রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বহুপক্ষীয় চেষ্টা জোরদার হোক

আপডেট : ১৮ জুন ২০১৯, ১০:১৬ পিএম

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে মিয়ানমারকে চাপ দিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশ কিছু তৎপরতা দৃশ্যমান হয়েছে। বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মামলা করার জন্য ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) শীর্ষ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইসলামি দেশগুলোর কাছে সমর্থন চাওয়া সরকারের একটি জোরালো পদক্ষেপ। বাংলাদেশের এই জোটগত তৎপরতার পরপরই মিয়ানমার প্রশ্নে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের একটি বলিষ্ঠ পদক্ষেপও দেখা গেল।

 

চলতি মাসের ৬ তারিখে মিয়ানমার সরকারকে দেওয়া এক চিঠিতে দেশটির সরকারের জাতিবিদ্বেষী নীতির কারণে সেখানে সব ধরনের ত্রাণ সহায়তা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে জাতিসংঘ। অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির কারণে রাখাইনের শরণার্থী শিবিরে থাকা রোহিঙ্গাদের মৌলিক মানবাধিকার ও চলাফেরার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা না হলে ত্রাণ সহায়তা বন্ধের ওই হুমকি দেওয়া হয় ওই চিঠিতে। পাশাপাশি ২০১২ থেকে এ পর্যন্ত কয়েক দফায় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফেরাতে কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায়ও জাতিসংঘ ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ওই চিঠিতে। রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতায় জাতিসংঘের এই অবস্থানকে কাজে লাগাতে পারে বাংলাদেশ।

 

রাখাইন রাজ্যে জাতিগত নিধনযজ্ঞের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় প্রত্যাবাসন চুক্তি হয়েছে। তবে মুখে প্রত্যাবাসনের কথা বললেও মিয়ানমার শুরু থেকেই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। একদিকে তারা বুলডোজার দিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের আলামত নষ্ট করেছে, চলমান রেখেছে রোহিঙ্গাদের ভূমিতে ‘আদর্শ বৌদ্ধ গ্রাম’ নির্মাণের প্রক্রিয়া; অন্যদিকে তারা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ভান করে গেছে। ত্রাণ বন্ধের সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করে মিয়ানমারে কর্মরত জাতিসংঘের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ক্যাম্প বা তার আশপাশে স্থায়ী বাড়িঘর নির্মাণের সরকারি পরিকল্পনায় এটা স্পষ্ট, দেশটিতে এই জাতিবিদ্বেষী বিচ্ছিন্নতা স্থায়ী হবে।

 

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে মিয়ানমারকে চাপে রাখতে দেশটির বৃহৎ প্রতিবেশী ও নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য চীনের ভূমিকাকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। বাংলাদেশও এই সংকট নিরসনে শুরু থেকেই নিজের দুই বৃহৎ প্রতিবেশী চীন ও ভারতকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে গেছে। অবশ্য রোহিঙ্গা প্রশ্নে ভারতের অবস্থান বাংলাদেশের পক্ষে তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন অংশীদার চীন রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থানকে নৈতিক সমর্থন দিয়ে আসছে। তবে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারকে চাপে রাখতে দেশটির ওপর চীনের প্রভাবকে কাজে লাগাতে সচেষ্ট রয়েছে সরকার। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর ত্রিদেশীয় সফরের পর পররাষ্ট্র মন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন জানিয়েছেন, আগামী জুলাই মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরের প্রধান আলোচ্যসূচিই হবে রোহিঙ্গা সংকট।

 

সম্প্রতি বাংলাদেশের আরেক বৃহৎ উন্নয়ন অংশীদার জাপান রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের অবস্থানের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের মধ্যে বৈঠকের পর এক যৌথ বিবৃতিতে জাপান এ সমর্থন ব্যক্ত করে। এভাবে মিত্র ও উন্নয়ন অংশীদার রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে সমর্থন আদায় এবং মুসলিম দেশগুলোর জোট ইসলামি সহযোগিতা সংস্থাকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করার উদ্যোগে অনেকগুলো ফ্রন্টে সরকারের তৎপরতা দৃশ্যমান। বস্তুতপক্ষেই মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং জাতিসংঘসহ এমন বিশ্ব সংস্থাগুলোকে কাজে লাগানো ভিন্ন অন্য কোনো বিকল্প হাতে নেই।

 

মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ কক্সবাজার জেলায় আশ্রয় দিয়েছে। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর ওই রাজ্যে দেশটির সেনাবাহিনীর অভিযানে সেখানকার অধিকাংশ রোহিঙ্গা কক্সবাজারে এসে আশ্রয় নেয়। বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে সহায়তায় জাতিসংঘের নেতৃত্বে প্রণীত জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানের (জেআরপি) মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছ থেকে যে অনুদান পাওয়া যাচ্ছে তা পর্যাপ্ত নয়। দীর্ঘদিন ধরে এই বিপুল শরণার্থীর বোঝা বহন করতে হলে তা দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতির জন্যও সংকটের কারণ হয়ে উঠবে। এ অবস্থায় দেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের তাদের মাতৃভূমিতে প্রত্যাবাসনের এই লড়াইয়ে একই সঙ্গে নানা আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় তৎপরতা জোরদার করাটা জরুরি।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত