এ বছরের এপ্রিলে সিরিয়ার বাগুজে আইএসের সর্বশেষ ঘাঁটির পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র আইএসকে পরাজিত করা হয়েছে বলে ঘোষণা দিয়েছিল। এতে এক দিকে যেমন অনেকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন, অন্যদিকে আইএসের নতুন কোনো ভয়াবহ রূপ দেখার আশঙ্কায় অপেক্ষমাণ ছিল বিশ্ব। গত ২১ এপ্রিল শ্রীলঙ্কায় খ্রিস্টানদের ইস্টার সানডের উৎসবে হামলার পর ২৯ এপ্রিল আইএসের স্বঘোষিত খলিফার ১৮ মিনিটের ভিডিও বার্তা আইএসের নতুন উত্থানের বার্তা দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী আইএস ভীতির নতুন রূপ দেখা যাচ্ছে। গত ১০ মে আইএস ভারত শাসিত কাশ্মীরকে ‘নিজেদের প্রদেশ’ বলে দাবি করে সংগঠনটির মুখপত্র আমাক-এ বিবৃতি প্রকাশ করেছে। এই মাসের শুরু থেকে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে আইএস কর্তৃক আত্মঘাতী হামলা চালানোর কথা খুব করে প্রচার হচ্ছে। আর এসবই হচ্ছে এমন একটা সময় যখন মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটা যুদ্ধের দামামা প্রায় বেজে উঠেছে, ভারতে জাতীয় নির্বাচন চলছে আর আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে আমেরিকার দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে পশ্চিমা দুনিয়ায় ক্রমেই ডানপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর উত্থান ঘটছে। বিশ্বব্যাপী ‘হেইট ক্রাইমের’ মাত্রা বাড়ছে, ধর্মীয় রাজনীতির রমরমা সময় যাচ্ছে। আর ঠিক এই সময়েই একটা উগ্র ধর্মীয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর পুনরুত্থানের বার্তা প্রচার হচ্ছে।
২০১৪ সালের রমজান মাসে বিশ্বের মানুষ ইরাক-সিরিয়াতে একটা কথিত খেলাফতের আবির্ভাব দেখেছিল। তারপর থেকে সেই খেলাফতিদের বর্বর তা-বলীলা এবং ওই কথিত খেলাফতকে ধ্বংসের জন্য পশ্চিমা সন্ত্রাসবিরোধী জোটের হত্যাযজ্ঞ দেখা গেছে গত ৪ বছর ধরে। লাখ লাখ সাধারণ ইরাকি ও সিরীয় নাগরিক এই সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নির্মম বলি হয়ে জীবন দিয়েছে। গত এপ্রিলে যখন ফলাও করে প্রচার করা হলো যে আইএস পরাজিত হয়েছে, ততদিনে ইরাক ও সিরিয়া ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এখন লাখ লাখ ইরাকি ও সিরীয় নাগরিকের জীবন ত্রাণনির্ভরÑ মানুষের দয়া ও দান যাদের বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল। অথচ গত এক দশক আগেও সিরিয়া একটি দাতা দেশ ছিল। ইরাক ২০০৩ সালে শুরু হওয়া মার্কিন নির্মমতাকে সবে মাত্র কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা করছিল।
এপ্রিলে যখন আইএস পরাজিত হয়েছে বলে প্রচারণা চালানো হয় তখন অনেক বিশ্লেষক ইরাক ও সিরিয়ার বাইরে ব্যাপকভাবে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটির ছড়িয়ে পড়া নিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছিল। পশ্চিমা সংবাদ মাধ্যমগুলোতে আইএসের পরাজয় নিয়ে ব্যাপক সংবাদ পরিবেশন করেছিল, কিন্তু আইএসের মূল হোতা কারা, কারা তাদের অস্ত্রশস্ত্র ও রসদ দিয়ে গড়ে তুলেছে আর কারা তাদের দ্বারা সংঘটিত যুদ্ধের ফলে লাভবান হয়েছে সে সব তথ্য তেমন একটা সামনে আসেনি। খেলাফত পতনের সময়ও বাগদাদি সিরিয়াতেই ছিলেন বলেও সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। আমেরিকা আইএস খলিফা আবু বকর আল-বাগদাদিকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য আড়াই কোটি মার্কিন ডলার মূল্য ঘোষণা করল, কিন্তু তাকে পাওয়া গেল না! ঠিক সে সময়ই রাশিয়া ও সিরিয়া কর্তৃক আমেরিকার প্রতি অভিযোগ আনা হলো যে দেশটি আইএস যোদ্ধাদের ইরাক ও সিরিয়া থেকে পালাতে সহায়তা করেছে। বাগদাদিকে আমেরিকানরাই পালাতে সহযোগিতা করেছে বলেও খবর এলো কিছুদিন পর।
আমেরিকা আইএস পতনের ঘোষণা ফলাও করে প্রচার করলেও আইএস যোদ্ধাদের ও বাগদাদির পলায়নের বিষয়ে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে নিশ্চুুপ ছিল। আর এরই মধ্যে বেশ কয়েকবার আমেরিকা কর্তৃক আইএস সৃষ্টি হয়েছে বলে বেশ কিছু সংবাদ প্রকাশিত হয়, কিন্তু আমেরিকার পক্ষ থেকে এতসব অভিযোগের বিষয়েও কিছুই বলা হয়নি। এখন আবার আইএস ইস্যু এমন একটা সময় সামনে এলো, যখন ইরানের সঙ্গে আমেরিকার দ্বন্দ্ব চরমে উঠেছে। একই সময়ে আইএস দক্ষিণ এশিয়ার এমন এক জায়গাকে নিজেদের খেলাফতের প্রদেশ ঘোষণা করল যে স্থানটিতে ৭০ বছর ধরে স্বাধীনতার দাবিতে লড়াই চলছে। কাশ্মীর ইস্যুকে সামনে রেখে দুটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে যুদ্ধ লাগে লাগে অবস্থা। সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধবাজ দেশগুলোর একটা কৌশল হচ্ছে একটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে অন্য আরেকটা ইস্যুর মাধ্যমে আড়াল করে রাখা। এর ফলে জনগণের নজর এড়িয়ে কৌশলে উদ্দেশ্য হাসিল করা সহজ হয়। তাই ২০১৪ সালে আইএসের উত্থান আর এবারের আইএসের উত্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতির মধ্যে ঘটছে।
আইএস নিঃসন্দেহে উগ্র ধর্মীয় চেতনার লেবাসধারী একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। ইসলাম ধর্মের নামেই সন্ত্রাসী সংগঠনটি কার্যক্রম পরিচালনা করায় আইএস ইস্যু ইসলাম ধর্ম ও তার অনুসারীদের জন্য ভাবমূর্তির সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে জাতিগত বিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িকতা বেড়ে যাওয়া এবং এটা থেকে ‘হেইট ক্রাইম’ বৃদ্ধির ব্যাপক আশঙ্কা বাড়ছে। যার ফল হতে পারে সন্ত্রাসবাদের দিকে কাউকে ঠেলে দেওয়া, যা পরোক্ষভাবে সন্ত্রাসবাদীদের হাতকে আরও শক্তিশালীই করবে।
গত ৯ মে লন্ডনের দ্য টাইমস পত্রিকায় নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের বরাতে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরাকের সরকার সে দেশের প্রায় ৪৫ হাজার শিশুকে আইএস যোদ্ধাদের সন্তান হিসেবে চিহ্নিত করেছে। জনসংখ্যার বিচারে এটি অবশ্যই বড় একটা সংখ্যা। এখন এই শিশুদের ভবিষ্যৎ কী হবে? এই শিশুদের একটা বড় অংশই নিজেদের পিতা-মাতাকে হত্যার শিকার হতে দেখেছে, যা তাদের মনে প্রতিশোধ স্পৃহার সৃষ্টি করতে পারে।
যথাযথ কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে এসব শিশুকে লালন করা হলে হয়তো সে শঙ্কা কমতে পারে। অন্যদিকে ইরাক সরকার এসব শিশুকে পরিচয়পত্র দিচ্ছে না, স্কুলে ভর্তি হতে দিচ্ছে না এবং স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে না। ফলে এসব শিশুর বিপথগামী হওয়ার আশঙ্কা আরও বাড়ছে। সংস্থাটির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সিরিয়াতে ৩০ হাজার ইরাকি রয়েছে যাদের ৯০ শতাংশই হচ্ছে আইএস যোদ্ধাদের সন্তান; ইরাক সরকার এদের গ্রহণ করতে চাচ্ছে না। ফলে এদের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত। যদি এটাই হয় তাহলে এই বৃহৎ জনসংখ্যাও একদিন বিপথগামী হতে বাধ্য হবে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইরাক সরকার ইতোমধ্যে ৫শত আইএস যোদ্ধাকে প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার করে মৃত্যুদ- দিয়েছে। আর ১ লাখ সন্দেহভাজন আইএস যোদ্ধার তালিকা প্রস্তুত করেছে। এই বিরাট সংখ্যক আইএস যোদ্ধার তালিকা ও ৫শ আইএস সদস্যের মৃত্যু কার্যকর করাটাও হয়তো আইএসের পলাতক যোদ্ধাদের মধ্যে জিঘাংসা আরও বাড়িয়ে তুলবে। সম্প্রতি প্রকাশিত বাগদাদির ভিডিও বার্তায় বিভিন্ন স্থানে চালানো হামলাগুলোকে এই সব কিছুর প্রতিশোধ বলেই উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ৮ মে নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরাকি সরকার ১৪ হাজার বিদেশি আইএস যোদ্ধা আটক করেছে। যাদের মধ্যে নারী-পুরুষ উভয়ই রয়েছে। ইরাক ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ অংশ নিয়ে খেলাফত ঘোষণার পর বিশ্বের ৮০টি দেশ থেকে প্রায় ৪০ হাজার যোদ্ধা ইরাকে ও সিরিয়াতে কথিত খেলাফতের জন্য লড়াইয়ে যোগ দেয়। খেলাফত পতনের পর এসব সন্ত্রাসীর জীবন এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। যুক্তরাজ্য থেকে ৯শ জন ইরাক এবং সিরিয়াতে গিয়েছিল। এখন যুক্তরাজ্য আর তাদের ফেরত নিতে চাচ্ছে না। সম্প্রতি যুক্তরাজ্য অনেক আইএস সদস্যের পাসপোর্ট বাতিল করেছে। যার ফলে এসব উন্মাদ সন্ত্রাসীর জীবন এখন অনিশ্চিত; এর ফলে এসব সন্ত্রাসীর আত্মঘাতী হয়ে ওঠার আশঙ্কা আরও জোরালো হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের পদাঙ্ক অনুসরণ করে অস্ট্রেলিয়াও আইএসে যোগদানকারী নিজ দেশের নাগরিকদের পরিচয়পত্র বাতিল করেছে। যার ফলে একটা উল্লেখযোগ্য বিদেশি যোদ্ধা দেশ দুটিতে আটকা পড়েছে। সিরিয়াতে সর্বশেষ ঘাঁটির পতন হওয়ার পর ১৩ হাজার বিদেশি আটকা পড়েছে, যাদের মধ্যে ১২ হাজারই নারী ও শিশু। এখন এসব বিদেশি নারী ও শিশুর জীবন অনিশ্চিত। যদি এদের ফিরিয়েও নেওয়া হয়Ñ যেমন রাশিয়া, ফ্রান্স, কসোভো, ইন্দোনেশিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশ তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেÑ তারপরও তারা হয়তো আর আগের মতো স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারবে না। যার ফলে এদের মধ্যে থেকে উক্ত সমাজে ‘হেইট ক্রাইম’ ছড়ানোর আশঙ্কা তৈরি হবে।
সম্প্রতি শ্রীলঙ্কায় মর্মান্তিক হামলার দায়স্বীকার বা কৃতিত্ব দাবি করেছে আইএস। খবরে প্রকাশ হামলার নেতৃত্বদানকারী একজন অনুগত আইএস সদস্য, যে ইরাক বা সিরিয়াতে প্রশিক্ষণ নেয়নি, সে ছিল ভারতে। তাই এমন আরও অনেক সন্ত্রাসী থাকতে পারে যারা আরও হামলার জন্য এমনভাবে ঘাপটি মেরে আছে কিন্তু তাদের শনাক্ত করা যাচ্ছে না। তাই দক্ষিণ এশিয়ায় আইএসের সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কার কথা যেভাবে প্রচারিত হচ্ছে তা উদ্বেগের বৈকি। এমন হামলা বা আইএসকে মোকাবেলার কৌশল নিয়ে অবশ্যই ভাবতে হবে।স
এমন যেন না হয় যে, কাউকে সন্ত্রাসের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বা ‘হেইট ক্রাইমের’ শিকার হয়ে কেউ সন্ত্রাস শুরু করে দিচ্ছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘদিনের পুরনো ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং সাম্প্রদায়িক সংঘাতকে যদি আইএসের মতো একটা বিশব্যাপী নেটওয়ার্ক সম্পন্ন মারাত্মক সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের হাতে অস্ত্র হিসেবে তুলে দেওয়া হয়, তাহলে তা সত্যিই মারাত্মক বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি করতে পারে। তাই উপমহাদেশের জনগণকে নিজেদের বিভেদ দূরে ঠেলে জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি দৃঢ় করার পথ খুঁজতে হবে।
