দানের সংস্কৃতি বনাম আমাদের কোটিপতিদের মন

আপডেট : ০১ জুন ২০১৯, ১১:৪৫ পিএম

মানুষ শুধু অর্থ উপার্জন, শ্রম শোষণই করে না, দান-খয়রাতও করে। দান করাও মানুষের এক সহজাত বৈশিষ্ট্য। যার সামর্থ্য আছে, সে গরিব-দুঃখীকে সাহায্য করেন। এই সাহায্য বা দানের পেছনে আছে অনেক ধরনের মনস্তত্ত্ব। ধর্মমত অনুযায়ী, প্রাচুর্যের পঞ্চসূত্রের একটি হলো দান। কারণ, দানের মাধ্যমে যখন সম্পদ বা অর্থ হস্তান্তরিত হয়ে সাময়িক শূন্যতা সৃষ্টি হয়, তখন তা পূরণের জন্যে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই অর্থের গতিশীলতা সৃষ্টি হয় এবং অর্থাগম ঘটে। প্রাচুর্যের ক্ষেত্রে দান পাঁচভাবে ভূমিকা পালন করে। প্রথমত, দান উপার্জনকে শুদ্ধ করে। কারণ উপার্জন করতে গিয়ে জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে যে অন্যায় হয়, অতিরঞ্জন হয় দান সে অন্যায়কে কাটায়। দ্বিতীয়ত, দান পাপমোচন করে। তৃতীয়ত, দান করায় মন পবিত্র হয়, এতে রোগ-ব্যাধি কম হয়। চতুর্থত, দান দারিদ্র্য বিমোচন করে ও দাতার অন্তরে তৃপ্তি প্রদান করে। পঞ্চমত, দান সম্পদে বরকত দেয়।

অনেকে আবার ট্যাক্স-থেকে রেয়াত পাওয়ার জন্যও দান-খয়রাত করেন। বড় বড় ধনী ও তারকারা এ ধরনের দান বেশি করেন। বিশ্বের শীর্ষ ধনী বিল গেটস ও ওয়ারেন বাফেটের উদ্যোগে গড়ে উঠেছে জনকল্যাণমূলক একটি সমিতি, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘দ্য গিভিং প্লেজ’। অর্থাৎ দানের অঙ্গীকার। এই সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছেন বিশ্বের শতাধিক শীর্ষ ধনী ব্যক্তি, যাদের বিলিয়নিয়ার বলা যায়। বেঁচে থাকতে বা মারা যাওয়ার পর নিজেদের মোট সম্পদের কমপক্ষে অর্ধেকটা দান করা হবে, এই অঙ্গীকার করেছেন তারা। অবশ্য এতে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। যদিও বড়লোকদের এই ধরনের দান করার মানসিকতাকে সমালোচকরা বাঁকা চোখেই দেখেন। তাদের মতে, বড়লোকদের দান হলো দুর্বলদের সঙ্গে সংহতি প্রতিষ্ঠার একটা বাহ্যিক লক্ষ্য।  তবে আসল উদ্দেশ্যটা হলো প্রভাব বিস্তার করা ও নিজের সম্পর্কে একটা ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরা।  কারণ যাই হোক, দানকে খারাপ বলা যাবে না। দানের টাকায় অনেক মানুষের কল্যাণ হয়। অনেক ভালো কিছুও হয়।

সম্প্রতি ফ্রান্সের নটর ডেম ক্যাথিড্রালে অগ্নিকাণ্ডের ফলে বিশ্বের একটি সুবিখ্যাত ইমারত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইমারতটি ৮৫০ বছরেরও বেশি পুরনো। এটি তৈরি করতে সময় লেগেছিল দেড়শ বছরেরও বেশি। এটির স্থাপত্য এবং বয়স বাদ দিলেও এর মধ্যে যে সব সামগ্রী ছিল সেগুলোর জন্যও নটর ডেম বিশেষ ভাবে বিখ্যাত। যেমন ধরা যাক, সেই ‘কাঁটার মুকুট’টি, যেটি রোমানরা যিশুখ্রিস্টকে অত্যাচার করে হত্যা করার সময় তৈরি করেছিল। আগুন লাগার পর ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই সে দেশের নাগরিকরা এই গৌরবোজ্জ্বল ইমারতটির জন্য অর্থ সাহায্যে এগিয়ে এসেছেন। প্রথম সপ্তাহেই ফরাসি কোটিপতিরাই দান করেছেন প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। অর্থের পরিমাণ নিঃসন্দেহে আরও বাড়বে। মহৎ উদ্দেশ্যে দানধ্যান করা পশ্চিমে কোনো নতুন বিষয় নয়। ১৯৮৫ সাল থেকে ব্রিটেনে বিবিসি একটা বাৎসরিক অনুষ্ঠান করে থাকে, ‘কমিক রিলিফ’, ইথিওপিয়ার দুর্ভিক্ষে আক্রান্তদের জন্য অর্থ সংগ্রহের লক্ষ্যে। এই টেলিভিশন অনুষ্ঠানটি সন্ধ্যায় শুরু হয়ে রাত তিনটে নাগাদ শেষ হয়। কমেডি শো চলতে থাকে একের পর এক। নিউজ অ্যাঙ্কররা নিজেদের নিয়ে হাসাহাসি করেন তাতে। টিভি প্রেজেন্টার এবং চিত্রতারকারা জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশে তাতে অংশগ্রহণ করেন।  বিশেষ উপস্থিতি থাকে সংগীত শিল্পীদের, তারা তাদের সময় এবং একটি করে গান দান করেন। এ সবই লাইভ সম্প্রচারিত হয় টিভিতে। আম-জনতাও একটি সম্প্রচারিত নম্বরে ফোন করে অর্থ দান করতে পারেন। এই অনুষ্ঠানটি শুরু হওয়ার পর থেকে, সাধারণ মানুষের ছোট ছোট অঙ্কের অর্থসাহায্য থেকেই ৯ হাজার কোটি টাকা তুলতে পেরেছে।

অনুরূপ আরও একটি অনুষ্ঠান চালায় বিবিসি ‘চিলড্রেন ইন নিড’। সেটির লক্ষ্য, ব্রিটেন জুড়ে যে এতিমখানা ও সেরে ওঠার সম্ভাবনাহীন রোগে আক্রান্ত শিশুদের জন্য চালানো প্রতিষ্ঠান আছে, তাদের জন্য এবং বিশেষভাবে শিশুদের হাসপাতালের সাহায্যার্থে অর্থ সংগ্রহ করা। ১৯৮০ সাল থেকে চলছে এই অনুষ্ঠান। এ অনুষ্ঠানও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ৯ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। মহৎ উদ্দেশ্যে দানধ্যানের ক্ষেত্রে বিশ্বে সবার চেয়ে এগিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৮ সালে মাত্র ১০ জন ব্যক্তিই দান করেছিলেন ১ হাজার ২০ কোটি ডলার। তাদের মধ্যে কয়েকজনের দানের তালিকাটা এ রকমÑ মাইক্রোসফ্টের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেট্স : ৩ হাজার কোটি টাকা, ফেইসবুকের মার্ক জাকারবার্গ : ১০০০ কোটি টাকা এবং ডেল কম্পিউটারের মাইকেল ডেল : ৬শ কোটি টাকা।  বিশেষভাবে অর্থ সাহায্য মেলে শিক্ষাক্ষেত্রে এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় এ ক্ষেত্রে সব থেকে বেশি সাহায্য পেয়ে থাকে। ২০১৫ সালে কোটিপতি জন পলসন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য ২ হাজার ৭শ কোটি টাকা দান করেন। ২০১৪ সালে হার্ভার্ড স্কুল অফ পাবলিক হেল্থ-কে ২ হাজার ৪শ কোটি টাকা দান করেন হংকংয়ের ধনকুবের জেরাল্ড চ্যান।

কিন্তু দানধ্যানের সংস্কৃতির নিরিখে আমাদের দেশ অনেক পিছিয়ে। এক হিসাব মতে, আমাদের দেশে খানাপ্রতি মাত্র ১ দশমিক ৭ শতাংশ কোনো জনকল্যাণকারী প্রতিষ্ঠানে দান করে। এর মধ্যে ৩৫ শতাংশ আবার দান করেন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে। আমাদের দেশের মানুষ তাদের মাথাপিছু ব্যয়ের গড়ে ৯ শতাংশ ব্যয় করেন ধর্মীয় কারণে। আবর্জনা পরিষ্কার বা শৌচব্যবস্থায় ব্যয় হওয়া অর্থের থেকেও এই অর্থের পরিমাণ বেশি। আমাদের দেশের করপোরেটগুলোর কল্যাণমূলক কাজে অর্থব্যয় করার বাধ্যবাধকতা আছে। যা ‘করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি’ বা ‘সিএসআর’ নামে পরিচিত। বহু করপোরেট সংস্থাই নিজেদের এনজিও গঠন করেছে। সেই সংস্থার কর্ণধাররা বা তাদের স্ত্রী-পুত্ররাই এই সব এনজিওরও কর্তাব্যক্তি হন। এই অদ্ভুত ব্যবস্থা সন্দেহের এবং বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। সাধারণত বিভ্রান্তির আড়ালেই জালিয়াতি লুকিয়ে থাকে। করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটির নামে ‘স্বজন-পোষণ’ ও ‘ক্ষমতাবান-তোষণ’ ছাড়া কাজের কাজ বড় বেশি হয় বলে মনে হয় না।

বিশ্ব অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান এখন বিশ্বের ৪১তম। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মতে, দেশে বর্তমানে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা ৭৫ হাজার ৫৬৩ জন। কিন্তু এখানে জনকল্যাণের লক্ষ্যে ব্যয় করা হয় খুবই সামান্য। বাংলাদেশের সামনে এখন প্রধান কর্তব্যই হলো দারিদ্র্য দূরীকরণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার ব্যক্তিদের পরিস্থিতির উন্নতি, শিক্ষার প্রসার এবং সুস্বাস্থ্য সুনিশ্চিত করা।  আমাদের দেশের এনজিওগুলো এখনো বিদেশ নির্ভর। সরকারি অর্থ তারা বড় বেশি পায় না।  বড়লোকদের টাকাও না। বহু কোটিপতি এবং সিএসআর থাকা সত্ত্বেও আমাদের দানধ্যানের সংস্কৃতি মোটেই উল্লেখযোগ্য নয়। আমরা অর্থনৈতিক উন্নয়নে দ্রুত এগিয়ে যেতে পারি যদি বড়লোকরা দানশীল হন। কিন্তু বিত্তবানদের সামাজিক চেতনার নিরিখে আমরা এখনো অতিদরিদ্র, তৃতীয় বিশ্বই রয়ে গেছি!

লেখক : লেখক ও কলামনিস্ট

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত