জানপ্রাণ দিয়ে বাঁচানোর চেষ্টা করেছি

আপডেট : ০৮ মে ২০১৯, ০৩:০৯ এএম

সুবীর নন্দী আমার খুব একটা আত্মীয় নয়। তার বাড়ি সিলেটের হবিগঞ্জে, আমারও। এই পরিচয়ের সূত্র। ১৯৭৬-৭৭

সালে প্রথম  যখন ঢাকায় আসে, তখন থেকে সে আমাকে বড় ভাইয়ের মতো জানে। তার মেয়ের জন্ম, তাদের পরিবারের অসুখ-বিসুখের সময় সারা জীবন তার পাশে থেকেছি। সে আমাকে পরম আত্মীয়ের মতো ডেকে নিয়েছে। ২০১৩ সালে তার বিরাট হার্ট অ্যাটাক হলো। নয়টি ব্লক ধরা পড়ল। এরপর যুক্তরাষ্ট্রে তার ওপেন হার্ট সার্জারি হলো। তার হৃদ্রোগ বাদেও আরও অনেক রোগ ছিল। ডায়াবেটিসের রোগী ছিল, কিডনি বিকল হয়ে গিয়েছিল। প্রতিদিন দুইবার কিডনি ডায়ালাইসিস করে সুবীর বেঁচে থাকত। এই বছরের শুরুতে পূজায় সে মৌলভীবাজারে গান গাইতে গিয়েছিল। সেখানেই তার প্রচ- বুকে ব্যথা হলো। ফেরার পথে সে ট্রেনে আসছিল। বুদ্ধি করে ক্যান্টনমেন্ট রেলওয়ে স্টেশনে নেমে গেল এবং সিএমএইচে (সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল) নেমে গেল। ১২ দিন টানা আইসিইউতে ভর্তি থাকতে হলো সুবীরকে। তখন বাঁচলেও চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে জানলেন, তার হৃৎপি-ে জটিল অপারেশন করতে হবে। সেই ধরনের অপারেশনের সুযোগ আমাদের দেশে নেই। ফলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে গেলাম। সঙ্গে দু-একজন শিল্পীও ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী আমাকে তার শরীরের অবস্থার খোঁজখবর নিয়েই বললেন, তাকে অতি দ্রুত অপারেশনের জন্য বাইরে কাগজপত্র পাঠাও।

আমার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালের যোগাযোগ ভালো। এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সুবীরকে সিঙ্গাপুর পাঠানো হলো। আসলে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাকে যখনই কোনো সমস্যা নিয়ে গিয়েছি; সুবীর নন্দী বলে নয়, যেকোনো মানুষের পাশে তিনি দাঁড়িয়েছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ধরনটিই এমন। এই নিয়ে আমার বহু স্মৃতি আছে। যমজ শিশু ‘মুক্তা-মণি’কে আলাদা করার জন্য জটিল অপারেশন করতে হবে; তিনি তাদের চিকিৎসার জন্য হাঙ্গেরিতে পাঠালেন। কোনো দিন তিনি আমাকে কোনোভাবেই ফেরাননি। সম্ভব নয় বা পারব নাÑ এই কথাটি কখনো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে শুনিনি। সারা দেশে পেট্রলবোমা হামলার পর তিনি অমাকে শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনিস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার জন্য সব ধরনের সহযোগিতা করেছেন। বিদেশ থেকে উন্নত চিকিৎসা যন্ত্রপাতি আনা সম্ভব হচ্ছে না বলে এই বিশেষায়িত হাসপাতাল এখনো চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। এই মাসের ১৫ তারিখে সেগুলো চলে আসবে। আমরা হাসপাতাল তখন উদ্বোধন করব। তবে শিল্পীদের প্রতি তার আলাদা দুর্বলতা আছে।

সিঙ্গাপুরে আরও উন্নত চিকিৎসার জন্য সুবীর নন্দী গেল। সেখানে তিনবার তার হার্ট অ্যাটাক হলো। তার হৃদ্যন্ত্রে চারটি রিং পরানো হলো। চিকিৎসকদের অত্যন্ত জটিল অপারেশনও হলো। কিন্তু আমার, আমাদের, চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে সুবীর নন্দী গতকাল সিঙ্গাপুরের সময়ে রাত আড়াইটায় (বাংলাদেশ সময় রাত চারটায়) আমাদের ছেড়ে পরকালে চলে গেল।

আজ ভোর ৫টা ২০ মিনিটে বিখ্যাত শিল্পী সুবীর নন্দীর শবদেহ ঢাকায় আনা হবে। এরপর তার ২৫/সি, গ্রিন হোমস, গ্রিন রোড, ঢাকার বাড়িতে আনা হবে। সেখানে তার স্বজনরা তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন। এরপর ঢাকেশ্বরী মন্দিরে আমরা তাকে নিয়ে যাব। সেখান থেকে শহীদ মিনার, এফডিসিতে সর্বস্তরের মানুষ ও তার শিল্পী বন্ধুদের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য তার মরদেহ নেওয়া হবে। তারপর পুরান ঢাকার গোপীবাগের রামকৃষ্ণ মিশনে আমরা তাকে শেষবারের মতো নিয়ে যাব। তারপর ঢাকার সবুজবাগের বরদেশ^রী কালী শ্মশানঘাটে তার মরদেহ দাহ করা হবে।

সুবীরের সঙ্গে কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক না থাকলেও সে আমার ভাইয়ের চেয়েও বেশি। তার বাসায় বহুবার গিয়েছি। সে গান শুনিয়েছে। তার স্ত্রী-মেয়েকে নিয়েও আমাদের বাসায় অনেকবার এসেছে। গানের প্রতি অসম্ভব ভালোবাসার জন্য, বিভিন্ন মানুষের অনুরোধ ফেলতে না পেরে ফাংশনে গাইতে হয়েছে বলে সে কোনো দিন নিজের যতœ নিতে পারেনি। এই কারণেই এত রোগে ভুগে সে অকালে চলে গেল।

একজন ভালো মানুষের জন্য যতটা করা সম্ভব, করার চেষ্টা করেছি। জানপ্রাণ দিয়ে সুবীর নন্দীকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু পারিনি। 

লেখক: সমন্বয়ক, শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনিস্টিটিউট

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত