আমরা চিন্তা করি অসৎ। কাজ করি অসৎ। আয় রোজগার করি অসৎ পথে। কিন্তু আমরা ফলটা চাই সৎ। অসৎ পথে হারাম আয়ের টাকায় খুঁজি হালাল খাদ্য। আমি বলছি না যে হালাল খাদ্য খোঁজা অন্যায়। কিন্তু ওই হালাল খাদ্য যে হারাম টাকায় কিনছি! সেটা নিয়ে কতটা ভাবি আমরা? যার উৎসে হারাম তা প্রান্তে এসে হালাল হয় কী করে!
ঠিক এই কথাটাই গত বছর একটি আলোচনায় বলেছিলেন মালয়েশিয়ার একজন মন্ত্রী। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা খাবার খাওয়ার সময় হালাল খোঁজ করিÑ শূকর না গরু, তা যাচাই করি। শূকর হলে খাই না, গরু হলে, মুরগি হলে খাই। কিন্তু এ গরু আর মুরগি কীভাবে অর্জিত হয়েছে সৎ উপার্জনের অর্থে নাকি অসৎ উপার্জনের অর্থে ওই পর্যন্ত আমরা হালাল-হারাম খোঁজ করতে যাই না। হালাল-হারামের শেষ স্তরটা দেখি। মুরগি কিনতে পারছি, এটা ঠিক আছে। মুরগিটার জবাই ঠিকমতো হয়েছে কি না এটা কেউ কেউ খোঁজ করি, কিন্তু মুরগি যে পয়সা দিয়ে কিনলাম সে অর্থটা হালাল না হারাম ওটা আমরা দেখি না। হালাল এবং হারাম একেবারে উৎস থেকে শুরু হয় এবং শেষ পর্যন্ত ধাপে ধাপে চলে’।
আমরা অনৈতিক উপায়ে টাকা আয় করি, ঘুষ খাই, দুর্নীতি করি, অন্যের পকেট কাটি। সে টাকায় হজ করি, দান-খয়রাত করি, মসজিদ-মাদ্রাসায় দিই। মনে করি ওই সব খাত থেকে কিছু বাড়তি পুণ্য আমাদের পারসোনাল অ্যাকাউন্টে জমা হবে। কিন্তু হারাম পথে আয় করা অর্থ দিয়ে কি পুণ্য অর্জন হয়?
এই যে রোজা এলেই দ্রব্যমূল্য বেড়ে যায় তার পেছনেও আছে অতি মুনাফালোভী অসৎ চিন্তা। ধরা যাক, রোজায় কিছু দ্রব্যের চাহিদা বেড়ে যায়। মার্কেটে যার চাহিদা বেশি কিন্তু সরবরাহ কম তার দাম অনেক সময় বাড়তে পারে। কিন্তু রোজায় যে চাহিদা বাড়ে তখন কি সরবরাহ কমে? এই বাড়তি চাহিদা পুরনো ধারা। সেটা সংগত না অসংগত সেটা নিয়েও বিস্তর কথা আছে। সে ভিন্ন আলোচনা। কিন্তু যে চাহিদা প্রতি বছরই বাড়ে তার তো সরবরাহ কম থাকার কথা না। ব্যবসায়ীরা ব্যবসার প্রয়োজনেই তার পর্যাপ্ত সরবরাহ করেন।
তাছাড়া এর মধ্যে যে ভোগ্যপণ্য আমদানি করতে হয়, তার আমদানি ব্যয় কি রোজার কারণে বেড়ে যায়? তা তো বাড়ে না। যে সব পণ্য দেশীয় তারও তো উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাত করার খরচ বাড়ে না, যে দুয়েক সপ্তাহ বা মাসের ব্যবধানে দাম বাড়িয়ে দিতে হবে। তাহলে নিশ্চিতভাবে এই দাম বাড়ার পেছনে আছে অতি মুনাফা লাভের লোভ। এই লোভী কাজটা না সততার পরিচয় বহন করে, না হয় সেটা মানবিক আচরণ। অথচ ধর্ম আমাদের অধিকতর মানবিক হতে শেখায়, সৎ হতে শেখায়।
কিছু সবজির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় রোজার সময় তার সরবরাহ হয়তো পর্যাপ্ত থাকে না। ফলে তার দাম বাড়ে। কিন্তু সব পণ্যের বেলায় তো এ ফর্মুলা খাটে না। অন্য সব ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ে কেন তবে? আর রোজায় সামর্থ্যবানরা নতুন নতুন মজাদার আইটেম বেশি করে খেয়ে অসামর্থ্যবানদের যে বাড়তি চাপের মধ্যে ফেলে দিই সেটাও কতটা সংগত তাও ভেবে দেখার বিষয়।
এমনিতেই বাংলাদেশে খাদ্যদ্রব্যের দাম সব সময়ই বেশি। খাদ্যদ্রব্যের পেছনেই ব্যয় হয়ে যায় আমাদের আয়ের সিংহভাগ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেনডিচার সার্ভে ২০১৬’-এর প্রতিবেদন অনুসারে জাতীয় পর্যায়ে একটি পরিবারের মাসিক মোট ব্যয়ের ৪৭ দশমিক ৭০ শতাংশই খরচ হয় খাদ্যে। গ্রামাঞ্চলে খাদ্যে ব্যয় হয় ৫০ দশমিক ৪৯ শতাংশ। অন্যদিকে শহরাঞ্চলে খাদ্যে ব্যয়ের পরিমাণ ৪২ দশমিক ৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের ৭০ শতাংশের বেশি মানুষের খাদ্যপণ্যে মাসিক ব্যয়ের পরিমাণ মোট ব্যয়ের ৫০ শতাংশের বেশি (দেশ রূপান্তর, সম্পাদকীয়, ০৭ মে ২০১৯)।
এই ব্যয় যে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের রোজার মাসে অনেকটা বেড়ে যায় সেটা সবারই জানা।
সম্প্রতি কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বলেছে, ভোগ্যপণ্যের আমদানি ও উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করছে গুটিকয়েক ব্যবসায়ী। তারা অতি মুনাফার লোভে সুযোগ পেলেই পণ্যের মূল্য বাড়ায়। ক্যাবের সভাপতি গোলাম রহমান বলেছেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী নিত্যপণ্যের মজুদ, উৎপাদন ও আমদানি সন্তোষজনক। তারপরও রোজার এক-দুই মাস আগেই পণ্যের দাম বেড়েছে। গত কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রতি কেজি গরুর মাংসে ৫০ টাকা, চিনিতে ৮, পেঁয়াজে ১৫ ও আমদানি করা রসুনে ১০ টাকা বেড়েছে। রোজা সামনে রেখে এই দাম বৃদ্ধির প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।
বুঝলাম আমাদের মজুদ, উৎপাদন, আমদানি সন্তোষজনক। তাতে কনজুমারের কী আসে যায়। সব সন্তোষজনক, শুধু বাজারের দামটাই অসন্তোষজনক। সরকারের চোখের সামনেই ঘটেছে এই অসন্তোষজনক কর্মটি। তারা তা দেখেননি, নিবৃতও করেননি। তাহলে এই সন্তোষের গল্প আমাদের কী কাজে এলো?
জনসাধারণকে যেমন সংযমী ও মানবিক হতে হবে, চিন্তায় কাজে সৎ হতে হবে তেমনি এসব ক্ষেত্রে থাকা চাই সরকারি নিয়ন্ত্রণও। কিন্তু রোজায় দ্রব্যমূল্য নিয়ে এই যে প্রতি বছর একই কাহিনীর পুনরাবৃত্তি হয় সেখানে সরকারি সংস্থাগুলো করে কী? সিটি মেয়র সাহেবদের শুধু মাংসের দাম বেঁধে দেওয়া ছাড়া আর কিছু কি কেউ করে? সেই বেঁধে দেওয়া দামও যে কেউ মানে না সে বিষয়টি দেখারও কেউ থাকে না। আর সিটির বাইরে যে গোটা বাংলাদেশ, সেখানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করবে কে?
সরকারের যে টিসিবি নামে একটা সংস্থা আছে, তার মাধ্যমে সুলভ দামে পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন খাদ্যপণ্য সরবরাহ করেও তো এই সময়ে দ্রব্য নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। সে উদ্যোগটাও কি বাজারে কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারছে?
সরকার না পারছে অসাধু ব্যবসায়ীদের বাড়তি মুনাফা করার অন্যায় পথ থেকে নিবৃত করতে, না পারছে যথাযথভাবে বাজার মনিটর করতে। অন্যদিকে না পারছে টিসিবিকে আরও কার্যকর করে বাজারদর নিয়ন্ত্রণে রাখতে। এই না পারা বা না করার পেছনেও আছে সরকারের রাঘববোয়ালদের অনৈতিক লোভ। কারণ ওই সব বড় অসৎ কারবারিদের বাড়তি মুনাফার একটা অংশ সরকারের কারও কারও অ্যাকাউন্টকে ভারী করে।
রোজার মূল বিষয় হলো সংযম। অনৈতিক বা নৈতিক যে পথেই হোক, এই যে বাড়তি মুনাফা ও বাড়তি খাওয়াÑ এর নাম কি সংযম? অতি লোভ ও অসম প্রতিযোগিতার দৌড়ে যে অসংযমী আচরণ তা কি আমাদের ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিকতা, মানবিকতা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে না?
ঈদ উপলক্ষে যে নতুন পোশাক সেখানেও আছে আরেক সংকট। এই সময় নতুন পোশাকের দামটাও যায় বেড়ে। মনে হয় এক শ্রেণির ব্যবসায়ী বছরব্যাপী অপেক্ষা করেন এই একটা উপলক্ষে কতটা বেশি মুনাফা করে টাকার মালিক হওয়া যায় তার জন্য। ভাবখানা এমন, গলা যখন কাটবই কম কাটব কেন!
বাংলাদেশ ছাড়া পৃৃথিবীর আর কোনো দেশে এভাবে ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে অতিমুনাফার ফাঁদ পাতে ব্যবসায়ীরা? আর কোন ধর্মীয় উৎসবে হয় এই অনৈতিক ব্যবসা? বিভিন্ন ধর্মের উৎসবকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর সবখানে মূল্যহ্রাস করে। সে সব দেশে সাধারণ ক্রেতারা অপেক্ষায় থাকেন ওই সব উৎসবের জন্য। কারণ তখন তারা তুলনামূলক কম দামে কিনতে পারবেন তাদের কাক্সিক্ষত পরিধেয় বস্ত্র। একই সঙ্গে বিক্রেতাও অপেক্ষায় থাকেন অল্প সময়ে কম দামে বেশি আইটেম বিক্রি করে লাভবান হওয়ার জন্য। একইসঙ্গে ওই দুই গ্রুপের অপেক্ষার মাঝে কোনো অনৈতিক উদ্দেশ্য থাকে না। রোজার-ঈদ উপলক্ষে আরব দেশেও দ্রব্যমূল্য ছাড় দেওয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশে হয় উল্টোটা। ধর্মীয় উৎসব মানে সংশ্লিষ্ট ধর্ম সম্প্রদায়ের সবাইকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসা। সমতার ভিত্তি মজবুত করা। উৎসবকে উদযাপনের সুযোগ সবার নাগালের মধ্যে নিয়ে আসা। ধর্মীয় উৎসবের মানে কখনোই কারও কষ্ট বাড়িয়ে দেওয়া নয়।
শুধু খাদ্যপণ্য ও পোশাক নিয়েই নয়, আমরা বেপরোয়া অসংযমী হয়ে উঠি আরও অনেক কিছু নিয়েই। ধর্মের লেবাস পড়া আর ধার্মিক হওয়া এক কথা নয়। চিন্তায়, কথায়, কাজে, ব্যবহারে আমরা কতটা সংযমী কতটা মানবিক হতে পারছি সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা একদিকে হাতে তসবি নিই, অন্যদিকে রাষ্ট্র, সমাজ ও মানুষের ক্ষতি করি, অধিকার ক্ষুণœ করি, অন্যায়ভাবে মনে কষ্ট দিই। ঘুষ, দুর্নীতি, ডাকাতি করে সম্পদশালী হই, আবার তার জাকাতও দিই! কিন্তু হারাম আয়ের জাকাত আদায় করলেই কি তা হালাল হয়ে যাবে?
পৃথিবীর সব দেশে এক নিয়ম। যখন বিক্রি বাড়ে তখন দাম বাড়ে। কারণ তখন কম লাভে বেশি বিক্রি করে বৈধভাবে সৎ পথে বেশি আয় করার সুযোগ তৈরি হয়। ব্যতিক্রম শুধু বাংলাদেশে। সকল দুই নম্বরিতেই কেন ‘সকল দেশের সেরা সে যে আমার জন্মভূমি!’
