ক্যাম্পাসে বারবার অস্ত্রের মহড়ায় নীরব প্রশাসন

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০১৯, ০২:১৫ এএম

গত বছরের ৩ অক্টোবর গভীর রাতে সংঘর্ষে জড়ায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) আল বেরুনি হল ও মীর মশাররফ হোসেন হলের শিক্ষার্থীরা। নারীসংক্রান্ত বিরোধের জেরে বাধা এ সংঘর্ষে বিপুল পরিমাণ দেশি অস্ত্র ব্যবহারের পাশাপাশি কয়েক রাউন্ড গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। এরপর চলতি বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি শাখা ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে; প্রকাশ্য দিবালোকে পিস্তল উঁচিয়ে গুলি করতে দেখা যায় দুই পক্ষের নেতাকর্মীদের। পাশাপাশি তাদের হাতে ছিল রামদা, রড, জিআই পাইপ ও চাপাতির মতো দেশি অস্ত্র। অস্ত্র ঠেকিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন গত এপ্রিলে জাবিতে খেলতে আসা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় হ্যান্ডবল দলের সদস্যরা।

সর্বশেষ গত বুধবার এক ছাত্রলীগ কর্মীর ‘গায়ে ধাক্কা লাগা’ নিয়ে সংঘর্ষে জড়ায় মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের শিক্ষার্থীরা; শিক্ষক, সাংবাদিক, পুলিশসহ আহত হন অন্তত ৬৫ জন। দুই ঘণ্টা ধরে চলা এ সংঘর্ষে নেতৃত্ব দেন ছাত্রলীগের দুটির হলের নেতাকর্মীরা। এদিনও দেশি বিভিন্ন অস্ত্রের পাশাপাশি ব্যবহার হয় আগ্নেয়াস্ত্র; অন্তত ৮-১০ রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়। জাবি ছাত্রলীগের সভাপতি-সেক্রেটারি সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে ব্যর্থ হন; বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বারবার চেষ্টা করলেও পাত্তা পায়নি অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের কাছে। পরে পুলিশ এসে গুলি-টিয়ার শেল ছুড়ে আধাঘণ্টার চেষ্টায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

সাম্প্রতিককালে জাবিতে সংঘর্ষ বাধলেই দেশি অস্ত্রের পাশাপাশি শোনা যায় আগ্নেয়াস্ত্রের ঝনঝনানি। কিন্তু এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোনো উদ্যোগ নেই। এর আগে কয়েকবার অস্ত্র উদ্ধারের ঘোষণা দিলেও তা কার্যকর হয়নি। শিক্ষার্থীরা বলছেন, আবাসিক হলগুলোতে বিপুল দেশি অস্ত্রের মজুদ ও আগ্নেয়াস্ত্র থাকার পরও প্রশাসন কেন উদ্যোগ নিচ্ছে না তা রহস্যজনক। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকার ‘মেগা প্রকল্পের’ কাজ শুরু হওয়ায় সুবিধাভোগী পক্ষগুলোর উসকানিতে আগামীতে যেকোনো সংঘর্ষ তীব্র আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অস্ত্রের সহজলভ্যতায় ক্যাম্পাসে যেকোনো তুচ্ছ ঘটনা বড় সংঘর্ষে রূপ নিচ্ছে বলে মনে করছেন শিক্ষকরা। এ বিষয়ে নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মির্জা তাসলিমা সুলতানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অস্ত্র রাখতে পারাটা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ে যে লাগামহীন ক্ষমতাচর্চা হচ্ছে তার চূড়ান্ত বহির্প্রকাশ। এগুলো রাখলে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবেÑ এটা তো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন

এস্টাবলিশ করতে পারেনি। ফলে এগুলো হওয়াটাই স্বাভাবিক।’ অ্যাকাডেমিক উন্নয়নে মনোযোগ দিলে এসব কমে আসত উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, সবই টাকা-পয়সা সংক্রান্ত, বিশ্ববিদ্যালয় যে অন্য কিছুর জায়গা সেটাই তো আমরা ভুলে গেছি। বিভিন্ন পক্ষকে দিয়ে শান্ত রাখতে হচ্ছে, তো অস্ত্রশস্ত্র তো আসবেই।’

এ বিষয়ে উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম বলেন, ‘অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টা আমাদের মাথায় আছে। যেকোনো সময় আমরা এটা করতে পারি যাতে অস্ত্রধারীরা অস্ত্র লুকিয়ে ফেলার সুযোগ না পায়।’

প্রক্টর আ স ম ফিরোজ-উল-হাসান বলেন, ‘প্রক্টর কিংবা পুলিশ কেউ তো আসলে রেইড দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে সিদ্ধান্ত হলে তারপর করা যায়। জরুরি সিন্ডিকেটে অস্ত্রের বিষয়টি আলোচনা হয়েছে। যেকোনো সময় রেইড হতে পারে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত