সারা দেশের কৃষকদের ঘরে উঠতে শুরু করেছে নতুন ধান। গ্রামে গ্রামে যেন বোরো ধান কাটার ধুম পড়েছে। কৃষকরা কেউ ধান কাটছেন, কেউ আঁটি বাঁধছেন, আবার কেউ কেউ ধান মাড়াই করে শুকিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন বাড়ির উঠানে। নতুন বোরো ধানের গন্ধে ভরে উঠছে এলাকার চারদিক। কিন্তু এতসব কিছুর পরও মলিন কৃষকের মুখ। কারণ একদিকে উৎপাদন খরচ বেশি, অন্যদিকে বিক্রির বেলায় দাম পাচ্ছেন তুলনামূলক অনেক কম। আর এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ের ঘূর্ণিঝড় ফণির প্রভাব। ফণির কারণে ফসলের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কায় দেশের অধিকাংশ জায়গার কৃষকরা বেশি মজুরিতে শ্রমিক নিয়োগ করে দ্রুত ধান কেটে ঘরে তোলেন। ফলে বিঘাপ্রতি বোরো উৎপাদন খরচ অনেকটাই বেড়ে গেছে। কিন্তু উৎপাদন খরচ বাড়লেও ধানের দাম উল্টো কমেছে। এছাড়া সরকারি সংস্থা খাদ্য অধিদপ্তর ঘোষণা দিয়েও ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান এখনো শুরু করতে পারেনি। এ পরিস্থিতিতে কৃষকরা নায্যমূল্য না পেলেও মধ্যস্বত্বভোগীরা ঠিকই তাদের আখের গুছিয়ে নিচ্ছেন। কৃষকদের অভাবকে জিম্মি করে এই সুযোগে স্থানীয় ফড়িয়া, মধ্যস্বত্বভোগী ও মিল মালিকরা তাদের ইচ্ছেমতো দামে ধান কেনার চেষ্টা করছেন। বিস্তারিত কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ,
বগুড়া ও সুনামগঞ্জ প্রতিনিধির পাঠানো খবরে :
ধান আবাদ করা না করা নিয়ে দোলাচলে কৃষক
‘কয়েক দিন আগেও প্রতি মণ বিক্রি করতে পারছি ৫৫০-৬৫০ টাকায়। গত দুই দিন ধইরা ধানের দাম কইমা গেছে। ৫০০ টাকার বেশি দামে ধান বেচতে পারতেছি না। ক্ষেত কইরা এহন লসের মধ্যে পড়ছি’Ñ অন্য ফসল না করে ধান আবাদ করায় আক্ষেপ করে এ কথাগুলো বলছিলেন সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার জিরাকতাহিরপুর গ্রামের খরচার হাওরের কৃষক আমান আলী।
এমন আক্ষেপ শুধু আমান আলীর একার নয়, আরও অনেক কৃষকের। ঘূর্ণিঝড় ফণির প্রভাবে সুনামগঞ্জে টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিপাত এবং পাহাড়ি ঢলে বেশ কয়েকটি হাওর পানিতে তলিয়ে গেছে। হাওরগুলো তলিয়ে যাওয়ায় হঠাৎ করে সুনামগঞ্জে ধানের দাম অনেকটা কমে গেছে। ধার-দেনা করে বোরো আবাদ করা কৃষকরা অনেকটা বাধ্য হয়েই পানির দামে বিক্রি করছেন সোনার ফসল। এছাড়া বৃষ্টিপাতে ধান শুকাতে না পারায় বিপাকে পড়েছেন হাজার হাজার কৃষক। অনেক জায়গায় ধানে পচনও ধরেছে।
সদর উপজেলার হালুয়ারগাঁও এলাকার কৃষক আবদুল হালিম দীর্ঘদিন ধরেই বোরো আবাদ করছেন। গ্রামের পাশের দেখার হাওরে চার একর জমিতে চলতি বছর বোরো ধান রোপণ করেছিলেন। শিলাবৃষ্টি আর পাতা রোগের কারণে ফলন তেমন একটা ভালো হয়নি। ক্ষেতের ধান কাটতে পারলেও তা পর্যাপ্ত শুকাতে পারেননি টানা বৃষ্টির কারণে। এখন ধানে পচন ধরেছে, প্রতি মণ ধান ৪৫০ টাকার ওপরে বিক্রি করতে পারেছেন না তিনি।
আবদুল হালিম বলেন, ‘ধান রোপণ, সার ও শ্রমিকের মজুরি দেওয়ার পর ধান বিক্রি করে যে টাকা পাচ্ছি তাতে লোকসান হচ্ছে। প্রতি মণ ধান বিক্রি করছি ৪৮০ টাকায়, আর একজন শ্রমিকের মজুরিই ৫০০-৫৫০ টাকা। আগামীতে আবাদ করব কি না তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
একই হাওরের আরেক কৃষক রফিক মিয়া বলেন, ‘ধার-দেনা কইরা ক্ষেত করলাম, ধান তুলার পর অখন মানুষের টেকা ফেরত দেওয়ার সময়। অখন মানুষের টেকা ফেরত দিতাম পাররাম না, ধানর মণ ৪৮০-৫০০ টাকা। ধান বেইচ্যা টাকা ফেরত দিতাম কিলা?’ তিনি আরও বলেন, ‘শুনছি সরকার ধান কিনব কৃষকের গেছ তাকি, আমরা তো আর গুদামো ধান দিতাম পারতাম না। আমরার ধান গুদামো নিতে চায় না। নানা অজুহাত দেখায় সরকারি অফিসাররা।’
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১১টি উপজেলায় চলতি মৌসুমে সাড়ে ছয় হাজার মেট্রিক টন ধান এবং ৩১ হাজার ৯৭৭ মেট্রিক টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। চালের মধ্যে ১৪ হাজার ১৭০ মেট্রিক টন সিদ্ধ এবং ১৭ হাজার ৭৯৮ মেট্রিক টন আতপ চাল সংগ্রহ করা হবে। ধানের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি কেজি ২৬ টাকা এবং সিদ্ধ চাল ৩৬ ও আতপ চাল ৩৫ টাকা কেজি। ধান সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে সংগ্রহ করলেও চাল সংগ্রহ করা হবে রাইস মিল মালিকদের কাছ থেকে।
এদিকে অভিযোগ উঠেছে, রাইস মিল মালিকদের সিন্ডিকেটের কারণে ধানের চেয়ে চালের লক্ষ্যমাত্রা বেশি ধরা হয়েছে। ধানের চেয়ে চালের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় পাঁচগুণ বেশি। রাইস মিল মালিকদের সুবিধা দিতেই ধানের চেয়ে চালের লক্ষ্যমাত্রা বেশি ধরা হয়েছে।
জেলা কৃষক লীগের সদস্য সচিব বিন্দু তালুকদার বলেন, ‘চলতি বোরো মৌসুমে কপাল পুড়েছে কৃষকদের, আর কপাল খুলেছে মিল মালিকদের। কারণ সাধারণ কৃষকরা গুদামে ধান বিক্রি করতে গিয়ে নানা হয়রানির শিকার হন, এজন্য তারা লোকসান দিয়ে হলেও ফড়িয়াদের কাছে ধান বিক্রি করেন। অন্যদিকে গুদামে চাল বিক্রি করে একটি সিন্ডিকেট প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। খাদ্য বিভাগ কৃষকদের নয়, খাদ্য বিভাগ আসলে মিল মালিকবান্ধব। প্রতি বছরের মতো এবারও ধানের চেয়ে চালের লক্ষ্যমাত্রা বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে ওই সিন্ডিকেটের জন্য।’
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক জাকারিয়া মুস্তফা বলেন, ‘আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই আমরা ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু করব। ধান সংগ্রহ শুরু হলে কৃষকরা সরকার নির্ধারিত ন্যায্যমূল্যে গুদামে ধান বিক্রি করতে পারবেন এবং লাভবান হবেন।’ তবে গুদামে ধান বিক্রিতে কৃষকদের হয়রানির বিষয়টি অস্বীকার করেন এই খাদ্য কর্মকর্তা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বশির আহম্মদ ধানের দাম কমে যাওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘কৃষি বিভাগ এতদিন হাওরের কৃষকদের ঘরে ধান তোলা নিয়ে ব্যস্ত ছিল, এখন আমরা দ্রুত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে খাদ্য বিভাগে পাঠাব। তারা যত দ্রুত ধান কেনা শুরু করবে ততই কৃষকরা উপকৃত হবেন।’
এক মণ ধানে মিলছে না এক কেজি মাংস
কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের উপজেলাগুলোতে এখন এক মণ ধান বিক্রির টাকায় এক কেজি মাংসও কেনা যাচ্ছে না। বর্তমানে কিশোরগঞ্জ সদরসহ বিভিন্ন উপজেলার বাজারে এক কেজি খাসির মাংসের দাম ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা। আর এক মণ বোরো ধান বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকায়।
জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার জয়কা ইউনিয়নের পানাহার গ্রামের কৃষক জুয়েল মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এভাবে কি আর সংসার চালানো যায়। এক মণ ধানে এক কেজি মাংসও কেনা যায় না। ধান বিক্রি করে কামলা আর জমির মালিকদের ঋণ দিতে দিতেই টাকা শেষ।’
করিমগঞ্জ উপজেলার মরিচখালী গ্রামের কৃষক ছামসু মিয়া বলেন, ‘অনেক দিন ধরে ছেলেমেয়েদের মুখে খাসির মাংস দিতে পারি না। এক মণ বোরো ধান ৫৫০ টাকায় বিক্রি করে মরিচখালী বাজারে গিয়ে দেখি এক কেজি খাসির মাংস বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকায়। বাধ্য হয়ে মাংস না নিয়ে খালি হাতেই বাড়িতে ফিরে আসি।’
প্রতি কাঠায় কৃষকের লোকসান ৪০০ টাকা
বোরো ফসল ঘরে তুলতে দিনরাত মাঠে নিবিষ্টমনে কাজ করেছেন কৃষক। কিন্তু প্রতি কাঠায় (সাড়ে ৬ শতাংশ) কৃষকের লোকসান গুনতে হবে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। ফলে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে ময়মনসিংহের কৃষকদের কপালে।
সবেমাত্র বোরো ধান কাটা শুরু হওয়ায় ময়মনসিংহের বাজারে এখনো নতুন ধান উঠতে শুরু করেনি। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, আরও মাসখানেক পর বাজারে পুরোমাত্রায় বোরো ধান উঠতে শুরু করবে।
সদর উপজেলার বাদেকল্পা গ্রামে ফসলের মাঠে কথা হয় কৃষক আলী হোসেনের (৪৫) সঙ্গে। তিনি জানান, সাধারণত এক কাঠা জমিতে বোরো আবাদে খরচ হয় ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা। এবার ফলন হয়েছে কাঠাপ্রতি সাড়ে তিন মণ। বিক্রি করতে গেলে মণপ্রতি ৫০০ টাকার বেশি দাম পাওয়া যাবে না। এ হিসাবে প্রতি কাঠায় লোকসান গুনতে হবে ৪০০ টাকার মতো।
প্রায় একইরকম কথা বললেন আরেক কৃষক জাহাঙ্গীর আলম (৬৫)। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বারবার এমন লোকসান গুনতে গুনতে আমরা নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছি। আগামীতে আমাদের বোরো আবাদ ছেড়ে দিয়ে বিকল্প কিছু ভাবতে হবে।’
দাম নিয়ে হতাশ বগুড়ার কৃষক
বৈরী আবহাওয়ার কারণে মাঠের বোরো ধান নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন বগুড়ার কৃষকরা। ঘূর্ণিঝড় ফণির কারণে দ্রুত ধান কেটে ঘরে তোলার পর এখন কাক্সিক্ষত দাম না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা।
বগুড়ার ১২টি উপজেলার মধ্যে নন্দীগ্রাম, কাহালু, শাজাহানপুর, দুপচাঁচিয়া ও আদমদীঘি উপজেলাতে আলু চাষ না করার কারণে আগাম বোরো ধান রোপণ করা হয়। এসব এলাকায় জমির ধান প্রায় ৮০ ভাগ পেকেছে। অন্য উপজেলাগুলোতে পেকেছে ৬০ ভাগ। বৈরী আবহাওয়ার আশঙ্কায় প্রতিটি উপজেলাতেই ধান কেটে ঘরে তোলার জন্য গত সোমবার থেকে মাইকযোগে প্রচার শুরু করে কৃষি বিভাগ। কৃষি বিভাগের এই আহ্বানের পর কৃষকরাও আধপাকা ধান কাটতে লেগে পড়েন। এতে দেখা দেয় শ্রমিক সংকট। এই জেলার ধান কাটার জন্য মূলত রংপুর অঞ্চলের মজুরের ওপর ভরসা করতে হয়। কিন্তু ওই অঞ্চলের মজুররা সময়মতো এসে পৌঁছতে না পারায় অনেক বেশি মজুরিতে ধান কেটে ঘরে তুলতে হয় কৃষকদের। কিন্তু অধিক টাকা খরচ করে ধান ঘরে ওঠালেও বাজারে তার দাম পাচ্ছেন না কৃষক।
বগুড়ার অন্যতম বৃহৎ ধান-চালের মোকাম নন্দীগ্রাম উপজেলার রণবাঘা হাট এবং দুপচাঁচিয়া উপজেলার ধাপ সুলতানগঞ্জ হাটে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সেখানে নতুন ধান বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা মণ দরে। প্রতি বিঘায় কৃষক ধান পেয়েছে গড়ে ২০ মণ, সেই হিসেবে বিঘাপ্রতি ধানের দাম পাচ্ছেন তারা সর্বোচ্চ ১৩ হাজার টাকা।
