখতে পাচ্ছি। এখন ইন্টারনেট-ফেইসবুকসহ তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধাগ্রহণ করে নানা ধরনের নেটওয়ার্ক ডেভেলপ করছে। সম্প্রতি বিশ্বের নানা জায়গাসহ বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের এমন জঙ্গিবাদী নেটওয়ার্কগুলোতে যুক্ত হতেও দেখা যাচ্ছে। যে কারণে এখন আমাদের দেশের ছোটখাটো ঘটনাতেও দেখা যাচ্ছে যে, আইএস তাদের মুখপত্র ‘আমাক’-এর মাধ্যমে সেসব ঘটনার ‘দায়’ বা ‘কৃতিত্ব’ যা-ই বলি না কেন তা দাবি করছে।

কাজেই বলা যায়, বাংলাদেশের বর্তমান দুর্বলতাগুলো শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো ভঙ্গুর হয়ে যাওয়া, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি একটা ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়া, কোনো রকম জবাবদিহিতা না থাকা, বিচারহীনতার সংস্কৃতির জেঁকে বসা, মতপ্রকাশের বিধিনিষেধে একটা অবরুদ্ধ সমাজ তৈরি হওয়া, সর্বোপরি সরকারের একটা একক স্বেচ্ছাচারী মনোভঙ্গির প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে তা কোনোভাবেই দেশের জন্য কল্যাণকর নয়। এই ধরনের সমাজেই দুর্নীতির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং জঙ্গিবাদসহ উগ্র সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড বিস্তার লাভ করে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত