বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস আজ। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতির দেশ। জনসংখ্যা একটি দেশের সম্পদ হলেও অতিরিক্ত জনসংখ্যা বোঝা। কারণ অতিরিক্ত জনসংখ্যা অপুষ্টি, অপর্যাপ্ত শিক্ষার সুযোগ, বেকারত্ব, চিকিৎসাসেবার অপ্রতুলতাজনিত সমস্যা সৃষ্টি করে। এ জন্য দেশে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে পরিবার পরিকল্পনার কাজে গতি আনা ও বর্তমান জনগোষ্ঠীকে দক্ষ করাই বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সরকার উন্নয়নের যে ভিশন নিয়ে এগোচ্ছে, সে জন্য দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরি ও সুষম নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে গতি বাড়ানোসহ সমন্বয় আনা। একই সঙ্গে বর্তমান জনগোষ্ঠীর দক্ষতা বাড়াতে বাস্তবমুখী শিক্ষা ও বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুসারে, ২০১৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের জনসংখ্যা ছিল ১৬ কোটি ১৭
৫০ হাজার। এর মধ্যে পুরুষ ৮ কোটি ১০ লাখ ও নারী ৮ কোটি সাড়ে ৭ লাখ। বর্তমানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৩৭ শতাংশ। এ হিসাবে ২০৫০ সালে জনসংখ্যা ২২ কোটিতে পৌঁছাবে। এই পরিমাণ জনগোষ্ঠীর সব ধরনের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতে এখন থেকেই পদক্ষেপ নিতে হবে।
এ বিষয়ে পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব সৌরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রতি ১০ বছর পর আদমশুমারি হয়। ২০২১ সালের ১৭ মার্চ নতুন (ষষ্ঠ) শুমারির কাজ শুরু করা হবে। এরপর জানা যাবে দেশে মোট জনসংখ্যা কত।
এ প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। এবারে দিবসটির প্রতিপাদ্য, ‘জনসংখ্যা ও উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ২৫ বছর : প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়ন।’ আগামী ১২-১৪ নভেম্বর কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে হবে ‘নাইরোবি সামিট’। এ সম্মেলনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এবারের বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আলাদা বাণী দিয়েছেন।
আজ সকাল সাড়ে ৮টায় বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা থেকে বের হবে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। সকাল সাড়ে ১০টায় ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে হবে আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান।
এ বিষয়ে গতকাল মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য সচিব মো. আসাদুল ইসলাম বলেন, ‘জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আমাদের অনেক অর্জন রয়েছে, তবে কায়রোর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এগিয়ে যেতে হবে। এটি অর্জনে তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সেগুলো হলোÑপরিবার পরিকল্পনার তথ্য ও সেবার অপূর্ণ চাহিদার হার শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসা, প্রতিরোধযোগ্য মাতৃমৃত্যুর হার শূন্যে নামিয়ে আনা, মেয়ে ও নারীর প্রতি সহিংসতা ও যৌন হয়রানির প্রবণতা বন্ধ করা।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহার করে ৬১ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার। দেশে গর্ভকালীন বা প্রসবকালে মাতৃমৃত্যুর হার বর্তমানে ১ দশমিক ৬৯ শতাংশ। ২৫ বছর আগে স্বল্প আয়ের দেশে একজন নারী কমপক্ষে ছয়টি সন্তান জন্ম দিত; বর্তমানে তা চারের নিচে নেমে এসেছে। তবে বাংলাদেশে এ হার আরও কম ২ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে সমন্বয়হীতা দূর করতে হবে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংখ্যাতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে এম নুরুন্নবী বলেন, দেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে গর্ভনিরোধক গ্রহণের হার সন্তোষজনক। তবে ভাসমান ও বস্তির দম্পতি এবং চরাঞ্চলে এসব সামগ্রী পৌঁছানোতে সমস্যা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে অধিদপ্তরের সঙ্গে অন্যান্য সংস্থার কাজে সমন্বয় আনতে হবে।
অন্যদিকে বিবিএসের তথ্য অনুসারে, বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার ৬৮ শতাংশ কর্মক্ষম, যা স্বাধীনতার পর ছিল ৪৪ শতাংশ। গত তিন থেকে চার দশকে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বেড়েছে, যারা দেশের বড় সম্পদ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মীর্জ্জা আজিজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাংলাদেশে এখন চলছে জনসংখ্যার বোনাসকাল (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট)। দেশকে উন্নতির শিখরে নিতে এখনই উপযুক্ত সময়। কিন্তু এদের দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য বাস্তবসম্মত কর্মমুখী শিক্ষা ও যুবসমাজকে সৃষ্টিশীল কাজে উৎসাহিত করতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
