সাক্ষ্য আইন সংশোধন জরুরি

ডিজিটাল সাক্ষ্যের বিষয়টি আইনে অন্তর্ভুক্তির তাগিদ

আপডেট : ২৮ জুন ২০১৯, ০৩:১৭ এএম

১৪৭ বছরের পুরনো সাক্ষ্য আইন দিয়ে বিচারকাজ চলছে দেশে। ডিজিটাল এই  যুগে ডিজিটাল সাক্ষ্যের অপরিহার্যতা থাকলেও এ বিষয়ে সাক্ষ্য আইনে কিছু বলা নেই। অনেক ক্ষেত্রে ঘটনার ভিডিও ফুটেজ, স্থিরচিত্র, অডিও অপরাধ প্রমাণের দালিলিক প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার হলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে আসামিপক্ষ এ নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ফলে অপরাধের ভিডিও, স্থিরচিত্র বা অডিও কীভাবে ব্যবহার হবে সে বিষয়ে সাক্ষ্য আইনে স্পষ্ট থাকা উচিত বলে মনে করেন আইনজীবীরা। জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা বলছেন, ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইন অনেক পুরনো। এই  আইন আরও যুগোপযোগী করতে সংশোধন প্রয়োজন। ডিজিটাল এই যুগে ডিজিটাল সাক্ষ্যের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে তা সাক্ষ্য আইনে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন বলে মত দেন তারা। বিশেষ করে যে কোনো অপরাধ বা ঘটনার ভিডিও ফুটেজ, অডিও ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কীভাবে ব্যবহার হবে সে বিষয়ে সাক্ষ্য আইনে স্পষ্ট ধারণা থাকা উচিত। এতে করে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করা আরও দ্রুততর হবে এবং আসামিপক্ষও বিচার নিয়ে কোনো প্রশ্ন তুলতে পারবে না।

জানতে চাইলে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাক্ষ্য আইন বেশ পুরনো। এই যুগে ঘটনার ভিডিও, অডিও কীভাবে ব্যবহার হবে সে বিষয়ে সাক্ষ্য আইনে কিছু উল্লেখ নেই। এটি থাকলে ভালো হতো। আসামিদের বিরুদ্ধে এটি আরও জোরালোভাবে প্রয়োগ করা যেত। আমরা চাই সাক্ষ্য আইন আরও যুগোপযোগী করা হোক।’ তিনি বলেন, ‘বর্তমান সাক্ষ্য আইনে এ বিষয়ে কিছু উল্লেখ না থাকলেও ঘটনার যে কোনো ভিডিও ফুটেজ বা আসামির বিরুদ্ধে দালিলিক প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। আর এগুলো প্রচলিত সাক্ষ্য আইনে অন্তর্ভুক্ত করলে আরও ভালো হবে, আসামির বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণ আরও শক্তিশালী হবে। আসামিপক্ষও এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন তুলতে পারবে না।

আইনজীবীরা জানান, পুরান ঢাকায় বিশ^জিৎ হত্যার ভিডিও ফুটেজ বিচারে দারুণভাবে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণে সহায়ক হিসেবে কাজ করেছিল। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় ফৌজদারি অপরাধের অনেক ঘটনার ভিডিও ফুটেজ বা অডিও থাকে না। সেক্ষেত্রে আসামিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত মৌখিক সাক্ষ্য, শোনা সাক্ষ্য ও বিভিন্ন নথিপত্রের মাধ্যমে অভিযোগ প্রমাণ করতে হয়। যাতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। এখন সাক্ষ্য আইনে যদি ডিজিটাল সাক্ষ্যের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয় তাহলে তা অপরাধ প্রমাণে সহায়ক হবে। 

এছাড়া সাক্ষ্য আইনে মৌখিক সাক্ষ্য অবশ্যই প্রত্যক্ষ হতে হবে বলে উল্লেখ রয়েছে। এতে করে অনেক ক্ষেত্রে মৌখিক সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করেও মামলার বিচারকাজ চলে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি সংশোধন করে মোবাইল, ভিডিও, অডিওর মতো তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে সেখানে দেওয়া বক্তব্যকেও মৌখিক সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে বলে মত দেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মান্ধাতার আমলের সাক্ষ্য আইন দিয়ে আমাদের বিচার ব্যবস্থা চলছে। এটি  সংশোধন করা অত্যন্ত জরুরি। সাক্ষ্য আইনে ডিজিটাল সাক্ষ্যের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার জন্য গত সাত বছর ধরে আমরা বলে আসছি। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘বিশ্বজিৎ হত্যার ঘটনায় ভিডিও ফুটেজে দেখা গেল তাকে কোপানো হয়েছে। কিন্তু মেডিকেল রিপোর্টে গিয়ে দেখা গেল তাকে কোপানোর চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তার মানে এই রিপোর্ট ছিল ম্যানুফেকচার করা। এখন দেখা যাচ্ছে ময়নাতদন্তের যে গুরুত্ব তার চাইতেও অনেক বেশি মূল্যবান এই ভিডিও ফুটেজ। এখন সাক্ষ্য আইনে এ বিষয়গুলো যদি অন্তর্ভুক্ত করা হয় তাহলে তা অপরাধীর বিরুদ্ধে প্রমাণে সহায়ক হিসেবে কাজ করবে। এ জন্যই সাক্ষ্য আইন সংশোধন জরুরি বলে মনে করি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত