‘বাড়ৈ সিন্ডিকেটের’ কব্জায় শিক্ষা প্রশাসন

আপডেট : ৩১ মে ২০১৯, ০২:৫০ এএম

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন দপ্তর-সংস্থায় শিক্ষা ‘বাড়ৈ সিন্ডিকেট’র প্রায় অর্ধশতাধিক কর্মকর্তার প্রভাব চোখে পড়ার মতো। তাদের অধিকাংশ সদস্য দুর্নীতিবাজ, সাবেক ছাত্র ইউনিয়ন, শিবির, ছাত্রদল ও সুবিধাবাদী হিসেবে শিক্ষা প্রশাসনে চিহ্নিত। তাদের কারও কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে দুদকে মামলা চলমান, কেউ বা জিপিএ-৫ বিক্রির অভিযোগে অভিযুক্ত। আর এই সিন্ডিকেটের অন্তত ২৮ জনকে বদলি করে শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদেসহ মোট ৯৯ জনকে বদলি ও ওএসডি করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া বিভিন্ন বদলি ও ওএসডি আদেশে দেখা গেছে, সারা দেশের বিভিন্ন সরকারি কলেজের ৭৫ শিক্ষককে বদলি করা হয়েছে। এছাড়াও জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) ১৩ জন কর্মকর্তাকে ওএসডি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি), বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ১৬ জন কর্মকর্তাকে বিভিন্ন স্থানে বদলি করা হয়েছে।

এই বদলি আদেশে দেখা গেছে, তালিকায় এমন অন্তত ১৫ থেকে ২০ কর্মকর্তার নাম রয়েছে যাদের বদলি করে এমন পদে বসানো হয়েছে তাতে স্পষ্টত তাদের খুশি করা হয়েছে। অথচ তাদের বেশিরভাগেরই বিরুদ্ধে ঘুষ, পরীক্ষার খাতা জালিয়াতি করে জিপিএ-৫ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে ঢাকা বোর্ডের সাবেক কলেজ পরিদর্শক আশফাকুস সালেহীন; যিনি ঢাকার একটি স্কুল থেকে ৫ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছিলেন। এরপর তাকে যশোরের এমএম কলেজে বদলি করা হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগটি তদন্তনাধীন। এরপরও তাকে যশোর থেকে ফের বদলি করে মাউশির ১৫০০ কলেজ উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক করা হয়েছে।

ঢাকা বোর্ডে ডেপুটি কন্ট্রোলার পদে থাকা অবস্থায় মাসুদা বেগম খাতা জালিয়াতি করে জিপিএ-৫ পাইয়ে দিয়েছিল নিজের মেয়েকে। তার বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অভিযোগ গেলে তাকে ঢাকা বোর্ড থেকে সরিয়ে বরিশাল বিএম কলেজে পাঠানো হয়। কিন্তু ওই বদলি আদেশ বাতিল করিয়ে কুমিল্লা সরকারি কলেজে বদলি নেন তিনি। এবার তিনি সেখান থেকে বদলি নিয়ে আসছেন ঢাকার নায়েমের খুবই গুরুত্বপূর্ণ পদ প্রশিক্ষণ ও বাস্তবায়নের উপপরিচালক পদে।

এক সময়ের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের নেতা ছিলেন নাজমুল হক। তাকে শরীয়তপুর সরকারি কলেজ থেকে সরিয়ে ঢাকার মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের পরিদর্শক পদে আনা হয়েছে। বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত আবুল কালাম আজাদকে ডিআইএর উপপরিচালক পদে আনা হয়েছে।

অন্যদিকে ক্লিন ইমেজ থাকার পরও মাউশি ও এনসিটিবির অনেকেই বদলি ও ওএসডির কবলে পড়েছেন। এনসিটিবির সদস্য অধ্যাপক ড. মিয়া ইনামুল হক, মাধ্যমিকের ঊর্ধ্বতন বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক মো. আবদুর রহিম, মাধ্যমিকের সম্পাদক সহযোগী অধ্যাপক নূর মোহাম্মদ, বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক হাসমত মনোয়ারসহ এনসিটিবির মোট ১৩ জনকে বদলি ও ওএসডি করা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বাড়ৈ সিন্ডিকেট এতটাই প্রভাবশালী তারা ঘুরেফিরে শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসে সরকারকে বিতর্কিত করে আসছে দীর্ঘদিন। এদের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে হবে।’

জানা গেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে নতুন মন্ত্রী আসার পর ২৫ মার্চ প্রথমবারের মতো ৩৪ কর্মকর্তাকে বদলি ও ওএসডি করা হয়। তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে একই কর্মস্থলে থাকা ১৮ জনকে ওএসডি এবং ২৬ জনকে নতুন পদে পদায়নের মধ্য দিয়ে শিক্ষা প্রশাসনে বড় ধরনের রদবদল করা হয়। ওই রদবদলের পর আরও কিছু পদে রদবদল করা হতে পারে বলে ধারণা করছিলেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছিল। এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার আবারও ৯৯ শিক্ষক-কর্মকর্তাকে বদলি ও ওএসডি করা হলো। গত ২৪ মার্চের আদেশে বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্তদের ভালো পদে বসানোয় সংক্ষুব্ধরা লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির কয়েকজন সদস্যের কাছে। সিন্ডিকেটের অন্য সদস্যদের বদলি ও ২৪ মার্চের আদেশ রিভিউ দাবি করেন তারা।

শিক্ষা বিভাগের আলোচিত বাড়ৈ সিন্ডিকেটের হোতা সাবেক শিক্ষামন্ত্রীর সাবেক এপিএস মন্মথ রঞ্জন বাড়ৈ। সিন্ডিকেট তৈরি করে নানা ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে ওই এপিএসের বিরুদ্ধে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে এপিএসের পদ থেকে তাকে সরানো হয়েছিল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত