প্রত্যন্ত ও প্রান্তিক শিশুদের উপবৃত্তি জরুরি

আপডেট : ২৮ জুন ২০১৯, ০৯:৪৩ পিএম

দেশের দুর্গম অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া ১৮ লাখ শিক্ষার্থীর উপবৃত্তি বন্ধ রয়েছে ১৭ মাস। শিক্ষার্থীদের স্কুলমুখী করতে এবং ঝরে পড়া ঠেকানোসহ শিক্ষার মানোন্নয়নে বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে ২০০৮ সালের জুলাই মাসে ‘সেকায়েপ’ (সেকেন্ডারি এডুকেশন কোয়ালিটি অ্যান্ড অ্যাকসেস এনহ্যান্সমেন্ট প্রজেক্ট) প্রকল্প চালু হয়। প্রকল্পটি ২০১৪ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সাফল্যের প্রেক্ষিতে এর মেয়াদ ২০১৭ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এই প্রকল্পের আওতায় সর্বশেষ ২৫০টি উপজেলার ১৮ লাখ শিক্ষার্থীকে মাসিক উপবৃত্তি দেওয়া হতো। প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হয় ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বরে। প্রকল্প পরিচালকসহ এর কর্মকর্তাদের নানা রকম অনিয়ম ও অসহযোগিতায় মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে থেকেই উপবৃত্তি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। কোনো সফল ও প্রয়োজনীয় প্রকল্প শেষ হওয়ার আগে গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম চালু রাখার ব্যাপারে সরকারকে অবগত করার নিয়ম থাকলেও এক্ষেত্রে তা অনুসরণ করা হয়নি। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের অজান্তে প্রকল্প বন্ধ হয়েছে। এর ফলে দেশের ওইসব প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুদের বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।

 

দেশের শিক্ষার মানোন্নয়নে উপবৃত্তি চালু করা হয়। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রথম উপবৃত্তি চালু করা হলেও পরে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষদের সন্তানরাও এর আওতায় আসে। প্রাথমিক স্তরের ১ কোটি ৩০ লাখ শিক্ষার্থীকে পিইডিপি-৪ (চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প)-এর মাধ্যমে উপবৃত্তি দেওয়া হচ্ছে। মাধ্যমিক স্তরে এসইএসপি (মাধ্যমিক শিক্ষা উপবৃত্তি প্রকল্প), সেকায়েপ ও সেসিপর (সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম) মাধ্যমে উপবৃত্তি দেওয়া হয়। উচ্চমাধ্যমিক স্তরে এইচএসএসপি (উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রকল্প) ও স্নাতক স্তরে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট ফান্ড থেকে উপবৃত্তি দেওয়া হচ্ছে। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে স্নাতক শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৪০ লাখ শিক্ষার্থী উপবৃত্তির সুফল পেয়ে আসছিল।

 

এখন সেকায়েপের মতো একটি প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ১৮ লাখ শিক্ষার্থী শিক্ষালাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে, যা শিক্ষার সার্বিক পরিস্থিতির ওপর একটা ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে। সেক্ষেত্রে সরকারকে এ প্রকল্প পুনরায় চালু করতে জোর তৎপরতা চালাতে হবে এবং যাদের অনিয়মের জন্য এই প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেছে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।

 

এমনিতেই দেশে মোট শিক্ষার্থীর একটি বড় অংশ আর্থ-সামাজিক নানা কারণে শিক্ষা কার্যক্রম শেষ করার আগেই ঝরে পড়ে। বিশ্বব্যাংকের অভিমত হচ্ছে, দারিদ্র্যের কারণেই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী স্কুলের বাইরে থেকে যাচ্ছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা অধিকাংশই দরিদ্র পিতা-মাতার সন্তান। এসব শিশুকে পুষ্টিকর খাবার তো দূরের কথা, দু’বেলা দু’মুঠো ভাত মুখে তুলে দিতে পিতা-মাতাকে প্রাণান্ত হতে হয়। আর শিশু বয়সেই তাদের পরিবারের কাজে সাহায্য করতে হয়। এই কঠিন বাস্তবতাকে অস্বীকার করে এখানে জীবন চলে না। চরম দারিদ্র্যই শিশুদের বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার প্রধান কারণ। বিদ্যালয়ে না যাওয়া ও ঝরে পড়ার ক্ষেত্রে আর্থিক অনটন যেমন দায়ী, তেমনি বাল্যবিয়ে, কুসংস্কারসহ নানা ধরনের সমস্যাও রয়েছে। আইনগত বিধিনিষেধ থাকার পরও দেশে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা কমছে না। শিশুরা স্কুলে না গিয়ে জীবিকার তাগিদে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করে এর সমাধান না খুঁজলে শিক্ষাবঞ্চিত শিশুরা একদিন দেশের জন্য বোঝা হয়ে উঠতে পারে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার মূল কারণ হিসেবে দারিদ্র্যকে চিহ্নিত করার পাশাপাশি দুর্বল শিখন পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের দুর্বলভিত্তিসহ আরও কয়েকটি কারণ তুলে ধরা হয়েছে। এগুলোকে আমলে নিয়ে ঝরে পড়া রোধে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। ঝরে পড়ার পেছনে যেসব সামাজিক কারণ নিহিত, সেগুলোতেও নজর দিতে হবে।

 

শিক্ষা যেন সর্বজনীন হয়, তা রাষ্ট্রকেই দেখতে হবে। যদি মেয়ে ও ছেলে, ধনী ও দরিদ্র, গ্রাম ও শহরের বৈষম্য পর্বতপ্রমাণ হয়ে যায়, তাহলে শিক্ষার সর্বজনীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাশাপাশি শিক্ষা যাতে ভীতিকর না হয়ে আগ্রহের বিষয় করতে প্রশিক্ষিতদের দিয়ে আনন্দময় শিক্ষা পদ্ধতি চালু করতে হবে। আমরা আশা করব, জটিলতাগুলো নিরসন করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রান্তিক শিশুদের জন্য সেকায়েপ উপবৃত্তি চালু করতে সরকার উদ্যোগী হবে। একই সঙ্গে এই প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের উদ্যোগও নিতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত