পুঁজিবাজারে প্রণোদনার অংশ হিসেবে তালিকাভুক্ত কোম্পানির বোনাস লভ্যাংশ ও রিজার্ভের ওপর যে করারোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, তাতে কিছুটা পরিবর্তন এনেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। নগদ লভ্যাংশের সমপরিমাণ বোনাস দিলে তাতে কোনো করারোপ করা হবে না, এমন বিধান রেখে ২০১৯ সালের অর্থবিলে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের ওপর ভিত্তি করে রিটেইন্ড আর্নিংস (পুঞ্জীভূত মুনাফা) তথা রিজার্ভের ওপর যে করারোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, তাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। গতকাল জাতীয় সংসদে ২০১৯ সালের অর্থবিলের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল অসুস্থতা নিয়ে সংসদে উপস্থিত থাকলেও অর্থবিলটি উত্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
চলতি বছরের শুরু থেকে দরপতনের মধ্যে থাকা পুঁজিবাজার চাঙ্গা করতে তালিকাভুক্ত কোম্পানির রিজার্ভ ও বোনাস লভ্যাংশের ওপর কর বসিয়ে ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে প্রণোদনার ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। পুঁজিবাজারে তারল্য সংকট কাটাতে ও নগদ লভ্যাংশে উৎসাহিত করতে তালিকাভুক্ত কোম্পানির বোনাস লভ্যাংশের ১৫ শতাংশ করারোপ করা হয়। এছাড়া কোম্পানির রিটেইন্ড আর্নিংসসহ রিজার্ভ পরিশোধিত মূলধনের ৫০ শতাংশের বেশি হলে, অতিরিক্ত পুঞ্জীভূত আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ করারোপের প্রস্তাব দেন তিনি। তবে করারোপের মাধ্যমে দেওয়া প্রণোদনা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হওয়ায়, চূড়ান্ত অর্থবিলে তাতে পরিবর্তন আনেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
পুঁজিবাজারে তারল্য সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে টানা তিন মাসের দরপতনে বিভিন্ন সংস্কারের দাবি তুলেন বিনিয়োগকারী ও স্টেকহোল্ডাররা। প্লেসমেন্ট ইস্যু ও তালিকাভুক্ত কোম্পানির বোনাস লভ্যাংশ বন্ধে দাবি জানান তারা। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে তালিকাভুক্ত কোম্পানির বোনাস লভ্যাংশের ওপর ১৫ শতাংশ করারোপ করেন অর্থমন্ত্রী। বোনাস লভ্যাংশে করারোপের যুক্তি হিসেবে অর্থমন্ত্রী বাজেট প্রস্তাবে বলেন, নগদ লভ্যাংশ সংশ্লিষ্ট কোম্পানির শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি পুঁজিবাজার শক্তিশালীকরণে ভূমিকা রাখে। কিন্তু তালিকাভুক্ত কোম্পানির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বোনাস লভ্যাংশ বিতরণের প্রবণতা দেখা যায়, যাতে বিনিয়োগকারীরা প্রত্যাশিত প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ জন্য বোনাস লভ্যাংশের ওপর করারোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রত্যাশিত লভ্যাংশ নিশ্চিত করতে কোনো কোম্পানির পুঞ্জীভূত আয় বা রিজার্ভ যদি পরিশোধিত মূলধনের ৫০ শতাংশের বেশি হয়, তাহলে অতিরিক্ত পুঞ্জীভূত আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ করারোপের প্রস্তাব দেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।
তবে প্রস্তাবিত বাজেটে এমন করারোপে বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও বাণিজ্য সংগঠন এবং পুঁজিবাজারের স্টেকহোল্ডারসহ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) থেকে বিরোধিতা করে তা পুনর্বিবেচনার দাবি তোলা হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে করারোপ পুরোপুরি প্রত্যাহার না করে কিছুটা ছাড় দেওয়া হয়েছে চূড়ান্ত অর্থবিলে।
চূড়ান্ত অর্থবিলে নগদ লভ্যাংশের সমপরিমাণ যদি বোনাস লভ্যাংশ দেওয়া হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে কোনো কর দিতে হবে না। আর যদি নগদের চেয়ে বোনাস লভ্যাংশের পরিমাণ বেশি হয়, তাহলে ওই বোনাস লভ্যাংশের ওপর ১০ শতাংশ কর দিতে হবে। এছাড়া চূড়ান্ত অর্থবিল অনুমোদনের সময় শেখ হাসিনা বলেন, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির রিজার্ভের ওপর করারোপের যে প্রস্তাব করা হয়েছিল, তাতে উদোক্তাদের কেউ কেউ আপত্তি করেছেন। সেই প্রেক্ষাপটে এই ধারাটির আংশিক সংশোধনপূর্বক আমি প্রস্তাব করছি যে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানি কোনো অর্থবছরে কর-পরবর্তী নিট লাভের সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ রিটেইন আর্নিং, ফান্ড, রিজার্ভে স্থানান্তর করতে পারবে। অর্থাৎ কমপক্ষে ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ দিতে হবে। যদি কোনো কোম্পানি এটা করতে ব্যর্থ হয় তাহলে প্রতি বছর রিটেইন আর্নিং, ফান্ড, রিজার্ভের মোট অর্থের ওপর ১০ শতাংশ হারে কর আরোপ করা হবে। এ বিষয়গুলো বিচার-বিশ্লেষণ করে পুঁজিবাজার সংক্রান্ত আয়কর আইনের প্রস্তাবিত ধারাগুলো আমরা বিবেচনা করব। প্রসঙ্গত, এর আগে তালিকাভুক্ত কোম্পানির বোনাস শেয়ার ইস্যুতে শর্তারোপ করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসি। গত মে মাসে উন্নয়নমূলক কর্মকা-ের সুনির্দিষ্ট কারণ দেখাতে না পারলে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি লভ্যাংশ হিসেবে বোনাস শেয়ার ইস্যু করতে পারবে না বলে এক নির্দেশনা জারি করে এসইসি। একই সঙ্গে বোনাস শেয়ার ঘোষণার বিষয়টি মূল্য সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ করতে হবে, যাতে বোনাস শেয়ার ঘোষণার কারণ ও এর বিপরীতে রক্ষিত অর্থ ব্যবহারের খাত উল্লেখ করতে হবে। বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বোনাস লভ্যাংশের বিষয়ে এসইসির শর্তারোপই সঠিক ছিল। কারণ ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য বোনাস ইস্যুই হচ্ছে সবচেয়ে সহজ মাধ্যম। বাজেটে ঢালাওভাবে করারোপের মাধ্যমে অনেক কোম্পানির জন্যই ব্যবসা সম্প্রসারণ বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
২০১৮ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ১৫৪টি কোম্পানি বোনাস শেয়ার ঘোষণার মাধ্যমে ৩ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকা মূলধন উত্তোলন করে। এ অর্থ কোম্পানিগুলো কোথায় বিনিয়োগ করেছে, শেয়ারহোল্ডারদের তা জানায়নি। এতে বোনাস ঘোষণা করা কোম্পানিগুলোর শেয়ার সংখ্যা বাড়ে ৩৫৫ কোটি ৭৬ লাখ। একই সময়ে ১৭৯টি কোম্পানি ২ শতাংশ থেকে ৭৯০ শতাংশ পর্যন্ত নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করে।
