লাখ টাকায় রোহিঙ্গাদের জন্মনিবন্ধন সনদ

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০১৯, ০১:৪২ এএম

মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা লাখ টাকার চুক্তিতে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা কাউন্সিলর অফিস থেকে জন্মনিবন্ধন সনদ সংগ্রহ করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওই সনদ নিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংগ্রহের পর পাসপোর্টের আবেদন করছে তারা। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গারা পাসপোর্ট অফিসে ফরম জমা দেওয়ার সময় ভাষাগত ও তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাইয়ে অনেকেই ধরা পড়ছে। জন্মনিবন্ধন সনদ, এনআইডি, পাসপোর্ট ও ভিসাসহ রোহিঙ্গাদের বিদেশযাত্রার বন্দোবস্ত জনপ্রতি ৫-১০ লাখ টাকায় করে দিচ্ছে দালালরা। নগরীর পাঁচলাইশ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তারা জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গত সোমবার পর্যন্ত কমপক্ষে ৫০ জন রোহিঙ্গা ধরা পড়েছে। তারা ফরমে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশ, দোহাজারী, পটিয়া, কর্ণফুলী উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন এবং নগরীর হালিশহর ও চান্দগাঁও ওয়ার্ডের স্থায়ী-বর্তমান ঠিকানা দিয়েছে; জমা দিয়েছে জন্মনিবন্ধন ও জাতীয়তা সনদ এবং এনআইডির কপিও।

পাঁচলাইশ পাসপোর্ট অফিসের উপপরিচালক মো. আল আমিন মৃধা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একশ্রেণির দালালের খপ্পরে পড়ে রোহিঙ্গারা পাসপোর্টের আবেদন ফরম জমা দিতে আসছে। এই অফিসে চট্টগ্রামের দক্ষিণের প্রায় সবকটি উপজেলার বাসিন্দাদের আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। সেজন্য কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ক্যাম্পের রোহিঙ্গারা কাছের উপজেলা থেকে জন্মনিবন্ধন সার্টিফিকেট, জাতীয়তা সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র নিচ্ছে। গত ৬ মাসে এমন ৫০ জনেরও বেশি রোহিঙ্গা পাসপোর্টের আবেদন জমা দিতে এসে ধরা পড়েছে। পরে তাদের থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।’

তিনি জানান, আটককৃত রোহিঙ্গারা জানিয়েছে, একশ্রেণির দালালের মাধ্যমে লাখ টাকার চুক্তিতে জন্মনিবন্ধন সার্টিফিকেট সংগ্রহ করে তারা পাসপোর্টের জন্য আবেদন জমা দিতে এসেছে। পাসপোর্ট করতে পারলে আবারও দালাল বা এজেন্সির মাধ্যমে ৭-৮ লাখ টাকা দিয়ে মালয়েশিয়া ও সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের ভিসার জন্য কন্ট্রাক্ট করবে।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, গত ৩ জুন ছেনোয়ারা বেগম (২৪) নামে এক রোহিঙ্গা নারী পাসপোর্টের আবেদন জমা দিতে আসেন। তিনি পটিয়া পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর গোবিন্দোর খিল এলাকায় স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা ব্যবহার করেন এবং পৌরসভা থেকে জন্মনিবন্ধন (নং-১৯৯৪১৫২৬১০৯০০০১১৮) ও জাতীয়তা সনদ জমা দেন। গত এপ্রিলে ফরম জমা দিতে আসেন উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সুরা বেগম; এনআইডি (নং-৩২৬০১৬৭০৮৯) অনুযায়ী তার স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা দোহাজারী পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডে। উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পের তাসলিমা আক্তার ফরমে বাঁশখালীর মনকিরচরের পূর্ব কাহারঘোনায় স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা ব্যবহার করেন এবং জন্মনিবন্ধন সনদ (নং-১৯৯৯১৫৯৩৫২৫০২৫১৪৭) জমা দেন। একইভাবে বালুখালী ক্যাম্পের হীরা আক্তার চন্দনাইশের মধ্যম হাশিমপুরের ঠিকানা ও জন্মসনদ, থাইংখালী ক্যাম্পের শাহেনা আক্তার সাতকানিয়ার আমিলাইশের হিলমিলি এলাকার ঠিকানা ও জন্মসনদ, নগরীর হালিশহর ‘বি’ ব্লকের ঠিকানা ও জন্মসনদে মোহাম্মদ হারেস ও চান্দগাঁওয়ের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ঠিকানা দিয়ে আব্দুল্লাহ, কুতুপালং ক্যাম্পের মোহাম্মদ সাকের লোহাগাড়ার চুনতির নারিশ্চার ঠিকানা ও জন্মসনদ এবং মোহাম্মদ আমিন পটিয়ার কুসুমপুরা ২ নম্বর ওয়ার্ডের ঠিকানা ও জন্মসনদ নিয়ে পাসপোর্টের ফরম জমা দিতে আসেন।

রোহিঙ্গারা কীভাবে জন্মনিবন্ধন বা জাতীয়তার সনদ সংগ্রহ করছেÑ জানতে চাইলে চন্দনাইশের হাশিমপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলমগীর ইসলাম চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেক এলাকার মেম্বাররা টাকার বিনিময়ে জন্মনিবন্ধনের আবেদন ফরমে সই করেন। মেম্বারের সই থাকলে ইউনিয়ন পরিষদে এসে জন্মনিবন্ধন ফরম পূরণ করে সার্টিফিকেট সংগ্রহ করা যায়। এক্ষেত্রে দালালের মাধ্যমে রোহিঙ্গারা জন্মনিবন্ধন সার্টিফিকেট পেতে লাখ টাকায় চুক্তি করে থাকে বলেও জানা গেছে।’

রোহিঙ্গাদের কীভাবে শনাক্ত করা হয় জানতে চাইলে উপপরিচালক মো. আল আমিন মৃধা বলেন, ‘স্বাভাবিক নিয়মে যারা আবেদন জমা দিতে লাইনে দাঁড়ান তারা একে একে ফরমগুলো জমা দিয়ে এমআরপি পাসপোর্টের জন্য ছবি তোলেন। কিন্তু এরই মধ্যে কোনো আবেদনকারীর কথাবার্তা ও কাগজপত্রে সন্দেহ হলে তৎক্ষণাৎ যাচাই-বাছাই করা হয়। এক্ষেত্রে রোহিঙ্গারা যে এলাকার জন্মনিবন্ধন বা ভোটার সেখানকার কোনো জনপ্রতিনিধির নাম বলতে পারেন না। এমনকি ঠিকানায় থাকা জনপ্রতিনিধিদের কাছে ফোন করেও এসব বিষয়ে যাচাই করা হয়। রোহিঙ্গা হলে এতে গরমিল ধরা পড়ে। তখন তাদের আবেদন ফরমটি বাতিল করা হয়।’

পাঁচলাইশ থানার ওসি আবুল কাশেম ভূঁইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পাসপোর্ট অফিসে ধরা পড়ার পর রোহিঙ্গাদের কক্সবাজারের ক্যাম্পে ফেরত পাঠানো হয়। এ ছাড়া তাদের জন্মনিবন্ধন সনদ সংগ্রহের বিষয়টি তদন্তের জন্য এসবিতে সুপারিশ পাঠানো হয়।’  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত