৫ জুন, বিশ্বের ১০০টির মতো দেশে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে পালন করা হয় বিশ্ব পরিবেশ দিবস। পরিবেশ দূষণের বিভিন্ন কারণ, আর্থিক ক্ষতি, স্বাস্থ্যগত সমস্যা এবং পরিত্রাণের উপায় প্রভৃতি বিষয়ে মানুষকে সচেতন করে তোলাই এ দিবসটি পালনের অন্যতম উদ্দেশ্য। এবারের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘বায়ুদূষণ’। দিবসটি উদ্যাপনের জন্য চীনকে স্বাগতিক দেশ হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে। বায়ুদূষণের কারণে পৃথিবীতে প্রতি বছর প্রায় ৭০ লাখ মানুষের অকাল মৃত্যু হচ্ছে। এর মধ্যে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেই মৃত্যু হচ্ছে ৪০ লাখ মানুষের। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা নির্ধারিত ক্ষতিকর মাত্রার হিসাবে পৃথিবীর প্রতি ১০ জন মানুষের ৯ জনই দূষিত বায়ুর সংস্পর্শে আসছে। সে বিবেচনায় এবারের প্রতিপাদ্য অত্যন্ত সময়োপযোগী। স্বাভাবিক বায়ুম-লে অনাকাক্সিক্ষত উপাদানের অতিরিক্ত মাত্রার উপস্থিতির কারণে উদ্ভিদ, প্রাণী বা মানুষের ক্ষতি হলে বা ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিলেই বলতে হবে বায়ুদূষণ ঘটছে।
বায়ুদূষণ নিয়ে কাজ করে এমন একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার’ বলছে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বাসিন্দাদের ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ কোনো না কোনোভাবে বায়ুদূষণের মধ্যে বাস করছে। এসব দেশের মধ্যে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ বায়ুদূষণ এলাকায় বসবাস করে। বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে প্রতি বছর মারা যায় ১ লাখ ২৩ হাজার মানুষ। আর ভারত ও চীনে মারা যায় ১২ লাখ মানুষ। বায়ুদূষণের কারণে যে ১০টি দেশের মানুষ বেশি মারা যাচ্ছে, সে-সব দেশের মধ্যে রয়েছে চীন, ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ, নাইজেরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র । সংস্থাটি বলছে সড়ক দুর্ঘটনা বা ধূমপানের কারণে মৃত্যু হারের তুলনায় বায়ুদূষণের ফলে বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে। এর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। বায়ুদূষণের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে প্রতিটি শিশুর ৩০ মাস করে আয়ু কমে যাচ্ছে। অথচ উন্নত দেশগুলোতে এ হার গড়ে ৫ মাসের কম। দীর্ঘদিন দূষিত বাতাসের মধ্যে বসবাস করলে হৃদরোগ, কাশি, নিউমোনিয়াসহ ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদি রোগ, ফুসফুসের সংক্রমণ, ডায়াবেটিস, অ্যাজমা ও শ্বাসকষ্টজনিত নানা রোগ, স্ট্রোক, চোখে ছানি পড়া এবং শিশু ও গর্ভবতী নারীদের সমস্যা হতে পারে। একটি প্রজন্ম যদি দীর্ঘ সময় বায়ুদূষণের মধ্যে কাটিয়ে দেয়, তার মারাত্মক প্রভাব পড়ে পরবর্তী প্রজন্মের ওপর।
বায়ুদূষণ কমানো গেলে অন্তত পাঁচভাবে উপকৃত হবে বাংলাদেশ। এক. বায়ুদূষণ কমানো গেলে মানুষের গড় আয়ু এক বছর তিন মাস বৃদ্ধি পাবে। দুই. বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি রোধ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিকূল প্রভাব মোকাবিলায় বায়ুদূষণ রোধ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিন. বায়ুদূষণ হ্রাস পেলে বিভিন্ন জটিল রোগের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাবে দেশের মানুষ। এতে স¦াস্থ্য সুরক্ষা খাতে ব্যয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে যাবে। চার. বায়ুদূষণ হ্রাস পেলে দেশে প্রতিবন্ধী শিশু জন্মের হারও অনেক হ্রাস পাবে। পাঁচ. বায়ুদূষণ কমানো গেলে একদিকে যেমন মানুষের অসুস্থতা কমবে, গড় আয়ু বাড়বে, সময় সাশ্রয় হবে, পাশাপাশি বেড়ে যাবে জিডিপির প্রবৃদ্ধি।
অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ইটভাটা, কলকারখানা ও যানবাহনের ক্ষতিকর কালো ধোঁয়া, সেই সঙ্গে শহরের প্রচুর ধুলা এবং নির্মাণকাজের জন্য বাংলাদেশে বেশি বায়ুদূষণ হচ্ছে। পুরাতন যানবাহন ও ট্রাফিক জ্যামের কারণে গাড়িগুলো রাস্তায় অতিরিক্ত সময় ব্যয় করার ফলে অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ ও ক্ষতিকর ধোঁয়া নির্গতের পরিমাণ বাড়ছে। নিয়মিত রাস্তায় পানি দিয়ে ধুলা নিয়ন্ত্রণ, উন্নত পদ্ধতিতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সনাতন পদ্ধতির ইটভাটার পরিবর্তে আধুনিক পরিবেশবান্ধব ইটভাটা তৈরি, ইটের পরিবর্তে ব্লকের ব্যবহার, নির্মাণ সামগ্রী ঢেকে রাখা, পরিকল্পিতভাবে কলকারখানাগুলোর ধোঁয়া কমিয়ে আনা, কয়লার ব্যবহার হ্রাস, যেখানে সেখানে শিল্পকারখানা স্থাপন না করে নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক অঞ্চল বা শিল্প পার্ক স্থাপন, ট্রাফিক জ্যামের সমাধান, উন্নত জ্বালানি ব্যবহার, এয়ার কন্ডিশনারের কম ব্যবহার ইত্যাদি ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে বায়ুদূষণের মাত্রাকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমিয়ে আনা সম্ভব। গাছ বায়ুদূষণ প্রতিরোধে জোরালো ভূমিকা পালন করে। তাই বায়ুদূষণ রোধে খুবই প্রয়োজন বেশি করে বনায়নে মনোযোগ বাড়ানো। অন্যদিকে পরিকল্পিত আবাসন ও আবাসিক এলাকায় উদ্যান তৈরি এবং পুকুর খননের মাধ্যমেও বায়ুদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে কিছুটা রক্ষা পাওয়া যায়।
এবারের বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে গত পহেলা জুন রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘বাতাস দূষণ : আমাদের করণীয় ও পদক্ষেপ’ শীর্ষক সেমিনারে সাবেক কৃষিমন্ত্রী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘বরেন্দ্র অঞ্চলে যেখানে সেখানে ডিপ টিউবওয়েল বসানোর ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ১০ কিলোমিটার নিচে নেমে গেছে। এক কেজি চাল উৎপাদনে ৩ হাজার ২০০ লিটার পানি ব্যয় করতে হয়। তাই ভুট্টাসহ যে-সব ফসল উৎপাদনে পানির ব্যবহার কম, সে-সব ফসল উৎপাদনে কৃষকদের উৎসাহিত করতে হবে এবং এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।’
বায়ুদূষণ কমানো এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গাছপালা ও বনায়নের গুরুত্ব উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, দেশে তাপামাত্রা কমানোর সক্ষমতাসম্পন্ন অনেক গাছপালা রয়েছে। এসব গাছপালা এমনিতেই জন্মে। কিন্তু সেই গাছগুলো কেটে একাশিয়া ও ইউক্যালিপটাস গাছসহ বিভিন্ন বিদেশি গাছ রোপণ করা হচ্ছে। এই বিদেশি গাছগুলো শুধু নগর নয়, গ্রাম দখল করতে শুরু করেছে। এসব গাছের নেতিবাচক প্রভাবে গাছের ডাব পর্যন্ত শুকিয়ে যাচ্ছে। এসব গাছে কোনো পাখি বসে না। ভারতের রাজধানী দিল্লিতে শুধু নিমগাছ রোপণের মাধ্যমে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা হ্রাস করা সম্ভব হয়েছে। তাই আমাদের দেশেও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এসব বিদেশি গাছের পরিবর্তে নিমসহ বিভিন্ন দেশীয় গাছ রোপণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
বিদেশি আকাশমণি ও ইউক্যালিপটাস গাছ যে কত ক্ষতিকর তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক শামীম শামসীরের বক্তব্য থেকেই উপলব্ধি করা যায়। তিনি বলেন, ইউক্যালিপটাস গাছ পরিবেশের জন্য খুবই ক্ষতিকর। জ্বালানি কাঠ হিসেবে ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণি গাছের মূল্য থাকলেও এসব গাছ মাটির গভীর থেকে শিকড়ের সাহায্যে প্রচুর পানি শোষণ করে পরিবেশ ও প্রতিবেশের মারাত্মক ক্ষতি সাধন করে। এসব বিদেশি গাছ মাটির উর্বরতা শক্তি হ্রাস করে। এমনকি এসব গাছে কোনো পাখিও বাসা বাঁধে না। সরকারের উচিত পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বিদেশি গাছ উঠিয়ে সেখানে দেশীয় প্রজাতির পরিবেশবান্ধব বৃক্ষ রোপণ করা।
রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা ও ঠাকুরগাঁও জেলার রাস্তার ধারে, বসতবাড়ির আশপাশে, জমির আইলে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এ জাতীয় গাছ ব্যাপকভাবে রোপণ করছে মানুষ। শুধু রংপুর, দিনাজপুর কেনÑ ঢাকা, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলসহ সারা দেশে চলছে এই সর্বনাশী পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকা-। দেখা গেছে, উত্তরাঞ্চলের হাটবাজারে বিক্রি হওয়া গাছের চারার শতকরা ৬০ থেকে ৭০ ভাগই হচ্ছে ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণি। দেশের অন্যান্য এলাকাতেও এসব আগ্রাসী গাছের চারা বিক্রির সংখ্যাও কম নয়। জমির আইলে ইউক্যালিপটাস গাছ রোপণ করলে পানির অভাবে ওই খেতের ফসলের ফলন ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়।
ইউক্যালিপটাস গাছকে বা হয় সৌর নলকূপ। কারণ এ গাছটি মাটি থেকে প্রচুর পানি গ্রহণ করে এবং প্রস্বেদন প্রক্রিয়ায় তা বায়ুম-লে ছেড়ে দেয়। একটি ইউক্যালিপটাস গাছ দিনে বায়ুম-লে প্রায় ৫০ লিটার পানি ত্যাগ করে। পাকিস্তানে একটি পাহাড়ি গ্রামে ১৯৯৫ সালে ইউক্যালিপটাস গাছের বন সৃষ্টি করা হয়েছিল। ২০০০ সালে মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে ওই গ্রামের পানির স্তর ৩ ফুট নিচে নেমে যায়। সেখানকার পাহাড়ি ঝরনার পাশে ইউক্যালিপটাস গাছ রোপণের ফলে ৮০ শতাংশ ঝরনার পানি শুকিয়ে যায়। সেই এলাকায় বার্ষিক বৃষ্টিপাতও ৫ বছরে ২ ইঞ্চি কমে যায়। ভুট্টা ক্ষেতের পাশে ইউক্যালিপটাস গাছ রোপণের কারণে ইথিওপিয়ায় ভুট্টার ফলন হেক্টরপ্রতি ৪.৯ থেকে ১৩.৫ টন হ্রাস পায়। সম্প্রতি আফ্রিকার দেশ কেনিয়াতে ইউক্যালিপটাস গাছ রোপণ নিষিদ্ধ করেছে দেশটির সরকার। এ ব্যাপারে কেনিয়ার পরিবেশমন্ত্রীর কথাÑ ইউক্যালিপটাস গাছ পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। এ গাছে শুধু পাখি নয়, প্রজাপতিও বসে না। এ গাছের পাশে অন্য কোনো গাছ বা বন্যপ্রাণী বেঁচে থাকতে পারে না।
১৯৩০ সালে বাংলাদেশে প্রথম বিচ্ছিন্নভাবে চা বাগান এলাকায় এই সর্বনাশী বিদেশি ইউক্যালিপটাস গাছ লাগানো হয়, যা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে বর্তমানে পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য এক বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই আর বিলম্ব না করে বিদেশি আগ্রাসী গাছÑ ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণির ব্যাপারে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের চেয়ারম্যান আবু নাসের খানের কথা হলোÑ আমরা দীর্ঘদিন ধরে সরকারকে বলে আসছি রাস্তার পাশে বা বনায়নে বিদেশি গাছের পরিবর্তে দেশীয় গাছ লাগানো হোক। কিন্তু কেউ আমাদের কথায় কর্ণপাত করছে না।
এবারের পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য অনুসারে বায়ুদূষণ মোকাবিলা করার জন্য দূষণের প্রধান কারণগুলো দূর করার স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি দেশব্যাপী নতুন বনায়ন ও ব্যাপক বৃক্ষরোপণের কর্মসূচি নিয়ে পরিবেশের মধ্যেই প্রাকৃতিকভাবে বায়ুদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব কমিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা যেতে পারে। দেশের মানুষকে সচেতনভাবে পরিবেশবান্ধব দেশীয় নানা প্রজাতির গাছ লাগাতে উৎসাহিত করতে হবে এবং সরকারিভাবে উদ্যোগ নিয়ে অবিলম্বে সড়ক-মহাসড়কসহ অন্যান্য স্থানে ইউক্যালিপটাস, একাশিয়াসহ এমন বিদেশি ক্ষতিকর গাছ লাগানো বন্ধ করতে হবে। যেখানে সম্ভব এসব ক্ষতিকর গাছ কেটে ফেলে পুনরায় দেশি গাছ রোপণ করতে হবে। বিশ^ পরিবেশ দিবসকে ঘিরে এমন একটি আপাত ছোট লক্ষ্যও বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘমেয়াদে তা সুদূরপ্রসারী ফল নিয়ে আসবে।
