ভারতে নারীদের ঋতুস্রাবের সময় এখনো অপবিত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। ঋতুস্রাবের সময় নারীদের সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে রাখা হয় না। দেশটির শহুরে শিক্ষিত নারীরাও ঋতুস্রাবের সময় অফিসে নেতিবাচক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। এ নিয়ে সম্প্রতি বেশ কয়েকটি ঘটনা গোটা ভারতে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে।
ঋতুচক্রের সময় মালিকের নানা গঞ্জনা শুনতে হয়। বেতন কাটা যায়। জরিমানা করা হয়। তাই পেটের দায়ে, অভাবের তাড়নায় অপারেশন করে জরায়ু ফেলে দিচ্ছেন ভারতের হাজার হাজার দরিদ্র নারীশ্রমিক। তাদের বেশিরভাগেরই বয়স ২০ থেকে ২২-এর মধ্যে। তাদের অনেকেই দুই বা ততোধিক সন্তানের মা।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, কোটি কোটি গরিব মানুষ ভারতে। অনেক পরিবারে নারী-পুরুষ উভয়েই কাজ করেন। অফিস-আদালত ছাড়াও দিনমজুর হিসেবে শিল্প বা কৃষি খাতে অনেক নারী কাজ করছেন। সাম্প্রতিক সময়ে যে ঘটনাগুলো আলোড়ন তুলেছে, তার একটি মহারাষ্ট্রে। হাজার হাজার তরুণী স্বেচ্ছায় জরায়ু কেটে ফেলছেন হাসপাতালে গিয়ে। এর ফলে কিছু গ্রাম এখন জরায়ুহীন নারীদের গ্রাম হিসেবে পরিচিত হয়ে গেছে। যারা এই অপারেশন করিয়ে নিচ্ছেন, তারা কৃষিশ্রমিক। ক্ষেত থেকে আখ কাটেন। মহারাষ্ট্র ভারতে আখের উর্বর ক্ষেত্র। বছরের ছয় মাস এসব আখ ক্ষেতে কাজ করতে আসেন হাজার হাজার শ্রমিক। এই নারী-পুরুষরা একটানা ছয় মাস আখ কাটার কাজ করেন।
এছাড়া তামিলনাড়– রাজ্যে গার্মেন্ট কারখানায় অনেক মেয়ে কাজ করেন। ঋতুস্রাবের সময় দুর্বল লাগে অনেকের। অনেকে ব্যথার কারণে কাজ করতে পারেন না ওই সময়। ফলে তাদের যেখানে এক বা দুই দিন ছুটি দেওয়া উচিত, তা দূরে থাক, উল্টো ব্যথা কমানোর জন্য নাম না জানা ওষুধ খেতে দেয় মালিক পক্ষ। আর এমন বিড়ম্বনা থেকে বাঁচতে তারা জরায়ু কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন।
কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য থাকে না পর্যাপ্ত টয়লেট সুবিধা। এতে অনেক নারীই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হন। অনেকের আবার মানসিক সমস্যাও সৃষ্টি হয় কর্মক্ষেত্রে ঋতুস্রাব সংক্রান্ত বাজে আচরণের জন্য।
গত মাসে মহারাষ্ট্রের রাজ্যসভায় নারীদের এই অবমাননাসূচক শারীরিক ক্ষতির প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন বিধায়ক নীলম ঘোরে। তার কথার সঙ্গে একমত হন রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী একনাথ সিন্ধে। মন্ত্রী জানান, তিন বছরে বীদ জেলায় ৪ হাজার ৬০৫টি হাইসটেরেক্টমি সার্জারি হয়েছে। এ সার্জারিতে অনেক সময় নারীর প্রজননতন্ত্রের প্রায় সব কিছুই কেটে ফেলা হয়।
যদিও মন্ত্রী বলেন, সব অপারেশন আখ শ্রমিক নারীদের করা হয়েছে, তা নয়। তবে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য একটি তদন্ত কমিটি করার ঘোষণা দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
এই অপারেশন নারীর শরীরে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। সার্জারি করা নারীরা শরীরে ব্যথাবেদনা, শক্তিহীনতাসহ অনেক সমস্যায় ভোগেন। খুব দ্রুত বুড়িয়ে যান, কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ইন্দোনেশিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং আরও কিছু দেশে নারীদের ঋতুস্রাবকালে ছুটি দেওয়া হয়। এমনকি অনেক বেসরকারি কোম্পানিও ছুটি দেওয়ার এই উদ্যোগ নিয়েছে।
