পুলিশের বিতর্কিত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মিজানুর রহমানের স্থাবর সম্পত্তি ক্রোক ও একটি ব্যাংক হিসাব জব্দের আদেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরিচালক মঞ্জুর মোর্শেদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েশ এ আদেশ দেন। এদিকে ডিআইজি মিজানের কাছে অনুসন্ধানের তথ্য ফাঁস করার অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত দুদকের পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির ও ডিআইজি মিজানের ব্যাংক হিসাব তলব করেছে পুলিশ। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ (রাজউক), সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য চেয়েছে দুদক।
দুদকের প্রধান আইনজীবী খুরশিদ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আদালত ডিআইজি মিজানের সম্পদ ক্রোক ও ব্যাংক হিসাব জব্দের আদেশ দিয়েছে। এটা মূলত যাচাইবাছাই করার জন্য। যাচাইবাছাই শেষে অনুসন্ধান কর্মকর্তার প্রতিবেদনের আলোকে এ বিষয়ে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে। তবে এ সময় ডিআইজি মিজান তার কোনো সম্পত্তি বিক্রয়, হস্তান্তর বা স্থানান্তর, রূপান্তর করতে পারবেন না।’
তিনি জানান, ডিআইজি মিজানের তিনটি ফ্ল্যাট, তিনটি প্লট ও দুটি দোকান ক্রোক করার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। এসব সম্পত্তির দাম ৩ কোটি ৪৩ লাখ ৭৪ হাজার ৪৬০ টাকা। এ ছাড়া সিটি ব্যাংকের ধানমণ্ডি শাখায় মিজানের হিসাবও ফ্রিজ করতে বলেছে আদালত। তার ওই অ্যাকাউন্টে ১০ লাখ টাকা রয়েছে বলে জানান জাহাঙ্গীর।
অনুসন্ধানের অগ্রগতি বিষয়ে জানতে চাইলে দুদক পরিচালক মঞ্জুর মোর্শেদ বলেন, ‘অনুসন্ধানের বিষয় নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। অনুসন্ধান শেষে বিষয়টি প্রকাশ করা হবে।’
ডিআইজি মিজানের অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানের দায়িত্বে ছিলেন দুদকের পরিচালক বাছির। তিনি ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন প্রতিরোধ আইনে মামলার সুপারিশসহ গত মে মাসের শেষ দিকে প্রতিবেদন জমা দেন। এরপরই অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেতে রমনা পার্কে বাছিরকে দুই দফায় ঘুষ দেন বলে দাবি করেন ডিআইজি মিজান। তাদের কথোপকথনের কয়েকটি অডিও ক্লিপও গণমাধ্যমকে দেন তিনি। এই অভিযোগ ওঠার পর এনামুল বাছিরকে সাময়িক বরখাস্ত করে দুদক। তবে বাছির ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। দুপক্ষই পাল্টাপাল্টি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। এরপর ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে পাওয়া অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য বাছিরের পরিবর্তে গত ১২ জুন পরিচালক মঞ্জুর মোর্শেদকে নিয়োগ দেয় দুদক।
গত ১৩ জুন মিজান ও বাছিরের ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের অনুসন্ধান কমিটি করে দুদক। দুদক পরিচালক ফানা ফিল্লার নেতৃত্বাধীন কমিটির সদস্যরা হলেন সহকারী পরিচালক মো. গুলশান আনোয়ার প্রধান ও মো. সালাউদ্দিন। কমিটি দুপক্ষের ব্যাংক হিসাব তলবসহ আনুষঙ্গিক তদন্ত করছে। এ ছাড়া পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মইনুর রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের একটি দল ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ তদন্ত করছে। কমিটিতে আরও আছেন অতিরিক্ত কমিশনার শাহাবুদ্দীন কোরেশী ও পিবিআইর বিশেষ পুলিশ সুপার মিয়া মাসুদ করিম।
দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ডিআইজি মিজানের দুই স্ত্রী, দুই সন্তান এবং ভাই ও ভাগ্নের ব্যাংক হিসাবেরও তথ্য চাওয়া হয়েছে। গত রবি ও মঙ্গলবার আলাদাভাবে বিএফআইইউতে চিঠি পাঠায় দুদক। বেসরকারি ব্যাংকগুলোকেও একই ধরনের চিঠি দেওয়া হয়েছে। তিন কার্যদিবসের মধ্যে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন দুদকে পাঠাতে অনুরোধ করা হয়েছে।
তারা আরও জানান, ঘুষ লেনদেন সংক্রান্ত অডিও ক্লিপের ভোকাল (কণ্ঠ) ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং কর্র্তৃপক্ষের (এনটিএমসি) কাছে পাঠিয়েছে দুদক। এ প্রতিবেদন পাওয়ার পর সে অনুযায়ী পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য অনুসন্ধান কমিটি কমিশনে সুপারিশ করবে। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে টিম দুজনকেই আলাদাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করবে।
দুদকের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পরিচালক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, ঘুষ কেলেঙ্কারি, তথ্য গোপন করে রাজউকের প্লট নেওয়াসহ বেশকিছু নতুন তথ্য পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধ, মানিলন্ডারিং ও দুর্নীতি দমন প্রতিরোধ আইনসহ কয়েকটি মামলার সুপারিশ করা হবে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দুদকের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ডিআইজি মিজানের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে লেনদেনের বেশকিছু তথ্য দুদকের কাছে এসেছে। সেগুলো বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মিজান ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় সব টাকা তুলে নিয়েছেন। তার একটি হিসাবে মাত্র দুই হাজার টাকা এবং আরেকটিতে জমা আছে ৫০ হাজার টাকা। তার স্ত্রী, ছোট ভাই ও ভাগ্নের হিসাবের তথ্যও পেয়েছে দুদক। সেগুলো পর্যালোচনা চলেছে। একইভাবে এনামুল বাছিরের ব্যাংক হিসাব সংক্রান্ত কিছু তথ্যও দুদক পেয়েছে।
দুদক কর্মকর্তারা জানান, ডিআইজি মিজানের ভাগ্নে উপপরিদর্শক (এসআই) মাহমুদুল হাসানের নামে কেনা রাজধানীর কাকরাইলের বাণিজ্যিক ফ্ল্যাটটি গোপনে বিক্রি করে দেওয়ার নতুন একটি অভিযোগ এসেছে। চিঠি পাঠিয়ে ওই ফ্ল্যাটের দলিল রেজিস্ট্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া যাদের নাম এসেছে তাদের বিদেশ গমনের ওপর শিগগির নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে।
