আগামী মাসে প্রায় ২০০ কর্মকর্তাকে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে পদোন্নতি দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। পরে উপসচিব পদে আরও প্রায় ৩০০ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়ার বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন। এসব পদে অতিরিক্ত জনবল থাকার পরও কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে।
অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি পেতে যাচ্ছেন ১১ ব্যাচের কর্মকর্তারা। এই ব্যাচের ১২৬ কর্মকর্তা পদোন্নতির জন্য যোগ্য
বিবেচিত হচ্ছেন। এসব কর্মকর্তার সঙ্গে আগের বিভিন্ন ব্যাচের বাদ পড়া আরও ৭০ জনের বেশি কর্মকর্তাকে অতিরিক্ত সচিব করা হবে।
সিনিয়র সহকারী সচিব থেকে উপসচিব হিসেবে পদোন্নতি পাবেন ২৭ ব্যাচের কর্মকর্তারা। এ ব্যাচটি আলোচিত। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় এ ব্যাচের নিয়োগ হয়। নিয়োগের বিষয়টি আদালতে নিষ্পত্তি হয়। এ ব্যাচের কর্মকর্তারা নিয়োগের দাবিতে শহীদ মিনারে অবস্থান নিয়েছিলেন। ব্যাচটির নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল চারদলীয় জোট সরকারের আমলে। একপর্যায়ে মৌখিক বা ভাইভা পরীক্ষায় পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সদস্যদের বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ওঠে। এর মধ্যেই চূড়ান্ত বাছাই শেষে নিয়োগের সুপারিশ করে পিএসসি। পরে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পিএসসিতেও আমূল পরিবর্তন হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় পিএসসির চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান ড. সা’দত হুসাইন। তিনি দায়িত্ব নিয়ে আগের ফল বাতিল করে দেন। নতুন করে ভাইভা নিয়ে তিনি ফল ঘোষণা করলে বঞ্চিতরা (আগের ভাইভায় উত্তীর্ণ হয়ে নিয়োগের সুপারিশপ্রাপ্ত কিন্তু পরের ভাইভায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি) আদালতে যান। পরে নতুন করে সুপারিশপ্রাপ্তরাও আদালতে যান যেন তাদের নিয়োগ বাতিল করা না হয়। এই ব্যাচ থেকে প্রশাসন ক্যাডারে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল ২৭২ জনকে।
উপসচিব হতে হলে সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় পাস করে পাঁচ বছর চাকরির অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়। চলতি মাসে ২৭ ব্যাচের বেশিরভাগ কর্মকর্তা পদোন্নতির সেই যোগ্যতা অর্জন করেছেন। কিন্তু একই ব্যাচের আরও কিছু কর্মকর্তা আগামী নভেম্বরে সেই যোগ্যতা অর্জন করবেন। প্রায় ৩০ জন কর্মকর্তা আগামী বছরের মার্চে সেই যোগ্যতা অর্জন করবেন। এই ব্যাচের যেসব কর্মকর্তা পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করেছেন, তারা চাইছেন শিগগির পদোন্নতি পেতে। আর আগামী নভেম্বর ও পরের বছরের মার্চে যাদের পদোন্নতির শর্ত পূরণ হবে, তারা চাইছেন একসঙ্গে পদোন্নতি পেতে। এ অবস্থায় দোটানার মধ্যে পড়েছে সরকার। সংশ্লিষ্টরা তথ্য যাচাইবাছাই করে দেখেছেন, প্রায় ২০০ কর্মকর্তা পদোন্নতি পাবেন। তাদের সঙ্গে আগের বিভিন্ন ব্যাচের বাদ পড়া আরও ১০০ জনসহ মোট ৩০০ কর্মকর্তাকে উপসচিব হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হবে।
জনপ্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান, ২৭ ব্যাচের কর্মকর্তাদের এখনো গোয়েন্দা প্রতিবেদন সংগ্রহ করা হয়নি। এ ব্যাচের কর্মকর্তাদের মধ্যে পদোন্নতির সময় নিয়ে মতভিন্নতা থাকলেও তারা সবাই চান গোয়েন্দা প্রতিবেদন সংগ্রহ শুরু হোক। পরে যখন যে চাকরির শর্ত পূরণ করবেন, তখন তার পদোন্নতি হয়ে যাবে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রেষণ (এপিডি) অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব শেখ ইউসুফ হারুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পদোন্নতি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এর অংশ হিসেবেই পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন ব্যাচের পদোন্নতি দেওয়া হয়। যুগ্ম সচিব হিসেবে পদোন্নতির পর অতিরিক্ত সচিব এবং তারপর উপসচিব হিসেবে পদোন্নতি হতে পারে। আমরা এসব বিষয় নিয়েই কাজ করছি।’
গত ১৭ জুন উপসচিব পদ থেকে ১৩৭ কর্মকর্তাকে যুগ্ম সচিব হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়। পদোন্নতিপ্রাপ্তদের বেশিরভাগই হচ্ছেন ১৭তম ব্যাচের কর্মকর্তা। টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম বছরে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে এটাই বড় পদোন্নতি। সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) একজন সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এবার অনিবার্য কারণ ছাড়া কাউকে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা হয়নি। যারা পদোন্নতি পাননি, তাদের মধ্যে বেশির ভাগেরই বেঞ্চ মার্ক ছিল না। অনেকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘পদোন্নতিতে সরকার আর কাউকে বঞ্চিত করতে চায় না। ২০০৯ সাল থেকে সরকার পরিচালনার ফলে এখন যারা প্রশাসনের উচ্চ পদগুলোতে রয়েছেন, তারা মূলত সবাই সরকার সমর্থক হিসেবেই রয়েছেন। বিভিন্ন ধাপে পদোন্নতির সময় তাদের ব্যক্তিগত তথ্য দফায় দফায় যাচাইবাছাই করা হয়েছে। যারা ভিন্ন মতাদর্শের, তারা গত এক দশকে পদোন্নতি বঞ্চিত হয়েছেন। এখন যারা আছেন, তারা সরকার সমর্থক হিসেবেই আছেন। এ কারণে আগামী দিনগুলোতে পদোন্নতিতে খুব বেশি বঞ্চনার ঘটনা ঘটবে না।’
আগামী দিনগুলোতে পদোন্নতিতে বঞ্চনার ঘটনা না ঘটলেও বিগত দিনগুলোতে এমনটি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। জনপ্রশাসনে পদোন্নতি ও পদায়নে রাজনৈতিক পরিচয় প্রাধান্য পেয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ। ২০০২ সালের পদোন্নতি বিধিমালায় উল্লেখ না থাকলেও পদোন্নতিতে ‘গোয়েন্দা প্রতিবেদন’ ছিল আলোচিত বিষয়। উপসচিব থেকে সচিব পর্যন্ত পদোন্নতির জন্য পরীক্ষা হয় না। ফলে পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় মেধা, যোগ্যতা ও প্রতিযোগিতা উপেক্ষিত হয়েছে বলে মনে করে বিভিন্ন মহল।
রাজনৈতিক বিবেচনাকে প্রাধান্য দিয়ে প্রশাসনের উপসচিব থেকে ওপরের পদে শূন্য পদের অতিরিক্ত কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। রাজনৈতিক বিবেচনায় পদোন্নতির ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতাও লঙ্ঘিত হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সেই বিষয়ে জানার কোনো সুযোগ নেই। নিয়মের বাইরে পদোন্নতি দেওয়ায় জনপ্রশাসনে পিরামিড আকৃতির কাঠামোর (নিচে বেশি কর্মকর্তা, ধারাবাহিকভাবে ওপরে কম) ব্যত্যয় ঘটছে। আবার কর্মকর্তারা পদোন্নতির আশায় রাজনৈতিক আনুগত্যের দিকে ঝুঁকে পড়েন।
শুধু পদোন্নতিতে নয়, অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের ক্ষেত্রেও গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করা হয়। বিভিন্ন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে কর্মকর্তারা ক্ষমতাসীন দলবিরোধী কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন কি না, তা বিবেচনায় আনা হয়। গত রবিবার ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ (টিআইবি) ‘জনপ্রশাসনে শুদ্ধাচার : নীতি ও চর্চা’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানেও পদোন্নতিতে অনিয়ম ও বঞ্চনার তথ্য উঠে এসেছে। একই সঙ্গে পদোন্নতিতে অতিমাত্রায় গোয়েন্দা প্রতিবেদন নির্ভর হওয়ার কথাও রয়েছে।
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পদোন্নতিতে বঞ্চনার ঘটনা ঘটবে না, এটা অবশ্যই ইতিবাচক খবর। কিন্তু এই ইতিবাচক খবরের মধ্যেও নেতিবাচক খবর রয়েছে। আর তা হলো প্রশাসনে পদের চেয়ে বেশি পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে হলে পদের চেয়ে বেশি পদোন্নতি দেওয়া উচিত নয়।’
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমানে প্রতিটি পদেই অনেক বেশি কর্মকর্তা রয়েছেন। তারপরও পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে। উপসচিবের স্থায়ী পদ ১ হাজার ৩২৪টি। এ পদে বর্তমানে কর্মরত ১ হাজার ৬৯৭ জন। যুগ্ম সচিবের স্থায়ী পদ ৩৮৪টি হলেও এসব পদে কর্মরত কর্মকর্তার সংখ্যা ৮৬০ জন। অতিরিক্ত সচিবের স্থায়ী পদ ১২১টি। এসব পদে বর্তমানে কর্মরত ৪৯৪ জন। তবে সচিব বা সিনিয়র সচিবের স্থায়ী পদ ৮৯টি হলেও এসব পদে রয়েছেন ৭৬ জন।
