ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) অধিভুক্ত রাজধানীর ৭ কলেজের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন যেন শেষই হচ্ছে না। কর্র্তৃপক্ষ সময়মতো পরীক্ষা নিতে পারছে না, ফল প্রকাশেও লাগছে বহু মাস। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর নেপথ্যে রয়েছে ঢাবি ও ৭ কলেজের অর্ধশতাধিক শিক্ষকের গাফিলতি। উত্তরপত্র মূল্যায়ন শেষে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরে সময়মতো জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তারা দেরি করছেন মাসের পর মাস। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ক্লাস না নিয়ে কলেজের বেশিরভাগ শিক্ষক ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত। এ বিষয়ে ঢাবি কর্র্তৃপক্ষেরও নজর নেই। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিভিন্ন বর্ষের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার ৬ থেকে ৭ মাস পেরিয়ে গেলেও ফল প্রকাশ হয়নি। অথচ পরীক্ষা শেষ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে ফল প্রকাশের কথা। উত্তরপত্র হাতে পাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে নম্বর জমা দেওয়ার নিয়ম থাকলেও মাসের পর মাস আটকে রেখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ ৭ কলেজের ৬১ শিক্ষক। তাদের কারণেই ৭ কলেজের শিক্ষার্থীরা সেশনজটে পড়েছেন।
বিষয়টি স্বীকার করে ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান বলেন, ‘কিছু শিক্ষকের উত্তরপত্র বিলম্বে জমা দেওয়া হয়েছে। আমরা তদারকি বাড়িয়েছি। ফলে সমস্যার সমাধান হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে ইতিবাচক বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছি। ৩-৪ দিনের মধ্যে এর ফল দৃশ্যমান হবে।’
অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাবির ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সানিয়া সিতারা জানুয়ারিতে তৃতীয় বর্ষের ৩৫৭টি খাতা নেন মূল্যায়নের জন্য। তিন মাস ১৬ দিন পর তিনি খাতা জমা দেন। ঢাবির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক মনিরুল ইসলাম ৩৮২টি উত্তরপত্র নিয়ে ১১ ফেব্রুয়ারি জমা দেওয়ার কথা থাকলেও দেন ১৪ মে। ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মনিকা চক্রবর্তী চতুর্থ বর্ষের ১০১টি খাতা নেন ১৮ ফেব্রুয়ারি। প্রায় তিন মাস পর জমা দেন ৭ মে।
বিলম্বে খাতা জমা দেওয়ায় পিছিয়ে নেই ৭ কলেজের শিক্ষকরাও। কবি নজরুল সরকারি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক কল্যাণ ব্যানার্জি খাতা নেন ৩ মার্চ, জমা দেন ৫ মে। ঢাকা কলেজের ইতিহাসের শিক্ষক তাসলিমা খাতুন ২ মাস ১০ দিন পর খাতা জমা দেন। অনার্স তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষের উত্তরপত্র নিয়ে যথাসময়ে জমা না দেওয়া এ পর্যন্ত ৬১ শিক্ষকের নাম পাওয়া গেছে।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর গত রবিবার বিকেলে ৭ কলেজের অধ্যক্ষের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন ঢাবি উপাচার্য। সেখানে বিলম্বে উত্তরপত্র জমা দেওয়ার বিষয় নিয়ে কথা হয়। যারা যথাসময়ে উত্তরপত্র জমা দেননি, তাদের কাছ থেকে নিয়ে অন্যদের দিয়ে তা মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে। যারা বিলম্ব করছেন তাদেরকে দ্রুত জমা দেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপাচার্য আখতারুজ্জামান। এছাড়া দ্রুতই ফল প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
উত্তরপত্র মূল্যায়নে বিলম্ব করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না জানতে চাইলে উপাচার্য বলেন, ‘কাজে অবহেলা করলে ব্যবস্থা নেওয়ার নিয়ম আছে। কিন্তু তাদের ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে, তারা তো প্রচুর কাজ করে। কাজের চাপ থাকলে কিছু কিছু সময় কিছু কাজ শেষ করা সম্ভব হয় না। ফলে তাদের অনেকের ক্ষেত্রেই এটা হয়েছে। আগামীতে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করতে দেওয়ার ক্ষেত্রে এ বিষয়টা খেয়াল রাখা হবে।’
গতকাল সোমবার ঢাবি উপাচার্যকে দেওয়া এক স্মারকলিপিতে ৭ কলেজের শিক্ষার্থীরা দ্রুত ফলাফল প্রকাশের দাবি ও উত্তরপত্র মূল্যায়নে অস্বাভাবিক বিলম্বের অভিযোগ করেন। ইতিহাসের তৃতীয় বর্ষের এক ছাত্র বলেন, ‘সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে আছি আমরা। আমাদের সঙ্গে প্রথম বর্ষে (২০১৪-১৫ সেশনে) জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা চলছে। সরাসরি ঢাবিতে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা মাস্টার্সে ক্লাস করছেন।’ একইভাবে ৭ কলেজের চতুর্থ বর্ষ রসায়ন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, হিসাব বিজ্ঞানসহ অন্য বিভাগের শিক্ষার্থীরা ৫-৬ মাসেও ফল প্রকাশ না হওয়ায় ক্ষোভ জানান।
