প্রবৃদ্ধির জন্য বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে

আপডেট : ০২ জুন ২০১৯, ১২:৫৯ এএম

আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে কোন কোন খাতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত, তা দেশ রূপান্তরের কাছে প্রকাশ করেছেন সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বাজেট প্রণয়নকারী ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, বাজেটে এমন সব ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে হাত গুটিয়ে রাখা বেসরকারি খাত বিনিয়োগে আগ্রহ দেখায়। দারিদ্র্য হ্রাসে করণীয়, কর-জিডিপির অনুপাত বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক মামুন আব্দুল্লাহ

আসন্ন বাজেটে কোন কোন বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত?

বাজেট হলো সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব। এখানে কোথা থেকে রাজস্ব আয় করছি, কোন খাতে ব্যয় করছি, কোন সূত্র থেকে ঘাটতি অর্থায়ন করছি এগুলো গুরুত্বপূর্ণ। এখন উন্নয়নের গতি আনতে  মোট দেশজ উৎপাদন জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হবে। এখন যা হচ্ছে, সেটা ভালো। কিন্তু প্রশ্নবিদ্ধ। তবে এটা যদি ৭.৫ শতাংশও হয়, সেটা সন্তোষজনক। 

তিনি বলেন, সামষ্টিক অর্থনীতির আরেকটি বিষয় হচ্ছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আরও কমিয়ে আনা। এখন যে বিষযগুলো জরুরি তার মধ্যে প্রথম হলো বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকে ত্বরান্বিত করা। প্রবৃদ্ধির জন্য বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিনিয়োগে প্রতিকূলতাগুলো দূর করতে হবে। প্রতিকূলতার মধ্যে জমি, জ¦ালানি, গ্যাস, ডুয়িং বিজনেস, গভর্ন্যান্সের ক্ষেত্রে আমাদের অনেক সমস্যা রয়ে গেছে। এই বিষয়গুলো কীভাবে সমাধান করা যায় দেখতে হবে।

শিগগিরই জমির ক্ষেত্রে (১০০ ইকোনমিক জোন) ও জ¦ালানি সমস্যা সমাধানে হয়তো গতি আসবে। কিন্তু অবকাঠামোÑ বিশেষ করে পরিবহন খাতে আমাদের অবস্থা খুব খারাপ। গভর্ন্যান্স ও ডুয়িং বিজনেসে আমাদের অনেক সমস্যা আছে। এগুলোর সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ নিশ্চিতকরণ।

আর কোন বিষয়টি গুরুত্ব দেবেন?

আরেকটি সমস্যা আছে আয় বৈষম্য দূরীকরণ ও দারিদ্র্য বিমোচনে বেকার সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া। অনেকে বেকার না বলা হচ্ছে, কিন্তু তারা অনুৎপাদনশীল খাতে শ্রম দিচ্ছে। অল্প আয় করলেই বা এক ঘণ্টা কাজ করলেই তাকে বেকার বলা হচ্ছে না। কিন্তু কীভাবে মানসম্মত প্রকৃত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যায় সেটার ব্যবস্থা নিতে হবে।

চলমান শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে?

একটা উদ্বেগের বিষয় হলো দেশে শিক্ষিত বেকারের সমস্যা অনেক বেশি হারে বাড়ছে। এর অর্থ হলো তাদের শিক্ষার মান অতি নিচুমানের। যে ধরনের দক্ষ জনশক্তি বা কোয়ালিফিকেশনের প্রয়োজন সেটা তারা পূরণ করতে পারছে না। এই শিক্ষাব্যবস্থাকে কীভাবে ঢেলে সাজিয়ে মানুষ যে ধরনের শ্রমশক্তি চায়, সে ধরনের শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে; যেন তাদেরকে সত্যিকার অর্থে মানবসম্পদে রূপান্তর করা যায়, সেটা দেখতে হবে।

তিনি বলেন, এখানে একটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ প্রাইমারি পর্যায়ে আমাদের ১০০ শতাংশ শিশু স্কুলে যাচ্ছে। কিন্তু উচ্চ শিক্ষায় আসতে আসতে সিংহভাগ ঝরে পড়ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতেও আমাদের উচ্চ শিক্ষায় প্রবেশের হার মাত্র ১৩ শতাংশ। এশিয়ার ১২টি দেশের মধ্যে উচ্চ শিক্ষায় শুধু পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে আছি আমরা। পাকিস্তানের হার ১০ শতাংশ। অন্য সব দেশ আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে। এটার কারণ খুঁজে বের করতে হবে। এ জন্য উচ্চপর্যায়ে শিক্ষার সম্প্রসারণ করা, শিক্ষার মান বাড়ানো, শিক্ষার কারিকুলাম সাজিয়ে পুনর্বিন্যাস করে কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে, তা বাজেটে উল্লেখ করা উচিত।

স্বাস্থ্য খাতের বিষয়ে কী বলবেন?

স্বাস্থ্যসেবা নিয়েও ভাবতে হবে। কারণ অনেক গরিব মানুষ আছে, যারা চেষ্টা করে দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠছে। কিন্তু পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসাসেবা নিতে গিয়ে আবার গরিব হচ্ছে।

দারিদ্র্য কমানোর বিষয়ে কী করা উচিত বলে মনে করেন?

এখন বড় চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছে। দেখা যায়, ২০০০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত হিসাবে, দারিদ্র্য বিমোচনের বাৎসরিক গড়হার ক্রমশ কমে আসছে। এই প্রবণতাকে আমাদের বন্ধ করতে হবে। সেটার জন্য স্বাস্থ্য-শিক্ষা খাতে বেশি বিনিয়োগ, শিক্ষাব্যবস্থাকে বাজারমুখী করার প্রতি নজর দিতে হবে।

এর আগে জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে প্রশ্নবিদ্ধ বলছেন। কেন?

এ জন্য বলছি যে, অন্যান্য সূচকের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আগেই উল্লেখ করেছি, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ ক্রমেই কমে আসছে, বিনিয়োগ ছাড়া প্রবৃদ্ধি হয় না। সরকার বলছে, সরকারি বিনিয়োগের কথা। কিন্তু সরকারি বিনিয়োগে রিটার্ন সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যায় না। সরকারি বিনিয়োগের উদ্দেশ্য হচ্ছে, বেসরকারি বিনিয়োগকে ক্রাউডিং করা। অর্থাৎ বেসরকারি বিনিয়োগকে একটা সহায়ক ভুমিকা পালন করা। সেটা তো বেশি অগ্রসর হতে পারছে না। যেমন এখন রূপপুর পাওয়ার প্ল্যান্টে বিনিয়োগ হচ্ছে, কিন্তু এখন তো এনার্জি পাচ্ছি না।    

তিনি বলেন, রেমিট্যান্সের গ্রোথ মোটামুটি ভালো, কিন্তু গত অর্থবছরের তুলনায় কম। রপ্তানি খাত এ বছর মোটামুটি ভালো। তারপর মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি নেতিবাচক। এ জন্য ম্যাক্রো ইকোনমির যে বিষয়গুলো আছে, তার সঙ্গে ৮.১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি সামঞ্জস্য না বলেই মনে হয়।

দুর্নীতির বিষয়ে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে তা কি যথেষ্ট?

কিছুদিন আগেও এন্টিকরাপশন কমিশন বেশ কিছুটা অ্যাকটিভ ছিল। কিছু ব্যবস্থা নেওয়াও হচ্ছে। তবে এটা ঠিক, বিশ^ব্যাংকের গভর্ন্যান্স ইন্ডিকেটরে দুর্নীতি একটি উপাদান। সেখানে আমাদের অবস্থান এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। মনে করি, দুর্নীতির ব্যাপারে নিশ্চয় বেশি সক্রিয় হওয়ার বিষয় আছে।

অর্থ পাচার থামছে না। কী পরামর্শ দেবেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক, এনবিআর, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বিতভাবে একটা ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। সম্প্রতি এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, আমাদের দেশে অর্থ পাচার হয় মূলত ফরেন ট্রেডের মাধ্যমে। আমদানিতে ওভার ইনভয়েসিং আর রপ্তানিকে আন্ডার ইনভয়েসিং করে এই অর্থ পাচার হচ্ছে। কাজেই এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, এনবিআরের একটা বিরাট ভূমিকা রয়েছে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য।

করহার কম। কীভাবে বাড়ানো যায়?

ট্যাক্স জিডিপি রেসিও বাংলাদেশে মাত্র ১০ শতাংশ। টোটাল রেভিনিউ মাত্র জিডিপির ১২ শতাংশ। নেপালের রেভিনিউ জিডিপি ২০ শতাংশ। কিন্তু মাথাপিছু আয় হচ্ছে তিন ভাগের দুই ভাগ। নিঃসন্দেহে আমরা সরকারের রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে প্রচ- ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছি। করণীয় হলোÑ হার না বাড়িয়ে করের জাল সম্প্রসারণ করার প্রতি নজর দিতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত