দ্বিতীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আগ্রহী চীন

আপডেট : ২৩ মে ২০১৯, ০২:১৯ এএম

পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পৃক্ত হওয়ার পর বাংলাদেশের দ্বিতীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে আগ্রহ দেখাচ্ছে চীন। এ বিষয়ে চীনের একটি প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান ও বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনে প্রস্তাব জমা দিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। তবে চীন সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন বিষয়ে কোনো চুক্তি না থাকায় তাদের ওই প্রস্তাবের কোনো গুরুত্ব দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। 

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, দেশের দক্ষিণাঞ্চলে নির্মিত হবে দ্বিতীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এই কেন্দ্র নির্মাণের স্থান নির্বাচনে একটি সমীক্ষা প্রকল্প নিয়েছে সরকার, যার মেয়াদ আগামী জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা আরও এক বছর বাড়ানো হচ্ছে। শুরুতে আটটি স্থান দেখার পর এখন নতুন করে ১০ জেলায় ১৩টি স্থান প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্বিতীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প কবে নেওয়া হবে, তার কিছুই ঠিক নেই। এ অবস্থার মধ্যেই চীনা একটি প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রটি নির্মাণে আগ্রহ দেখিয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও দ্বিতীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. এ এফ এম মিজানুর রহমান গতকাল দেশ রূপান্তরকে জানান, চীনের একটি প্রতিনিধিদল এসেছিল। তারা বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা শেষে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী এবং পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে একটি লিখিত প্রস্তাব দিয়ে গেছে। তাতে দ্বিতীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে আগ্রহের কথা জানিয়েছে তারা।

তিনি আরও জানান, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রে আগ্রহী দেশগুলোকে অবশ্যই আগে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে রাশিয়া ২০০৯ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করেছে। বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের যেহেতু এ ধরনের কোনো চুক্তি নেই, সেহেতু তাদের ওই প্রস্তাবের কার্যত গুরুত্ব নেই।   

এদিকে দেশের দ্বিতীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে নির্ধারিত আটটি চরের মধ্যে প্রাথমিকভাবে তিনটি চরকে উপযুক্ত মনে করা হচ্ছিল। তবে ওইসব চরের জমি বিভিন্ন কোম্পানি ও সংস্থার নামে বরাদ্দ হয়ে গেছে। ফলে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য দুই হাজার একর জমি পাওয়া সম্ভব নয় চর তিনটিতে। এখন নতুন করে ১০ জেলায় ১২টি চর ও নোয়াখালীর সোনাদিয়া দ্বীপকে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করেছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। এসব স্থানে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হবে, স্থানগুলো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উপযুক্ত কি না। তারপরই স্থান চূড়ান্ত করা হবে।

স্থান নির্ধারণ নিয়ে ড. এ এফ এম মিজানুর রহমান বলেন, প্রাথমিকভাবে ১৩টি স্থান দেখা হয়েছে। আরও বেশ কিছু স্থান দেখা যাবে। পরে উপযুক্ত স্থান নির্ধারণ করা হবে। এ বিষয়ে কাজ চলছে। 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্বিতীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কম ঘনবসতিপূর্ণ দক্ষিণাঞ্চলের কোনো চর বা দ্বীপে নির্মাণের নির্দেশনা দিয়েছেন। এরপর উপযুক্ত স্থান নির্ধারণে একটি সমীক্ষা চালানোর জন্য ২০১৭ সালে প্রকল্প হাতে নেয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। প্রাথমিকভাবে আটটি স্থানে সমীক্ষা চালানো হয়েছে। স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে পটুয়াখালীর পক্ষীয়ার চর, বরগুনার খোট্টার চর, টেংরার চর, আলিসার মোড় ও নিদ্রার চর, খুলনার চর হালিয়া, নোয়াখালীর বয়ার চর ও ফেনীর মুহুরীর চর। এর মধ্যে পক্ষীয়ার চর, খোট্টার চর ও নিদ্রার চরকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে সরেজমিনে যান প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা। তারা দেখতে পান এসব চরে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। তাই নতুন এলাকা নির্ধারণে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা জানান, পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার পক্ষীয়ার চরের ৪৭৫ একর জমি রিভারাইন ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিগেডকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এসব জমি অধিগ্রহণের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। খোট্টার চরের ১০০ একর জমি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য আইসো টেক ইলেকট্রিফিকেশন কোম্পানিকে বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। আর নিদ্রার চরের ২৬৭ একর জমি নৌবাহিনীকে শিপইয়ার্ড নির্মাণের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

দ্বিতীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য আনুমানিক ২ হাজার একর জমি প্রয়োজন উল্লেখ করে তারা বলেন, নদী বা সাগর তীরবর্তী এই পরিমাণ জমি পাওয়া সম্ভব কি না, সে তথ্য চেয়ে বরিশাল, বরগুনা, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, মাদারীপুর, পিরোজপুর, বাগেরহাট, খুলনা, ভোলা, ফেনী ও সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসককে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ১০টি জেলার কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার পর ১৩টি চর ও দ্বীপ সরেজমিনে পরিদর্শন করেন সংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যে রয়েছে বরিশালের চর মেঘা, বরগুনার কুমির মারা ও পদ্মা মৌজা, নিশানবাড়ি মৌজা, লালদিয়ার চর, পটুয়াখালীর চর মোন্তাজ, সোনার চর ও মৌডুমি, নোয়াখালীর মৌলভীর চর ও চর খাসিয়া, পিরোজপুরের খোলপটুয়া, মাদারীপুরের চর জানাজাত, চট্টগ্রামের উড়ির চর, খুদুকখালী ও ছোট হানুয়া মৌজা এবং কক্সবাজারের সোনাদিয়া দ্বীপ।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্র নির্বাচনের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। এর ওপরই মানুষ ও পরিবারের নিরাপত্তার সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তার বিষয়টিও জড়িত। তাই ক্ষেত্র নির্বাচনে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার নির্দেশনার পাশাপাশি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্র্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তরের বিধিনিষেধ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মেনে চলতে হয়। ফলে স্থান নির্ধারণে নেওয়া প্রকল্পের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে প্রকল্পের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এই ১৩টি স্থানের মধ্যে সার্ভে পর্যায়ের কার্যক্রম পরিচালনা করে তার ফলাফল বিশ্লেষণ করে প্রাধান্যের ক্রম তৈরির মাধ্যমে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য অন্তত একটি বা দুটি ক্ষেত্র চূড়ান্ত করা হবে।

দ্বিতীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণে নেওয়া প্রকল্পের কাজ ২০১৭ সালের জুলাই থেকে শুরু হয়ে আগামী জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু উপযুক্ত চর নির্ধারণ করতে না পারায় মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানো হচ্ছে। প্রকল্পের সংশোধনী প্রস্তাব এরই মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত