চলে গেলেন গিরিশ কারনাড। ভারতীয় থিয়েটার এবং চলচ্চিত্রের এই কিংবদন্তি এমন এক সময়ে চলে গেলেন যখন তাদের মতো ব্যক্তিরা যে বহুত্ববাদী ও অসাম্প্রদায়িক ভারতের চিত্রপট নিজেদের মনন মানসিকতায় লালন-পালন করতেন এবং তাদের কর্মকা-ের ক্যানভাসে বিমূর্ত করে তুলতেন, তা চরম বিপন্নতার মুখোমুখি। বিজেপির মতো হিন্দুত্ববাদের ধ্বজাধারী দলের আবারও ভারতীয় শাসনক্ষমতায় আসীন হওয়া এবং মোদির মতো সাম্প্রদায়িক চূড়ামণির নেতৃত্বে টানা দ্বিতীয়বারের মতো সরকার গঠন ভারতীয় রাষ্ট্রের যে অসাম্প্রদায়িক চরিত্র, তাকে যে মারাত্মক হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। এমন এক সময়ে গিরিশের চলে যাওয়া মানে ভারতীয় বহুত্ববাদী সংস্কৃতির একটি বড় কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হয়ে যাওয়া। বিশেষ করে ভারতের চিরায়ত সংস্কৃতি ও ইতিহাসের ওপর যে বড় ধরনের আঘাত অব্যাহত আছে তাকে মোকাবিলা করার একটি বড় অস্ত্র চিরতরে থেমে গেল। স্বাধীনতা-উত্তর ভারতের নাট্যজগতে সবচেয়ে শক্তিশালী চিত্রনাট্যকার হিসেবে আবির্ভাব ঘটেছিল গিরিশের। টানা পাঁচ দশক ধরে দেশটির নাটককে যে উচ্চতায় তিনি নিয়ে গিয়েছেন, তার স্বীকৃতি তিনি পেয়েছেন নিজের জীবদ্দশাতেই। অসংখ্য পুরস্কার তো তার ঝুলিতে জমা পড়েছিল, উপরন্তু পেয়েছিলেন দর্শকদের প্রচন্ড ভালোবাসা। অনেকেই তার নাট্যকর্মের ওপর করেছেন গবেষণা। তার বেশ কয়েকটি নাটকে ভারতীয় ইতিহাস আর মিথের যে শক্তিশালী অবস্থান এবং পাশ্চাত্য নাটক বিশেষ করে ইংরেজি নাট্যধারার যে উদ্ভাবনী উপস্থিতি তা বিমোহিত করেছে বিশ্বের সমস্ত নাট্যপ্রেমীকে। ভারতীয় লোককথার ওপর ভিত্তি করে তার অসংখ্য নাটক ইংরেজি ভাষায় ভারতীয় নাটককে এক উচ্চ মর্যাদার আসনে নিয়ে গেছে।
ভারতীয় নাট্যাঙ্গনে বাদল সরকার, মোহন রাকেশ এবং বিজয় তেন্ডুলকারের মতো মহারথী নাট্যকারদের পাশে সমভাবে উচ্চারিত হয়েছে গিরিশ কারনাডের নাম। আর এই অবস্থান তিনি তৈরি করতে পেরেছেন তার স্বকীয় বৈশিষ্ট্য দিয়ে। যখন তিনি তার নাটকে ইতিহাসকে টেনে এনেছেন তখন তা ওই সময়ের বৃত্তে আটকে না থেকে সমসাময়িকতাকে ছুঁয়ে গেছে। দর্শক কখনো অনুভব করবে না যে আজ থেকে কয়েকশ বছর আগের ঘটনা সে দেখছে। মনে করবে ঘটনাটি যেন এখনকারই। ১৫৬৫ সালে বিজয়নগর সাম্রাজ্য এবং চার সুলতানের মিলিত বাহিনীর যুদ্ধের কাহিনী অবলম্বনে গিরিশের রচিত ‘রক্ষা টানগাডি’ দেখে তেমনটাই অনুভূত হয়। আবার চতুর্দশ দশকের দিল্লির শাসক মুহাম্মদ বিন তুঘলকের চরিত্র অবলম্বনে তার লেখা ‘তুঘলক’ নাটকটি যখন পুনেতে মঞ্চস্থ হলো তার আটদিন আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী দেহরক্ষীদের হাতে নিহত হন। তুঘলককে নিয়ে নাটক অথচ দর্শকের অনুভব হচ্ছে এটা যেন ইন্দিরা গান্ধীর কাহিনী। ইতিহাসকে এইভাবে সমসাময়িকতার ফ্রেমে বাঁধতে পারতেন গিরিশ কারনাড। গিরিশের নাটকের চরিত্রগুলোর বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে ভারতীয় নাটকের বিশিষ্ট গবেষক পুনম পান্ডে লিখেছেন, ‘কারনাড মহাবিশ্বের সমস্ত কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে মানুষকে দেখতেন। তার স্বাধীনভাবে পছন্দ করার ক্ষমতাই জীবনের মোড় বদল করে দেয়। তিনি নিজেই নিজেকে গড়ে তোলেন। তার এই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য এবং অন্তর্মূখতাই মানুষের একাকিত্ব, যন্ত্রণা, বিচ্ছিন্নতা, শিকড়হীনতা, উদ্দেশ্যহীনতা, অর্থহীনতা, বহির্মুখিতা এবং পরিস্থিতির জন্য বিস্ময়কর হওয়ার মতো অভিব্যক্তিগুলোকে নাটকে ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করেছে।’
১৯৩৮ সালের ১৯ মে ভারতের মহারাষ্ট্রের মাথেরানে এক কনকানি-ভাষী ব্রাহ্মণ পরিবারে গিরিশ কারনাডের জন্ম। ১৯৫৮ সালে কর্নাটক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত এবং পরিসংখ্যানে স্নাতক সম্পন্ন করে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান বিলাতে। সেখানকার বিখ্যাত অক্সফোর্ডের ম্যাগডেলান থেকে রোডস স্কলার হিসেবে দর্শন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। তিনি আবার অক্সফোর্ডের ছাত্র সংসদের সভাপতি নির্বাচিত হন। আগে থেকে সাহিত্যিক হওয়ার লালিত স্বপ্ন আরও পরিণত হয় বিলাতের মাটিতে। তাই চেন্নাইতে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের মর্যাদার চাকরি ত্যাগ করে তিনি নিয়োজিত হন পুরোদস্তুর লেখালেখিতে।
মাইকেল মধুসূদন দত্তের মতো তারও ইচ্ছা ছিল ইংল্যান্ডের সাহিত্যাঙ্গনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার। কিন্তু তাকেও শেষ পর্যন্ত নিজের মাতৃভাষা কন্নড়ে লিখে খ্যাতি লাভ করতে হয়েছে। বিখ্যাত ইংরেজ কবি টি এস এলিয়ট তার এক প্রবন্ধে লিখেছিলেন যে রীতি ও প্রথার মধ্যে লেখকের বেড়ে ওঠা তাকে উপস্থাপন করতে পারলে সে কখনো শূন্যতা অনুভব করবে না। কারনাড তার প্রিয় কবির এই পরামর্শকে সাদরচিত্তে গ্রহণ করেছিলেন। যেমন তার বিখ্যাত নাটক ‘ইয়াতি’ মহাভারতের আদিপর্ব থেকে গ্রহণ করেছিলেন। আগেই বলা হয়েছে ‘তুঘলক’-এর উৎস। কাশীমেন্দ্রের ‘বিরাট কথা মঞ্জুরি’ এবং সোমাদেবের ‘কথাসরিৎসাগর’ থেকে সংস্কৃতি ভাষায় রচিত হয়েছিল ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’। আর তার যে ইংরেজি অনুবাদ টমাস মান করেছিলেন সেখানকার একটি মিথকে অবলম্বন করে কারনাড লিখেছেন ‘হায়াবদন’। মহাভারতের বনপর্বের ১৩৫-১৩৮ অধ্যায় অবলম্বনে তার আরেকটি বিখ্যাত নাটক ‘ফায়ার অ্যান্ড রেইন’ রচিত হয়েছে। তিনি প্রাচ্য ভারতের ইতিহাস এবং মিথের সঙ্গে মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন প্রতীচ্যের সাহিত্যের। বের্টল্ট ব্রেশট, আলবেয়ার ক্যামু, ইউজিন ও’ নিল এবং সার্ত্রের প্রভাব গিরিশের নাটকে বিস্তর। ‘তুঘলকে’ ক্যামুর ‘ক্যালিগুলা’র প্রভাব স্পষ্ট। আবার ওই নাটকের আজিজ এবং আজমের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায় ব্রেশটের ‘ওয়েটিং ফর গডো’র ভøাদিমির এবং এস্ট্রাগোনের সঙ্গে। ব্রেশটের ‘কমপ্লেক্স সিইং’ এবং ‘ন্যারেটর চরিত্র’ পদ্ধতির প্রয়োগ দেখা যায় ‘নাগাম-ল’ এবং ‘হায়াবদন’-এ। গিরিশ কারনাডের নাটকে তাই বলে সামাজিক এবং রাজনৈতিক বিষয় অনুপস্থিত ছিল, এটা মোটেই বলা যাবে না। ‘তুঘলক’ নাটকে তিনি নেহরীয় রাজনীতির যে ধারা ভারতে চলে আসছিল তারই রূপকল্প উপস্থাপন করেছেন। যখন ভারতে বাবরি মসজিদ বিতর্ক চলছে এবং জাতপ্রথা সংরক্ষণের ওপর মন্ডল কমিশনের প্রতিবেদন দাখিল হচ্ছে তখন তিনি দ্বাদশ শতাব্দীর কর্নাটকের একটি সংস্কার আন্দোলনের কাহিনী অবলম্বনে লিখলেন ‘তেলেডান্ডা’।
মঞ্চের সাফল্য তাকে এক সময় উদ্বুদ্ধ করল চলচ্চিত্রে প্রবেশ করতে। সেখানেও তিনি প্রভূত খ্যাতিলাভ করেন। ১৯৭০ সালে তিনি কন্নড় চলচ্চিত্র ‘সংস্কার’-এ অন্যতম মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেন। চলচ্চিত্রে তার অভিনয় সাফল্য এবার পরিচালনার দিকে আকৃষ্ট করতে থাকল। ১৯৭২ সালে তিনি যৌথ পরিচালনায় নির্মাণ করলেন ‘ভস্ম বৃক্ষ’। ১৯৭৭ সালে তার পরিচালনায় নির্মিত হলো আরেকটি কন্নড় সিনেমা ‘টাব্বালুই নান্দি মাগনে’। আকিরা কুরোসাওয়ার সামুরাই ফিল্ম দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি ১৯৭৮ সালে নির্মাণ করলেন ‘অনডান্ডু কালাডালি’ নামের অ্যাকশন ড্রামা। তিনি ১৯৭৭ সালে তার কন্নড় সিনেমা ‘টাব্বালুই নান্দি মাগনে’র হিন্দি সংস্করণ ‘গোধূলি’ চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন। ১৯৮৪ সালে তিনি নির্মাণ করেন ‘উৎসব’। তিনি ভারতীয় নিউ সিনেমা বা প্যারালাল সিনেমা আন্দোলনের একজন অন্যতম শক্তিশালী অভিনেতা হিসেবে ১৯৭০ এবং ৮০ এর দশকে আবির্ভূত হন। এর মধ্যে শ্যাম বেনেগালের ‘নিশান্ত’ ও ‘মন্থন’ এবং বাসু চ্যাটার্জির ‘স্বামী’ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া কারনাড জনপ্রিয় টিভি ধারাবাহিক ‘মালগুডি ডেস’-এ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি বোম্বে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিজে বাণিজ্যিক ধারার সিনেমায় অভিনেতা হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছিলেন। ২০০৫ সালের চলচ্চিত্র ‘ইকবাল’ এবং ২০১২ সালের চলচ্চিত্র ‘এক থা টাইগার’ এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। গিরিশ কারনাড ১৯৭৪ সালে রাষ্ট্রীয় পদক পদ্মশ্রী এবং ১৯৯২ সালে ‘পদ্মভূষণ’ লাভ করেন। তিনি ১০টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেছিলেন। এর মধ্যে ‘ভস্ম বৃক্ষ’ চলচ্চিত্র পরিচালনার জন্য শ্রেষ্ঠ পরিচালকের স্বীকৃতি লাভ করেন। ভারত যখন এক বিভাজনের রাজনীতির সন্ধিক্ষণে রয়েছে, যখন সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের প্রবল ঝড়ে ভারতীয় বহুত্ববাদ বিপন্ন, ঠিক তখনই গিরিশ কারনাডের মতো অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের চলে যাওয়া দেশটির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।
লেখক : সাংবাদিক
